মাধুকরী মন – Uttarbanga Sambad

মাধুকরী মন – Uttarbanga Sambad

খেলাধুলা/SPORTS
Spread the love


  • ইন্দ্রনাথ ঘোষ

মহাদেবের জটা থেকে অজস্র ধারায় নেমে আসা গঙ্গার মতোই বটগাছটির ঝুরিগুলো নেমে এসেছে মাটিতে। ঝুরিগুলির মোটা শিকড় সহস্রধারা স্রোত হয়ে দিগ্বিদিকে নাচতে নাচতে গিয়ে মাটির ভিতরেই মিলিয়ে গিয়েছে। বুড়োবট বুড়োশিবের মতোই ভাবগম্ভীর, ধ্যানস্থ। তার কাণ্ডস্থিত কচি-বুড়ো পাতাগুলি আকাশে ছড়িয়ে নিজের সীমানা দখল করেছে, তেমনি তার ঝুরি-শিকড়গুলি দখল নিয়েছে মাটির চৌহদ্দি। এই আভূমিবিস্তৃত এলাকা তার নিজের- কিন্তু তা কেবলমাত্র নিজের জন্যই নয়। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কীটপতঙ্গ থেকে চারপেয়ে অবোধ জীব, ক্ষুদ্রকায় পক্ষীকুল থেকে বুদ্ধিধর মানুষ, সকলেই তার আশ্রয় পায়- সময়ে, অসময়ে। গ্রামটির কিনারে ‘অচল শিব’ দাঁড়িয়ে থাকে স্থিতপ্রজ্ঞ ‘শালপ্রাংশু মহাভুজ’ হয়ে।

খররোদ্দুর মাথায় নিয়ে হনহনিয়ে হাঁটছিল প্রশান্ত। এই ‘গড ফর সেক’ জায়গায় একটা ঠিকঠাক ছায়ায় দাঁড়ানো জায়গাটুকুও কি নেই! পিঠের ন্যাপস্যাকের স্ট্র্যাপটা কাঁধ থেকে স্লিপ করে যাচ্ছিল, টেনে নিয়ে পকেট থেকে রুমালটা বার করে সে কপালের বিনবিনে ঘাম মুছল, মাথাটা এখনও রাগ-বিরক্তিতে গরম হয়ে আছে। বাবা বারবার বলেছিলেন গাড়িটা নিয়ে যেতে। নিজেই একটা অ্যাডভেঞ্চার টাইপের হবে মনে করে কলকাতা থেকে ট্রেনে আমোদপুর, সেখান থেকে লজঝড়ে বাসে গোঁসাইপুর বলে এই গ্রামে এসেছে। সেই কোন ভোরবেলা রওনা হয়েছিল, আর এখন সূর্য মধ্যগগনে। অবশ্য দুপুরে ভোগটা ভালোই খাইয়েছেন ফুল্লরাতলার পুরোহিতমশাই। কিন্তু ঝামেলাটা বাঁধল তারপরে বেরোনোর সময়। ভিক্ষা করছিস কর, বাচ্চাগুলো প্রায় গায়ের ওপর উঠে হাত ধরে টানাটানি করায় মাথাটা দুম করে গরম হয়ে গেল। একটু জোরেই ঠেলা দিয়েছিল একটাকে, বাচ্চাটা ধরাম করে মাটিতে পড়তে তার মনটাও রাগ ছাপিয়ে একটু খারাপই হয়ে গিয়েছিল। রাগ আরও বাড়িয়ে দিল আশপাশের টিকি-কণ্ঠিওয়ালা দু’-চারজন। ‘বাচ্চাটা তো দোষ করেছেই বাবু, ধাক্কাটা না দিলেই ভালো ছিল, হাজার হোক নারায়ণের জীব…।’ তিলকধারীর বৈষ্ণব বিনয়ে বিগলিত ইনিয়ে-বিনিয়ে কথায় আবার মাথায় রাগটা চড়াৎ করে চড়ে গিয়েছিল প্রশান্তর। ব্লাডি বেগারস! আবার নেকুপুষু করে কথা বলা হচ্ছে! ‘বেশ করেছি’ খানিকটা উদ্ধত ভঙ্গিতেই বলে উঠেছিল সে।

– ক্ষমা চাইতে হবে নাকি?

– না না, বাবু ক্ষমা চাওয়ার কী আছে? ওরা বাচ্চা, অত বোঝে না। তাই বলছিলাম, ওদের মধ্যেও তো নারায়ণের বাস…।

‘কারও গায়ে হাত দেওয়াটা কী ধরনের ভদ্রতা? জানো আমাদের দেশ হলে কি হত?’, বলে নিজেকে সামলে নেয় প্রশান্ত। ততক্ষণে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে কণ্ঠিধারীর দল।

নিজের মনেই কিছুটা লজ্জা পায় প্রশান্ত। তার বন্ধুরাও তাকে এই নিয়ে খ্যাপায়, বাড়িতে বোন-ও। আসলে বরাবরই সে ভালো ছাত্র ছিল। বাবা বড় ইন্ড্রাস্ট্রিয়ালিস্ট। ছোট থেকে বেশ খানিকটা প্রোটেক্টেড চাইল্ড হিসাবে মানুষ হয়েছে- ‘বাড়ি-গাড়ি স্কুল’ আর ‘বাড়ি-গাড়ি-কলেজ’। হায়ার সেকেন্ডারির পরে বাবা পাঠিয়ে দেন অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে এক বিখ্যাত বেসরকারি ইউনিভার্সিটিতে। এই সাত বছরে সে মনে-প্রাণে প্রায় ওদেশেরই বাসিন্দা হয়ে গেছে। তার ভারতীয়ত্ব কেবল পাসপোর্টে। এখানে আজ আসাটাও হঠাৎ। ছোট থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি ফোটোগ্রাফি ও ভিডিওগ্রাফি প্রশান্তের পছন্দের বিষয়। এতটাই পছন্দের যে, সুযোগ পেয়ে এক্সট্রা পেপার হিসেবে ইউনিভার্সিটিতে ভিডিওগ্রাফির কোর্স নিয়েছিল। এবার মেন্টর প্রোজেক্ট দিয়েছে- ‘ওরিয়েন্টাল রিলিজিয়াস বিলিভস’। খটোমটো টপিক। তার ভিডিও করতেই এই গণ্ডগ্রামে আসা। কাজটা তবে বেশ মনের মতো- বাউল গান, পুরোনো মন্দির, কৌপিনপরিহিত সাধু। বাচ্চা-ভিখারি পর্যন্ত সব ঠিকই চলছিল, বিটকেল গরমটা ছাড়া। বাদ সাধল নতুন একটা গণ্ডগোল। পুরোহিত মশাই কখন যে পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন খেয়াল হয়নি, নির্নিমেষে প্রশান্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। মৃদুস্বরে বললেন, ‘অহং ত্যাগ করো বাবা।’ প্রশান্ত ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে হনহনিয়ে হাঁটতে শুরু করে, কিছু প্রত্যুত্তর না করে।

যাক, দূরে একটা বিশাল গাছ দেখা যাচ্ছে। বটগাছই হবে হয়তো, নীচে ছায়া হয়ে আছে। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গাছের নীচে ছায়ায় এসে হাঁফ ছাড়ে। কাঁধের ব্যাগটা সাবধানে দুটো শিকড়ের মধ্যে রাখে। উঁচু শিকড় দুটোয় আটকে থাকে ব্যাগটা। নীচে ধুলো লাগে না। একবার দোনামনা করে- শিকড়ের ওপর বসবে কি? যাকগে, বাস আসার ওয়াস্তা। তাতে চেপেই কেটে পড়বে সে, শুধু-শুধু ব্র্যান্ডেড প্যান্টটায় নোংরা লাগানোর কোনও মানে হয় না। বড় গাছটার নরম ছায়াতে বেশ আরাম বোধ হতে থাকে। এতক্ষণে নজর পড়ে, গাছের পাতাগুলোর ফাঁক দিয়ে ছেঁড়া-ছেঁড়া রোদ্দুর মাটিতে বেশ একটা নকশা ফুটিয়ে তুলেছে- ঠিক সাদা কালো পশমের চাদরের মতো। অনেক ছোটবেলার স্মৃতি জেগে ওঠে মনে। মা শীতে এরকমই একটা চাদর গায়ে দিয়ে হাসত, মায়ের গায়ে লেপটে থাকা ওই চাদরের গন্ধ, চাদরের ওম- সেই ছোটতে মা-কে হারানোর ব্যথাটা আজও গাছের গুঁড়ির নীচের জমাট ছায়ান্ধকারের মতোই জমে আছে মনের কোণে। কী জানি, মা থাকলে হয়তো সে অন্যভাবে বড় হত। পুরোহিত মশায়ের শেষ কথাটা যে তার মনের অনেকটা ভিতরে চাপা পড়ে যাওয়া নরম পলিমাটিতে আঁচড় কেটেছে তা সচেতনভাবে বুঝতেও পারে না প্রশান্ত।

ফোঁ, ফোঁ, ফ্যাঁ, ফ্যাঁ – ল্যাগব্যাগ করতে করতে একটা বাস এসে থামল সামনে। ‘পাপিয়া, পাপিয়া’ মুহূর্তের মধ্যে একটা চ্যাঁচামেচি, খিঁচিমিছি পরিবেশ তৈরি করে একদল মহিলা-পুরুষ এসে উঠতে থাকল বাসে। এই সেরেছে! প্রশান্ত ঝটপট বাসে উঠতে গিয়ে দেখল সকলেরই কপালে তিলক। খেয়াল করল বাসের নাম ‘পাপিয়া’। বাঃ বেশ বাহার রয়েছে নামের। ঝটপট একটা জানলার ধারের ফাঁকা সিটে বসল। পাশের আসনটা ফাঁকা। পুরোনো ফাটা রেক্সিন-এর কভার থেকে নারকেলের ছোবড়া বেরিয়ে এসেছে। গোটা বাসটাই ক্রমে ভরাট হয়ে এল প্রায়। ফোঁ, ফোঁ, ফ্যাঁ, ফ্যাঁ- বিটকেল হর্ন দিয়ে চাকা গড়াল। যাক, পাশের সিটটা ফাঁকাই যাবে মনে হচ্ছে- একটু হাত-পা ছড়িয়ে বসে যাওয়া যাবে। গ্রামের প্রায় কিনারে বাসটা হঠাৎ ব্রেক কষল। তাকিয়ে দেখে সামনের রাস্তায় মাঝবয়সি মোটাসোটা কালো রঙের এক মহিলা হাত তুলে বাসটা থামিয়েছে। পরনে বোষ্টমীদের সাদা কাপড়, গলায় কণ্ঠি, কপালে তিলক, কাঁধে ঝোলা- বাঃ পারফেক্ট বোষ্টমী আউটফিট। গুটি-গুটি পায়ে বাসে এসে ওঠে বোষ্টমীটি- বাসের প্রায় সকলেই উঠে দাঁড়িয়ে প্রণাম জানায় বোষ্টমীকে, দেখে প্রশান্ত। এদের লিডারগোছের হবে বোধহয়। হেলতেদুলতে এসে প্রশান্তর পাশের সিটেই ধপ করে বসে মহিলাটি- তোমার অসুবিধা করলাম বাবা! আবার বৈষ্ণব বিনয়ে ছিড়বিড় করে ওঠে মনটা। তেতো মুখে বলে- ‘না বসুন, অন্য সিট তো আর ফাঁকা নেই।’ একটু জানলার দিকে সরে বসে সে।

-বাবা কি আমোদপুর পর্যন্তই যাবে? গায়ে পড়ে আলাপ করে মহিলা।

-হ্যাঁ! ভদ্রতা রক্ষা করার জন্যই বলে প্রশান্ত- আপনি?

-আমরা বাবা বিল্বগ্রামে নামব সবাই। মাধুকরী করতে বেরিয়েছি বাবা। মায়ের বই-এর আলমারিতে একটা এই নামেই বই আছে যেন- লেখক যদ্দুর মনে পড়ছে বুদ্ধদেব গুহ। বই ছিল মায়ের প্রাণ।

-মাধুকরী মানে? একটু কৌতূহলী হয় প্রশান্ত।

-ভিক্ষা বাবা! দারুণ অবাক হয় প্রশান্ত। সেজেগুজে, পায়ে কেডস জুতো পরে বাসে করে ভিক্ষা করতে যাওয়া দলবেঁধে?

-মানে? মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে প্রশান্তর।

-অবাক হলে! না, বাবা! এটা একটু অন্যরকম ভিক্ষা বাবা। মধুকর মানে তো জানোই নিশ্চয়। ভ্রমর যেমন ফুলের শুধু মধুটুকু নেয় ফুলের কোনও ক্ষতি না করে, মাধুকরীও তেমনি নিজের জীবনধারণের জন্য যেটুকু প্রয়োজন সেইটুকুই যাচনা করা। দিনের প্রয়োজনটুকু মাত্র সংগ্রহ করা, তার বেশি নয়, কালকের জন্য বা ভবিষ্যতের জন্য জমানো নয়। তা যদি এক গৃহস্থতেই মিটে যায় তো তাই, যদি দুই বাড়ি বা তিন-চার বাড়ি যাচনা করতে হয় তো তাই। বেশ ইন্টারেস্টিং লাগছিল প্রশান্তর। জানতে চায়- রোজ করেন?

-বাবা প্রথা তো তাই-ই। পারি আর কোথায় আমরা! সাংসারিক জীব সংসার কাজেই ডুবে থাকি, তবে আমাদের এই গ্রামে প্রথাটা রয়ে গেছে। প্রতি রবিবার আমরা দলবেঁধে আশপাশের গ্রামে মাধুকরী করি। দুপুর-দুপুর বেরিয়ে সন্ধ্যায় ফিরি। আমি তো ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, তখন দাদু-দিদা-বাবা-মার সঙ্গে যেতাম, এখন এই এদের নিয়ে যাই।

– আপনার পরিবারের আর কেউ? একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞাসা করে প্রশান্ত। আমার ছেলেমেয়েরা বাবা আজকের যুগের- এই তোমার মতোই- পড়াশোনা শিখিয়েছি, চাকরি করে। বড় ছেলে কাছেই প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার, ছোট বারো ক্লাসে পড়ে। মেয়ের বিয়ে দিয়েছি সাঁইথিয়ায়। জামাইয়ের আমার মোটর সাইকেলের শোরুম, রমরমা অবস্থা। তাদের লজ্জা হয় ভিক্ষায় বেরোতে।

-তা ঠিক। বলে প্রশান্ত। কপালে তিলক, গলায় কণ্ঠি পরে রাস্তায় বেরোনো একটু এমব্যারাসিং বটে!

-এগুলো তো প্রথা, বাবা। মনে করানোর জন্য- আমরা কারা, আমরা কী? কপালের এটাকে রসকলি বলে। শৈবদের ত্রিপুণ্ড্র ত্রিশুলের মতো কপালে তিনটি রেখা সন্তু, তমঃ, রজঃ গুণের প্রকাশ। সব মিলিয়েই তো মানুষ।

– আপনার তো দেখি দুটো রেখা, অ্যাড হয়ে একটাতে মিলেছে।

– জীবাত্মা আর পরমাত্মা বাবা। দুই-ই গিয়ে মিলছে সবই এক, কোনও ভেদ নেই। অদ্বৈত কোনও দ্বৈত ভাব নেই। গলায় কণ্ঠি, এও তো তোমরা যাকে ইংরেজিতে বল রিমাইন্ডার। ব্রাহ্মণের পৈতের মতো পৈতের সুতোগুলো একেকটা একেক কথা মনে করিয়ে দেয়। মিথ্যা বলব না, ত্রিসন্ধ্যা করব, শাস্ত্র পাঠে থাকব ইত্যাদি। কণ্ঠি আমাদের মনে করিরে দেয় বাহ্যিক জগতে খারাপ কাজ করা থেকে বিরত থাকো। সব ধর্মের সার কথা একই বাবা- নিজেকে তাঁর চরণে সমর্পণ করো, সৎপথে সৎভাবে থাকো। বৈষ্ণব, শাক্ত, বিষ্ণু, চণ্ডী সব একাকার বাবা। চণ্ডীর স্তব জানো?

‘ইয়া দেবী সর্বভূতেষু শক্তি-বুদ্ধি, বিষ্ণুমায়েতি’ দ্যাখো চণ্ডীর স্তবেও বিষ্ণুমায়া।

রাস্তায় দু’পাশের সর্ষেফুলের হলুদ চাদর চিরে বাস চলেছে। বেশ জোরে চলাতে খোলা জানলায় হাওয়ার স্রোত ঝাপটা মারছে শরীরে। প্রশান্তর মনের মধ্যেও চলছে তেমনি অজস্র স্রোতের প্রবাহ। নিদারুণ অবাক হয়ে সে জানতে চায় –

আপনার পড়াশোনা কদ্দুর? – ইতস্তত করেই জানতে চায়।

– আমি বিশ্বভারতী থেকে বাংলায় এমএ পাশ বাবা। পরে ডক্টরেট করেছি প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে। এই গ্রামেই বাপের বাড়ি, শ্বশুরবাড়ি। গ্রামের ছোট বাচ্চাদের পড়াই, খানিকটা শখে- খানিকটা স্বভাবে, বাচ্চাদের সঙ্গে মিশে থাকলে মনটাও বুড়িয়ে যায় না বাবা। এক প্রকাণ্ড তিনতলা বাড়ির সামনে থেকে ভদ্রমহিলা বাসে উঠেছিলেন, মনে পড়ল প্রশান্তর, কয়েকটা কচিকাঁচাও কলকল করতে করতে বেরোচ্ছিল লোহার গেটটা দিয়ে।

-ওই . . . ওই তিনতলা বাড়িটা আপনার?

-হ্যাঁ বাবা। একটু অন্যমনস্ক স্বরেই বলতে থাকেন মহিলা- আমরা আমাদের অহং ত্যাগ করতে পারি না বলেই এত সমস্যা। জানো বাবা, মহাপ্রভুর সময়কালে বা তারও আগে আমাদের বৈষ্ণবদের একাধিক বিদ্যায় শিক্ষিত হতে হত। অাধ্যাত্ম সাধনা তো বটেই- তাছাড়াও শাস্ত্র-সাহিত্য, গীত-নৃত্য, বাদ্য, বেদ-বেদান্ত, রন্ধন-শিল্প- এগুলো সবই সাধনার অঙ্গ, কিন্তু নাম-যশের প্রত্যাশা খুব ঘৃণার ব্যাপার কারণ তাতে অহং প্রতিষ্ঠা হয়- ঈশ্বর আরাধনার মস্ত এক বাধা। শ্রীশ্রী চৈতন্য চরিতামৃত-য় আছে-

‘পঞ্চতত্ত্বাত্মকর কৃষং ভক্তরূপ স্বরূপকম্

ভক্তাবতারং ভক্তাঘ্যাং নমামি ভক্তিশক্তিকং’

-পঞ্চতত্ত্বময় শ্রীকৃষ্ণ তার স্বরূপ, ভক্তরূপ, ভক্ত অবতাব, ভক্তশক্তি- তাদের প্রণাম করি। আমাদের বৈষবশাস্ত্রে চার রকমের ভাব তো আগেই ছিল – শান্ত, দাস্য, সখ্য ও বাৎসল্য। মহাপ্রভু প্রবর্তন করলেন কান্ত বা মধুর ভাব। সবই ঈশ্বরে সমর্পণের রাস্তা বাবা। অহং স্বচরিত্রকে টেনে নীচেই নামায়। তার আর কোনও কাজ নেই।

একটা ঘোরের মধ্যে বসে থাকে প্রশান্ত। তীব্র গতিতে চলা বাস, হু-হু করে আসা হাওয়া, বাইরের সূর্যতাপ, দু’পাশের গ্রাম পরিবেশের শ্রীমাধুর্য সব ছাপিয়ে তার মন এক অনাস্বাদিত পুলকে ভরে উঠছে, তার আমি-র আবরণ খসে পড়ছে, গুটি থেকে প্রজাপতির মতো এক নতুন প্রশান্ত-র জন্ম হচ্ছে। মহিলাকে প্রণাম জানিয়ে বাসটি দাঁড় করায় সে। নেমে পড়ে সেখানেই। ফিরতি বাসে সে ফিরে যাবে সেই বটতলায়। তার সুশীতল ছায়ায়, তার শিকড়ের খাজে হেলান দিয়ে বসবে সে জীবাত্মা, পরমাত্মা ছাপিয়ে নিজের মনেই উপলব্ধি করবে ভারতাত্মাকে- যা তার বিলেতের ইউনির্ভাসিটি শত প্রোজেক্টের মধ্যে দিয়েও তাকে শেখাতে পারবে না। তারপর সে যাবে লজেন্স কিনতে, ফুল্লরাতলার বাচ্চাগুলোকে দেওয়ার জন্য।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *