সাগ্নিক চক্রবর্তী
রিকিসুম, পেডং লাভা রোডে অবস্থিত ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম। ৬১৪০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত কালিম্পং জেলার এই জনবসতিতে কাঠের ছোট ছোট বাড়ি, ধাপে ধাপে সাজানো রয়েছে। চারদিকে নিস্তব্ধতা, মাঝে মাঝে শুধু পাখির ডাক। কালিম্পং শহর থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে, কিন্তু এখানকার নীরবতা যেন অন্য এক জগৎ। চোখের সামনে পাহাড়ের খাঁজ, মেঘের আনাগোনা আর ঠান্ডা হাওয়ার স্পর্শ, সব মিলিয়ে প্রকৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন।
চতুর্থীর সকালে কলকাতা থেকে কোচবিহারে নিজের বাড়ি ফিরেছিলাম, পুজোর আগে। ব্যক্তিগত কিছু কারণে মন সেসময় ভারাক্রান্ত, শরীরেও হালকা জ্বর। ঠিক এমন সময় দাদা বলল, ‘চল, কোথাও ঘুরে আসি।’ মনে হল, হয়তো পাহাড়ের হাওয়া একটু প্রশান্তি এনে দেবে। পরদিন সকাল ৯টার সময় গাড়ি করে বেরিয়ে পড়লাম আমরা, আমি, দুই দাদা, বৌদি আর নয় বছরের ভাইঝি মিছরি, একেবারে অনির্দিষ্ট পথে। যদিও জানতাম লাভার দিকেই যাব, কোথায় থামব তা ঠিক ছিল না। ফালাকাটা পেরিয়ে গাড়ি ছুটল বানারহাটের দিকে, সেখান থেকে আরেক ভাইও যুক্ত হল।
সেপ্টেম্বরের শেষ, তবুও তখনও বেশ গরম। মিংলাস চা বাগানের রাস্তা ধরে গাড়ি যখন পাহাড়ে উঠতে শুরু করল, হালকা ঠান্ডা হাওয়ায় মন একেবারে বদলে গেল। যাত্রাপথে পাপড়ক্ষেতিতে নেমে দুপুরে খেলাম পাহাড়ি মোমো আর এক কাপ গরম চা, পাহাড়ের মোমোর স্বাদই অনন্য! ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে বৃষ্টি। পাহাড়ের এই রোদ-বৃষ্টির খেলায় এক অদ্ভুত মায়া আছে, যা শুধু অনুভব করা যায়, লেখায় প্রকাশ করা বড্ড মুশকিল।
আমরা ঠিক করতে পারছিলাম না কোথায় যাওয়া যায়। হঠাৎ ভাইয়ের প্রস্তাব এল, রিকিসুম নামে এক জায়গা আছে, খুবই শান্ত ও সুন্দর। সঙ্গে সঙ্গে গুগলে নম্বর খুঁজে, ফোনে যোগাযোগ করা হল এক হোমস্টের সঙ্গে আর ঘর খালি আছে শুনেই বুকিং করে ফেললাম।
রিকিসুম যাওয়ার দুটি পথ, একটি এনজেপি-কালিম্পং হয়ে, অন্যটি মালবাজার-লাভা হয়ে। আমরা দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছিলাম। লাভার রাস্তা বরাবরই প্রিয়, এইবারও সেই পথের মেঘ, রোদ, কুয়াশা ও পাইনবনের মধ্যে দিয়ে যাত্রা এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা দিল। মিছরিও মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল, প্রথমবার মেঘের এত কাছাকাছি এসেছে, চোখেমুখে আনন্দ ঝরে পড়ছিল ।
বেলা ৪টার দিকে পৌঁছালাম লাভা থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে রিকিসুমে। এখন সেখানে বেশ কিছু হোমস্টে তৈরি হয়েছে, ধীরে ধীরে পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়ছে। পাহাড়ের ঘরগুলোর একটা নিজস্ব গন্ধ থাকে- মাটি, কাঠ আর হালকা স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া মিশে এক অদ্ভুত মাদকতা তৈরি করে। সন্ধ্যা নামতে না নামতেই মেঘের দল এসে ঢেকে ফেলল চারপাশ। বারান্দায় বসে চোখের সামনে মেঘ, সূর্যের শেষ আলো, সবুজ পাহাড় আর হালকা বাতাসের মিশেলে তৈরি হল এক অসাধারণ মুহূর্ত। সেই দৃশ্য যেন সময়ের গহ্বরে গেঁথে গেল চিরদিনের মতো। সূর্য নামার সঙ্গে সঙ্গে নিস্তব্ধতা গ্রাস করে এই ছোট্ট জনবসতিতে, পথের ধারের দোকানগুলিও বন্ধ হয়ে যায়, হোমস্টের বারান্দায় বসে দেখা যায় ওই দূরে পাহাড়ের খাঁজে দূরে দূরে কোথাও জনবসতিতে আলো জ্বলছে।
পরদিন সকালে হাঁটতে বেরোলাম আমরা। পাহাড়ি ফুলের বাহার, লাল, নীল, সাদা, কত রঙের যে! রাস্তার বাঁকে বাঁকে অবহেলায় ফুটে থাকা সেই ফুলগুলো যেন প্রকৃতির সহজ সৌন্দর্যের প্রতীক। হাঁটতে হাঁটতে এমন মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম যে ফিরতে মন চাইছিল না।
গ্রামের পেছনেই পাইন বন। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছালাম এক ভিউপয়েন্টে, যেখান থেকে ৩৬০ ডিগ্রির প্যানোরামিক দৃশ্য দেখা যায়। আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে কাঞ্চনজঙ্ঘাও দেখা যায়, তবে আমাদের সময় বৃষ্টি সদ্য থেমেছে, তাই সে সৌভাগ্য হয়নি। কিন্তু তাতে মন খারাপ হয়নি, কারণ প্রকৃতি তখনও তার সমস্ত সৌন্দর্য মেলে ধরেছে। কিছু জোঁক পায়ে লেগেছিল ঠিকই, তবে সেই অসুবিধা গলে গিয়েছিল প্রকৃতির সৌন্দর্যে। পাখির কলতান, হালকা বাতাস আর সবুজের গভীরতা যেন আত্মাকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। স্থানীয়দের কাছ থেকে শুনলাম ব্রিটিশ আমলে এখানে পাহাড়ের চূড়ায় একটি বাংলো ছিল, যার ধ্বংসাবশেষ আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ফেরার পথে লাভা বৌদ্ধ মনাসটেরিতে কিছুক্ষণ কাটালাম। শান্ত পরিবেশ, ঘণ্টার ধ্বনি আর ভিক্ষুদের ধ্যানমগ্ন মুখ যেন এক অন্য আবেশে ডুবিয়ে দিল মনকে। হাতে সময় থাকলে পেডং থেকে ১৫ মিনিট দূরের ডমসাং দুর্গটিও দেখা যায়, ১৬৯০ সালে নির্মিত, যা ১৮৬৪ সালের অ্যাংলো ভুটানি যুদ্ধে ধ্বংস হয়েছিল। আগে গিয়েছিলাম বলে এবার আর যাইনি।
বিকেলের দিকে নামতে শুরু করলাম পাহাড় থেকে। সেদিনই ষষ্ঠী, পথে পথে বাজছে ঢাকের আওয়াজ। মনে হচ্ছিল, এই অল্প সময়ের ভ্রমণই যেন মনকে নতুন করে সাজিয়ে দিয়েছে। স্বল্প সময়, অল্প খরচে, অফবিট কোনও জায়গায় শান্তির খোঁজে যেতে চাইলে রিকিসুম হতে পারে আদর্শ গন্তব্য। সবুজ পাহাড়, মেঘের ছোঁয়া, পাখির ডাক আর নিস্তব্ধতার মধ্যে নিজের সঙ্গে নতুন করে দেখা হয়ে যায়। রিকিসুমে কাটানো সেই দু’দিন যেন এক অপ্রকাশিত গল্প, যেখানে সময় থেমে থাকে, মন জেগে ওঠে, আর পাহাড় নীরবে বলে যায়, ফিরে এসো, আবার।
