বঙ্গ ক্রিকেট এ মুহূর্তে বিতর্কে রীতিমতো ঝাঁঝরা। যার ভরকেন্দ্রে রয়েছে সিএবি। তা, সেই সাম্প্রতিক সমস্ত বিতর্ক নিয়ে সাক্ষাৎকার দিলেন সংস্থার কোষাধ্যক্ষ সঞ্জয় দাস। প্রতিটা বিষয় ধরে। ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর সামনে।
প্রশ্ন: সিএবিতে এই মুহূর্তে দু’জন পদাধিকারী রয়েছেন, যাঁদের বয়স নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। প্রথম, যুগ্ম সচিব মদন ঘোষ। যাঁর সত্তর বছর হয়ে গিয়েছে। লোধা আইনে যাঁর প্রশাসনিক মেয়াদ উত্তীর্ণ। দ্বিতীয় জন, সহ সভাপতি নীতীশরঞ্জন দত্ত। এসআইআর লিস্টে যাঁর সত্তর বছর। কিন্তু প্যান কার্ডে উনসত্তরের আশেপাশে।
সঞ্জয়: প্রথমে অনুদাকে (নীতীশরঞ্জনকে যে নামে চেনে ময়দান) নিয়ে বলি। আমাদের দেশের সর্বোচ্চ আইডেন্টিটি প্রুফ পাসপোর্ট। যেখানে অনুদার জন্মসাল ১৯৫৭। অর্থাৎ, সত্তর হতে কিছু এখনও বাকি রয়েছে। ভোটার কার্ডের সময় অনেক সময়ই দেখা যায় যে, বয়স রাউন্ড ফিগারে করে দেওয়া হয়েছে। তাই এটা প্রবলেম নয়। আর মদনদার ব্যাপারটা নিয়ে বলব, প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত বেশি হইচই হচ্ছে।
আরও পড়ুন:
প্রশ্ন: অতিরিক্ত কোথায়? লোধা আইন স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে শুধু।
সঞ্জয়: আমি জানি যে, লোধা আইন অনুযায়ী সত্তর বছর হয়ে গেলে কোনও প্রশাসনিক পদে থাকতে পারেন না। কিন্তু তার মানে এটা নয় যে, পরের দিনই চলে যেতে হবে। আমাদের প্রেসিডেন্ট রয়েছেন। বোর্ডের সঙ্গে কথা বলে উনি ক্ল্যারিফাই করবেন।
আরও পড়ুন:
প্রশ্ন: কিন্তু পূর্বতন ভারতীয় বোর্ড প্রেসিডেন্ট রজার বিনি তো সত্তর হওয়ার পরের দিনই চলে গিয়েছিলেন।
সঞ্জয়: মানছি। কিন্তু মদনদার ব্যাপারটা ন’দশ দিন হল। আমরা কিন্তু দেখেছি পূর্বতন কোনও কোনও সিএবি প্রেসিডেন্ট প্রয়োজনে দশ-এগারো মাস বাড়তি থেকেছেন! কুলিং অফ শুরু হয়ে যাওয়ার পরেও।
প্রশ্ন: নাম বলবেন?
সঞ্জয়: দোষারোপ করব না। কারণ, যাঁরা পদে থাকেন, অনেক ভেবেচিন্তে তাঁদের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। অভিষেক ডালমিয়া কিন্তু সিএবি প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন বাড়তি দশ-এগারো মাস ছিলেন পদে। আবারও বলছি, অবশ্যই উনি জবরদখল করে বসে ছিলেন না। কিন্তু নিশ্চয়ই কোনও প্রত্যাশা বা নিয়মের কারণে তিনি অপেক্ষা করছিলেন।
প্রশ্ন: সৌরাশিস লাহিড়ীর কোচিং প্রোফাইল না পাওয়া নিয়ে গত কয়েক দিনে কম বিতর্ক হয়নি। উনি পরিষ্কার বলেছেন, কম্প্রোমাইজ করতে চাননি বলে কোচিংয়ের কাজ জোটেনি। পূর্বতন রাজ্য সরকারের প্রভাবশালী চরিত্র শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের নাম করে বলেছেন যে, তাঁর পছন্দের প্লেয়ার টিমে রাখেননি বলে আজ এই পরিণতি।
সঞ্জয়: শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের পছন্দের যে প্লেয়ারের কথা বলা হচ্ছে, সে কিন্তু ২০২১ সাল থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের বাংলা টিমে থেকেছে। তখন শান্তনু কী পজিশনে ছিলেন, জানি না। তাই সৌরাশিস যা বলছে, সেটা ঠিক না-ও হতে পারে। দ্বিতীয়ত, সৌরাশিস চুক্তি শেষের দু’দিন আগে এত কথা বলল। ও কত বড় কোচ আমরা জানি। আমরা সবাই ওকে পছন্দও করি। কিন্তু কোথাও কি টার্মিনেট করা হয়েছে সৌরাশিসকে? এটা তো পেশাদারি পৃথিবী। ওরা কোচিং করায়। বিনিময়ে আমরা অর্থ দিই। আজ যদি সৌরাশিস মুম্বই বা দিল্লি রনজি টিম থেকে অফার পেয়ে চলে যেতে চাইত, আমরা কি কাঁদুনি গাইতে বসতাম যে, দেখো আমরা প্যাটসিকে তৈরি করলাম, আর ও চলে গেল! কারণ, সৌরাশিসের সেই প্রস্তাব গ্রহণের অধিকার রয়েছে। তেমনই আমাদেরও সংস্থা হিসেবে অধিকার রয়েছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার। বেটার অফার পাওয়ায় দেবাংকেও তো সিএবি ছেড়ে দিয়েছিল কয়েক বছর আগে। সৌরাশিস বুঝল না, প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বড় কেউ নয়। সংস্থাকে এ ভাবে ছোট করা, বিলো দ্য বেল্ট হিট করা, উচিত নয়। অবসরের এক বছরের মধ্যে কোচিং পেয়েছে সৌরাশিস। আমি ওকে ছোট করছি না। তবে সৌরাশিস কিন্তু লক্ষ্মীরতন শুক্লা, মনোজ তিওয়ারি, অরুণলাল, ঋদ্ধিমান সাহা, দীপ দাশগুপ্ত, উৎপল চট্টোপাধ্যায়দের মতো তুখোড় প্রতিভাবান ছিল না। তার পরেও একশোটা প্রথম শ্রেণির মাচ খেলেছে। সিএবি সাপোর্ট না দিলে খেলতে পারত তো? তুখোড় প্রতিভাবান না হয়েও? আর কোথাও তো লেখা রাবারস্ট্যাম্প দিয়ে লেখা নেই, অনূর্ধ্ব ১৯ কোচিং ওকেই দিতে হবে। আমার মনে হয়, ও একটু সময় নিতে পারত। কী করে জানল, আমরা অন্য কোনও ভূমিকায় ওকে ভাবছিলাম না?
প্রশ্ন: কিন্তু গত কয়েক বছরে সৌরাশিস বাংলাকে একমাত্র ট্রফি দেওয়া কোচ। সরানোর পিছনে একটা যুক্তি তো থাকবে।
সঞ্জয়: কোথায় বললাম, সৌরাশিস খারাপ কোচ? কিন্তু ও ভালো বলে, আরও একজন যে বেটার হতে পারবে না, তার গ্যারান্টি আছে? অরিন্দমও (দাস) তো কত কিছু বলেছে দেখলাম। চার বছর আন্ডার সিক্সটিন কোচ ছিল। পারফরম্যান্স ধরছিই না। কাগজে দেখলাম, প্রচুর বলেছে যে অমুক জিনিস পাইনি, তমুক জিনিস পাইনি। ও তো আসত আমার ঘরে। একবারও বলেনি কেন? অরিন্দম কী কী করেছে, সে সব বলতে চাই না। কারণ, সিএবিতে থেকে তা বলা যায় না। আফটার অল, সিএবি পেরেন্ট বডি।
প্রশ্ন: মনে হয় না, সৌরাশিসের বিষয়টা একটু ভালো ভাবে সামলানো যেত। বিশেষ করে তিনি যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় সম্ভাব্য বিস্ফোরণের ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন।
সঞ্জয়: কী করা উচিত ছিল আমাদের, বলুন।
প্রশ্ন: আপনি নিজেই বললেন, সিএবি পেরেন্ট বডি। গার্জিয়ান। বাবা-বাছা করে বোঝানো বলেও তো একটা জিনিস আছে।
সঞ্জয়: যে বাবার দশ ছেলে, সবাইকে কি সামলানো যায়?
প্রশ্ন: কিন্তু সব ছেলে তো আর রাগ করে না। একজন করে।
সঞ্জয়: না, না একজন কোথায়? সবাই তো রাগ করছে! আর সত্যি বলতে, সবার মানভঞ্জনের জন্য পাঁচ জন অফিস বেয়ারার বসে নেই। একটা বিষয় ভুললে চলবে না। এটা পেশাদারি দুনিয়া। কোচরা টাকা পায় কাজের জন্য। বলছি না, টাকা দিয়ে আমরা তাদের কিনে নিয়েছি। বাট ইউ আর নট গিভিং ফ্রি সার্ভিস, মাই ডিয়ার!
প্রশ্ন: বুঝলাম। একটা কথা বলুন। ময়দানের একাংশ বলছে, অনুষ্টুপ মজুমদারকে অনূর্ধ্ব ১৬ কোচের দায়িত্ব দেওয়া হল, তিনি খেলা ছাড়তে চাননি বলে। সিএবি কম্পেনসেট করল। সত্যি?
সঞ্জয়: বাজে কথা।
প্রশ্ন: অনুষ্টুপ এখনও অবসর ঘোষণা করেননি। বিপিএলও খেলবেন। বাংলার প্রচুর অবসর নেওয়া ক্রিকেটার রয়েছেন। তা হলে অনুষ্টুপই কেন?
সঞ্জয়: অনুষ্টুপ কেন অবসর নেয়নি, তা ও-ই বলতে পারবে। নির্বাচক নিয়োগ নিয়ে লোধা আইন রয়েছে। কোচ নিয়ে নেই। নিশ্চয়ই রিটায়ারমেন্ট নেবে। তবে ওর ভিউ পয়েন্টস ফ্যান্টাস্টিক ছিল। তার উপর কারেন্ট প্লেয়ার। বাচ্চাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বেশি। বাই দ্য ওয়ে, আমরা এবার একটা স্বতন্ত্র কমিটি গঠন করে কোচ নির্বাচন করেছি। সিওই থেকে লোক এসে সাপোর্ট স্টাফ নির্বাচন করেছে। কমিটিটা ঠিক ভাবে নির্বাচিত হয়েছে না হয়নি, বলতে চাই না। ওটা প্রেসিডেন্ট আর সচিবের ব্যাপার। কিন্তু কমিটির লোকগুলো দেখুন। অরুণলাল! ওঁর চেয়ে বেটার কে আছে? দেবাং গান্ধী আছেন। যিনি আগে জাতীয় নির্বাচক ছিলেন।
প্রশ্ন: কোচ নির্বাচন কমিটি আইনসিদ্ধ কি না, তা নিয়ে তো প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, সুপ্রিম কোর্ট অনুমোদিত যে গঠনতন্ত্র অনুসরণ করে বোর্ড ও তার অধীনস্থ সংস্থারা, তাতে পরিষ্কার বলা আছে কোচ নির্বাচনে নির্বাচকদের মত নিতে হবে। নির্বাচকরা বলেছেন, তাঁরা মত দেননি।
সঞ্জয়: ঠিক আছে। আগে পজিটিভ দিকটা দেখি। এ রকম কমিটি তো আগে গঠন হয়নি। আর যদি ভুল হয়, পরের বার শুধরে নেব।
প্রশ্ন: কিন্তু কমিটিই যদি আইনসিদ্ধ না হয়, তা হলে তার নির্বাচিত কোচেরা কী করে আইনসিদ্ধ হলেন?
সঞ্জয়: কেন? এতদিন তা হলে কী ভাবে অ্যাপয়েন্টমেন্ট হত? লোধা আইন তো ২০১৫ সাল থেকে এসেছে। আবারও বলছি, পজিটিভটা দেখব আমরা। আচ্ছা, কোচ কমিটি গঠন করতে কি আর একটা কমিটি তৈরি করতাম আমরা?
প্রশ্ন: অ্যাপেক্স কাউন্সিলেও এই কমিটি পাশ হয়নি বলে খবর।
সঞ্জয়: অ্যাপেক্স কাউন্সিল সদস্যরা এ নিয়ে কোনও অভিযোগ করেছেন বলে আমি শুনিনি।
প্রশ্ন: শান্তনু সিনহা বিশ্বাস নিয়ে একটা প্রশ্ন করতে ভুলে গিয়েছিলাম। ময়দানের একাংশ বলছে, গত সিএবি নির্বাচনে ওঁর প্রভাব ছিল। নবান্নের নির্দেশে অনেক ভোট শান্তনু ঘুরিয়েছেন। সত্যি?
সঞ্জয়: শান্তনুকে আমরা চিনি আট মাস। আমরা কথা ওঁর সঙ্গে অবশ্যই বলেছি। মিশুকে মানুষ। কিন্তু ইনফ্লুয়েন্স শব্দটা খুব ডিফিকাল্ট। অন্তত আমি কাউকে বলতে শুনিনি, উনি কাউকে থ্রেট করেছেন নির্বাচনের সময় বা ভোট ঘুরিয়েছেন। তা ছাড়া ইনফ্লুয়েন্স করার মতো কিছু ছিলও না। নির্বাচনের সময় সৌরভের দলের ভোটব্যাঙ্ক আশির নিচে চলে যাবে, সেই পরিস্থিতি কখনওই ছিল না। সত্তর-পঁচাত্তরে তো মেজরিটি।
প্রশ্ন: কিন্তু নির্বাচিত হয়ে আসার পরেও কি সিএবিতে সমস্ত ঠিক চলছে? পঙ্কজ রায়ের জন্মদিনে পুত্র প্রণবকে না ডাকা নিয়ে তীব্র বিতর্ক হল।
সঞ্জয়: আমার মনে হয়, সংস্থা হিসেবে আমাদের আধুনিক হওয়ার সময় এসেছে। পঙ্কজদা’র জন্মদিনের ক্ষেত্রে ভুল হয়তো আমার। আগামীকাল অন্য কেউ ভুল করবে। কিন্তু আমার বক্তব্য হল, একমাত্র বিধানচন্দ্র রায় বাদে বাকি কারও জন্মদিন পালনের আলাদা করে দরকার কী? আমরা অলরেডি প্রত্যেক সদস্যের জন্মদিনে তাঁর বাড়িতে সুন্দর একটা গ্রিটিংস কার্ড পাঠাচ্ছি। প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ করব, সেটাকে সার্বিক প্রথা করে দিতে। যাতে অবাঞ্ছিত বিতর্ক এড়ানো যায়।
প্রশ্ন: বলতে পারবেন? সিএবি কোষাধ্যক্ষ হওয়া সত্ত্বেও সঞ্জয় দাসের সেই অ্যাকসেস রয়েছে প্রেসিডেন্টের কাছে?
সঞ্জয়: মানে?
প্রশ্ন: ময়দান বলে, সিএবি অফিশিয়ালদের সৌরভ পর্যন্ত সেই অ্যাকসেস নেই, যা পদাধিকারী না হওয়া সত্ত্বেও কোনও এক সুরজিৎ লাহিড়ীর রয়েছে! অনেকে এটাও মনে করেন, এঁদের কারণেই বদনাম হচ্ছে সিএবির। কারণ, সুরজিতরাই ইদানিং ঘিরে থাকেন সৌরভকে। হয়তো তাতে সিএবি প্রেসিডেন্ট প্রভাবিতও হন। সেটা কি সত্যি-সত্যি হচ্ছে? সুরজিতরা প্রভাবিত করছেন সৌরভের সিদ্ধান্তকে?
সঞ্জয়: সুরজিতরা আমার ছোট ভাইয়ের মতো। আমার কানে এ সমস্ত কিছু আসেনি। আর এলেও আমি তা কানে তুলিনি। তা ছাড়া ক’বছর হল ময়দান করছে। আমাকে কেন তুলনায় নামাচ্ছেন খামোখা? দেখুন আমি হীনমন্যতায় ভুগি না। অন রেকর্ড বলছি, সৌরভ বা স্নেহাশিসের সঙ্গে যত বছর আমি কাটিয়েছি, এরা কেউ তত ঘণ্টাও কাটায়নি! আর মহারাজ এতটাই বিচক্ষণ লোক যে, তার সিদ্ধান্তকে কেউ প্রভাবিত করতে পারে, বিশ্বাস করি না। আর আপনি যাঁদের নাম বললেন, তাঁরাও কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছে বলে মনে করি না। তাঁরাও নিজেদের জীবনে যথেষ্ট এস্টাব্লিশড। আর ব্যক্তিগত ভাবে আমি কাউকে থ্রেট মনে করি না।
প্রশ্ন: একটা খারাপ লাগা যেন কোথাও আছে মনে হচ্ছে।
সঞ্জয়: না নেই।
প্রশ্ন: না থাকলে, দশ দিন আগে আপনি ইস্তফা দিতে গিয়েছিলেন কেন?
সঞ্জয়: কে বলল? এ রকম কিছু হয়নি তো!
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
