দেবাশীষ সরকার
‘নদী তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ?’— আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর এই শতাব্দীপ্রাচীন জিজ্ঞাসা আজ ভারত ও নেপালের সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিকতার শীর্ষে। নিজের করা প্রশ্নে বিজ্ঞানীরই উত্তর ছিল— ‘মহাদেবের জটা হইতে…’। কিন্তু বর্তমান কূটনৈতিক আঙিনায় এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা সহজ কাজ নয়। আবহমানকাল থেকে পাশাপাশি পথ চলা দুটি দেশ আজ নিজেদের সীমানা নির্ধারণ নিয়ে এক জটিল লড়াইয়ের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রত্যক্ষ সংঘাত না হলেও এই বিবাদ রাজনৈতিক ভ্রূকুটি আর কূটনৈতিক রক্তচক্ষুর পর্যায়ে পৌঁছেছে।
দীর্ঘদিন ধরে ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা এই মতানৈক্যে নতুন করে জ্বালানি জুগিয়েছেন নেপালের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। তিনি এই সীমান্ত সমস্যার নিরসনে চিন ও ব্রিটেনকে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে মধ্যস্থতার প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার বিতর্কিত প্রস্তাব রেখেছেন। তবে ভারতের অবস্থান অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও দৃঢ়। নতুন দিল্লির পক্ষ থেকে এই বিষয়টিকে সম্পূর্ণ দ্বিপাক্ষিক আখ্যা দিয়ে প্রস্তাবটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। ভারতের যুক্তি, দুই প্রতিবেশীর ভেতরের সমস্যা কেবল আলোচনার মাধ্যমেই মেটানো সম্ভব। স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনার পর গোটা বিতর্কের রাজনৈতিক উত্তাপ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এর দ্রুত নিরসন অত্যন্ত জরুরি।
ভৌগোলিক বাস্তবতায় ভারত-নেপালের ১৭৫১ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমানার প্রায় ৯৮ শতাংশ অংশ নিয়ে কোনও অনিশ্চয়তা নেই। বিরোধ রয়েছে মাত্র ২ শতাংশ এলাকা নিয়ে। এর মধ্যে জড়িয়ে রয়েছে ভারতের উত্তরাখণ্ডের ত্রিদেশীয় সংযোগস্থলে অবস্থিত কৌশলগত ৩৫ বর্গকিলোমিটারের কালাপানি অঞ্চল এবং দক্ষিণ নেপালের সীমান্ত সংলগ্ন ২০ থেকে ১৪০ বর্গকিলোমিটারের সুস্তা অঞ্চল। এই বিবাদের শিকড় ১৮১৪-’১৬ সালের ইঙ্গ-নেপাল যুদ্ধের পর, ১৮১৬ সালের ৪ মার্চ স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক সুগৌলি চুক্তিতে লুকিয়ে রয়েছে। চুক্তির ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কালী নদীকে (মহাকালী) নেপালের পশ্চিম সীমানা গণ্য করা হয়। কিন্তু সমস্যা হল, এই চুক্তিতে কালী নদীর সুনির্দিষ্ট উৎসমুখ বা প্রকৃত উৎপত্তিস্থল স্পষ্টভাবে বলা হয়নি। ফলে কালাপানি, লিপুলেখ এবং লিম্পিয়াধুরা অঞ্চল কার এক্তিয়ারে পড়ে, তা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
সীমানা নির্ধারণ প্রসঙ্গে নেপাল দাবি করে, কালী নদীর প্রধান উৎস লিম্পিয়াধুরা, যা লিপুলেখ পাসের ঠিক উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। এই যুক্তি অনুযায়ী লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ ও কালাপানি উত্তরাখণ্ডের পিথোরাগড় জেলার অংশ নয়, বরং নেপালের দার্চুলা জেলার অন্তর্ভুক্ত। ২০২০ সালে নেপাল সরকার তাদের নতুন রাজনৈতিক মানচিত্রে এই বিতর্কিত অঞ্চলগুলি নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করে দেখিয়েছে। অপরপক্ষে ভারতের অবস্থানও সুদৃঢ়। ভারতের মতে, কালী নদীর প্রকৃত উৎপত্তি কালাপানি এলাকার নিকটবর্তী পাহাড়ি ঝরনা থেকে। তাই এই অঞ্চল উত্তরাখণ্ডের পিথোরাগড় জেলার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভারতের সপক্ষে ১৯ শতকের রাজস্ব নথিপত্র সাক্ষ্য দেয়। ১৯৬২ সালের ভারত-চিন যুদ্ধের সময় থেকেই এই কৌশলগত জায়গাগুলি ভারতীয় সেনাবাহিনীর জরুরি নজরদারি চৌকি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
এই বিবাদের স্থায়ী নিষ্পত্তি তখনই সম্ভব, যখন কালী নদীর প্রকৃত উৎস বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত হবে। ১৯৮০-র দশক থেকে গঠিত যৌথ কারিগরি পর্যায়ের ‘বাউন্ডারি ওয়ার্কিং গ্রুপ’ (বিডব্লিউজি) সীমান্তের প্রায় ৯৮ শতাংশ অংশ নিশ্চিত করতে পারলেও কালাপানি অমীমাংসিতই থেকে গেছে। ২০১৪ সালে নয়াদিল্লি বৈঠকে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে চুক্তি হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। এই স্পর্শকাতর বিতর্কের স্থায়ী সমাধান খোঁজার পথে উগ্র জাতীয়তাবাদ সরিয়ে রেখে আধুনিক প্রযুক্তিগত ও বাস্তবসম্মত কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথম পদক্ষেপ হল যৌথ কারিগরি সমীক্ষা। ভারত ও নেপাল সংক্রান্ত ১৮৭৯ এবং ১৯২৭ সালের ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান সার্ভে ম্যাপ, যা নেপাল সরকার আগেই অনুমোদন দিয়েছিল, সেগুলিকে পুনরায় খতিয়ে দেখতে হবে। পাশাপাশি আধুনিক নদী বিজ্ঞান এবং উপগ্রহ মানচিত্রের সাহায্যে কালী নদীর প্রকৃত উৎসস্থল খুঁজে বের করতে হবে। এই বিষয়ে ভারতের ইসরো বা আইআইআরএস-এর কাছে উচ্চস্তরের ভূ-প্রাকৃতিক সমীক্ষা করার প্রযুক্তি রয়েছে।
দুই দেশের ‘জয়েন্ট টেকনিকাল লেভেল নেপাল ইন্ডিয়া বাউন্ডারি কমিটি’-কে সক্রিয় করে অভিজ্ঞ কার্টোগ্রাফার, ইতিহাসবিদ ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্বাধীন যৌথ কমিশন গঠন করা যেতে পারে, যা সুগৌলি চুক্তির মূল কপি ও প্রাচীন মানচিত্র বিশ্লেষণ করে কালী নদীর উৎস বৈজ্ঞানিক উপায়ে চিহ্নিত করতে সক্ষম হবে। তবে এই প্রযুক্তি তখনই সফল হবে যখন দুই দেশের সর্বোচ্চ স্তরে কূটনৈতিক আলোচনা এগোবে। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের উত্তেজক বক্তব্য সাময়িক সস্তা জনপ্রিয়তা দিলেও দুই প্রতিবেশীর মধ্যে অবিশ্বাসের প্রাচীর তৈরি করে। মনে রাখতে হবে, ভৌগোলিক কারণে নেপাল ভারতের সুরক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘বাফার স্টেট’ বা সুরক্ষাবলয় হিসেবে কাজ করে। তাই নেপালের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা ভারতের ভূ-কৌশলগত সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয়।
প্রাকৃতিক দিক থেকে নেপাল জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের বিরাট সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র, যার সবচেয়ে বড় স্বাভাবিক বাজার হল ভারত। কিন্তু বিগতদিনে কূটনৈতিক দূরত্বের সুযোগ নিয়ে নেপালের আপার তামাকোশি বা সাঞ্জেনখোলার মতো মেগা হাইডেল প্রোজেক্ট ভারতের হাত থেকে ফসকে চিনা সংস্থাগুলির নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছে, যা ভারতের জন্য সুখকর নয়। ঠিক একইভাবে নেপালের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্যও ভারতের চেয়ে বড় বন্ধু আর কেউ হতে পারে না। ২০১৫ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পের সময় ভারতীয় স্বেচ্ছাসেবকরাই সবার আগে বিধ্বস্ত নেপালের মাটিতে পৌঁছেছিলেন। বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে শীতের মরশুমে ঘাটতি মেটাতে বা বর্ষায় জলবিদ্যুৎ বিক্রির জন্য ভারতই নেপালের সবচেয়ে কাছের স্বাভাবিক সঙ্গী। এমনকি বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য করতে বা সেখানকার সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করতে গেলেও নেপালকে অবধারিতভাবে ভারতের ভূখণ্ডের ওপর দিয়েই যাতায়াত করতে হয়। উত্তরের চিন পাশে থাকলেও দুর্গম হিমালয় পর্বতমালা ডিঙানো অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। কাজেই ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা নেপালের নিজের অর্থনৈতিক অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য।
লিপুলেখ পাস যেহেতু পবিত্র কৈলাস-মান সরোবর যাত্রার মূল রুট এবং ত্রিদেশীয় জংশনের কাছাকাছি অবস্থিত, তাই এটি কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল। এই বিতর্কিত এলাকাটিকে সম্পূর্ণ সামরিক উত্তেজনামুক্ত করে একটি যৌথ অর্থনৈতিক করিডর বা যৌথ পর্যটন অঞ্চল হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব কি না, তা বিবেচনা করে দেখা যেতে পারে। চূড়ান্ত সমাধান না হওয়া পর্যন্ত, কালাপানি ও লিপুলেখ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে কোনও পক্ষেরই একতরফা সামরিক পরিকাঠামো নির্মাণ বা অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত হবে না। এই সংযম বজায় রাখলে দুটো দেশেরই পারস্পরিক সার্বভৌমত্ব ও যৌথ অর্থনৈতিক স্বার্থ অক্ষুণ্ণ থাকবে। ঘরোয়া রাজনীতিতে রাতারাতি জনপ্রিয় হওয়ার সংকীর্ণ মানসিকতা থেকে সরে এসে যদি দুই দেশের দূরদর্শী নেতারা আন্তর্জাতিক স্তরে নিজেদের পারস্পরিক লাভলোকসানকে বেশি গুরুত্ব দেন, তবে এই অমীমাংসিত মাত্র ২ শতাংশ সীমানা বিরোধের স্থায়ী ও সম্মানজনক সমাধান খুঁজে নেওয়া মোটেই অসম্ভব নয়।
(লেখক সাংবাদিক)
