অণুগল্প

অণুগল্প

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


ছায়া

ঋতুপর্ণা ধর

অর্ক বিশ্বাস করত, মানুষের ভবিষ্যৎ বইয়ের পাতায় লেখা থাকে। তাই বছরের পর বছর সে শব্দ মুখস্থ করেছে, তত্ত্ব মুখস্থ করেছে, স্বপ্ন মুখস্থ করেছে। কিন্তু চাকরি তাকে ‘মুখস্থ’ করেনি। অপেক্ষা একসময় ক্ষুধা হয়ে ওঠে। তখন সে মাছের ব্যবসা শুরু করে। প্রথমে শুধু মাছ বিক্রি করত, পরে বিক্রি করতে থাকে বিশ্বাসও। বাসি মাছের গায়ে নতুন সকালের গন্ধ মাখিয়ে দিতে শিখে যায়।

ব্যবসা বাড়ে। এক দুপুরে বাজার থেকে ফেরার পথে অর্ক হঠাৎ থেমে যায়। মাথার ওপর নির্মম রোদ। তবু পায়ের কাছে কিছু নেই। সে নীচে তাকিয়ে থাকে। রাস্তা, গাছ, খুঁটি— সবাই নিজেদের অন্ধকার বহন করছে। শুধু সে নয়। সেদিন রাতে ঘুম আসে না। মনে হয়, ছায়াটা হারায়নি; বরং বহুদিন ধরে তার ভেতর থেকে একটু একটু করে সরে যাচ্ছিল।

ভোরে বাজারে গিয়ে সে পচা মাছের ঝুড়িটা আলাদা করে রাখে। ক্ষতির অঙ্ক মাথার ভেতর কাঁটার মতো বিঁধতে থাকে। ঠিক তখন সূর্যের প্রথম আলো টিনের চাল ছুঁয়ে মাটিতে পড়ে।

অর্ক দেখে, তার পায়ের কাছে অস্পষ্ট এক রেখা। ছায়া নয়, যেন ছায়ার স্মৃতি।

সে বুঝতে পারে, আলো কখনও কাউকে ক্ষমা করে না; কিন্তু ফিরে আসার পথটুকু মুছেও দেয় না।

অর্ক হাঁটতে থাকে। রেখাটাও ধীরে ধীরে তার সঙ্গে লম্বা হতে থাকে।

কৃষ্ণকলি

কাকলি মুখোপাধ্যায়

‘বাইরে ঝড় উঠেছে। যাই, বাছুরটার গায়ে একটা বস্তা চাপিয়ে আসি।’ এই বলে চারুবালা তক্তাপোশ থেকে উঠে যেতেই পাশ ফিরে শোয় কৃষ্ণকলি। খোলা জানলা দিয়ে আকাশের রং দেখে বেশ ঠাওর করতে পারে সে, কালো আকাশ মানেই সব এলোমেলো করার পালা। যেমন তার জীবন।

ঝড় কি শুধুই প্রকৃতিতে? ঝড় যে তার বুকেও। উথালপাতাল স্মৃতির ঝাঁপি। মায়ের শীত করে, শীতে কাঁপে বুলবুলির বাছুর। আর কৃষ্ণকলি? ক্ষোভের আগুনে জ্বলে বুক। জমাট ব্যথার কান্নায় ভেজে চোখ। শিরায়-উপশিরায় অভিযোগের ফল্গুধারা।

তিন বছর প্রেমের পরেও বিশ্বাসঘাতকতা! এই কি মানুষের আসল রূপ! প্রেমিক মনটাকে বুঝতে এতটা ভুল হল তার? যে একদিন কবির নায়িকার মতো কৃষ্ণকলি হয়ে প্রেমিকের চোখে হারিয়ে যেত, সেই কিনা কালো রংয়ের জন্য শেষে প্রত্যাখ্যাত হল। বিয়ের মাত্র এক মাস আগেই চুরমার হল সংসার গড়ার স্বপ্ন।

মায়ের চাপে অন্তঃসত্ত্বা কৃষ্ণকলি শহরে গিয়ে তার সম্ভাব্য মাতৃত্বের সমস্ত দায়ভার এড়িয়ে চলে এল। ঠিক যেমন রোদ ঝলমলে আকাশ মুহূর্তে বেরঙা হয়ে যায়, কৃষ্ণকলিও যেন ঠিক তাই।

ঝড় কমতেই আকাশটা আবার কী সুন্দর রং ধরেছে! একেই কি বলে গোধূলিবেলা? কিন্তু তার জীবনে তো আর কোনওদিনও রঙের পরশ লাগবে না। মা কি বুঝতে পারে তার যন্ত্রণা? হয়তো বোঝে কিংবা বোঝে না। মা বুলবুলির সংসার বোঝে। বাবার স্মৃতিকথায় বুঁদ হয়ে আনন্দ মাখে। কৃষ্ণকলি সাজে শুধু দুঃখের আভরণে। যে সাজে কেউ সুন্দরী হয় না। নিরাভরণ হয় অন্তরে অন্তরে।

The submit অণুগল্প appeared first on Uttarbanga Sambad.



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *