সনাতন ধর্মের দোহাই পেড়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বিআর গাভাইয়ের দিকে জুতো ছোড়া মোটেও সাধারণ ঘটনা নয়। অভিযুক্ত আইনজীবী রাকেশ কিশোরের বিরুদ্ধে সেই অর্থে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, এত বড় কাণ্ডে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শুধু নিন্দা করেই ক্ষান্ত থেকেছেন। তা-ও কংগ্রেস সংসদীয় দলের চেয়ারপার্সন সোনিয়া গান্ধি, লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধি প্রমুখ সরব হওয়ার অনেক পরে তিনি মুখ খোলেন।
প্রধান বিচারপতি বিষয়টি নিয়ে খুব একটা হেলদোল না দেখালেও তাঁর মা ও বোন ঘটনাটিকে কলঙ্কজনক আখ্যা দিয়েছেন। প্রধান বিচারপতির ওপর আক্রমণকে দেশের বিচার ব্যবস্থা ও সংবিধানের মর্যাদার ওপর আঘাত বলে মন্তব্য করেছেন রাহুল। প্রধানমন্ত্রী তাঁর নিন্দাবার্তায় বলেছেন, প্রধান বিচারপতির ওপর আক্রমণ প্রত্যেক ভারতীয়কে ক্ষুব্ধ করেছে। একইসঙ্গে প্রধান বিচারপতি ওই ঘটনার পর নিজেকে শান্ত রাখায় তাঁর প্রশংসা করেন মোদি।
প্রধান বিচারপতিকে জুতো ছোড়া স্বাধীন ভারতে বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে নজিরবিহীন বলা চলে। পদমর্যাদার দিক থেকে প্রধানমন্ত্রীর থেকে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি কোনও অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নন। দুটিই সাংবিধানিক পদ। এরকম একটি উচ্চ পদাধিকারীর দিকে জুতো ছোড়া ভারতের বিচার ব্যবস্থার চরম অপমান তো বটেই। অভিযুক্ত রাকেশ কিশোরের সাফাই, সনাতন ধর্মের অপমান ভারত সহ্য করবে না। প্রধান বিচারপতি গাভাই অন্য ধর্মের ক্ষেত্রে ভিন্ন অবস্থান নেন বলে তাঁর দাবি।
প্রধান বিচারপতি গাভাই নিজে দলিত, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং আম্বেদকরবাদী। তাঁর বাবা আরএস গাভাই ছিলেন আম্বেদকরবাদী নেতা ও রাজনীতিক। ১৯৫৬ সালে বিআর আম্বেদকরের সঙ্গে তিনি বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে প্রধান বিচারপতিকে লক্ষ্য করে জুতো ছোড়া বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়। বরং মনুবাদী, ব্রাহ্মণ্যবাদী, কট্টর হিন্দুত্বের মতাদর্শের অনুসারী ভাবনার বহিঃপ্রকাশ ওই ঘটনা।
সম্প্রতি রায়বরেলিতে হরিওম বাল্মীকি নামে এক দলিত তরুণকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তার আগে রোহিত ভেমুলা নামে হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দলিত তরুণের আত্মহত্যাকে হেনস্তার জের বলা হয়েছিল। আদিবাসী তরুণের গায়ে প্রস্রাব করার মতো ঘৃণ্য অপরাধও এদেশে ঘটেছে। দলিতদের বিরুদ্ধে একের পর এক অত্যাচারের ঘটনা সামনে এসেছে। অথচ দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসটুকু দেওয়া ছাড়া কিছুই হয়নি।
দলিত, অনগ্রসর, আদিবাসীদের প্রতি সমাজের একাংশের বক্রদৃষ্টি যে স্বাধীনতার অমৃতকালেও রয়ে গিয়েছে, প্রধান বিচারপতি গাভাইয়ের দিকে জুতো ছোড়া তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। বিরোধী শিবির দলিতদের ওপর অত্যাচারের নিন্দা করে ঠিকই। কিন্তু দলিতবিরোধী মানসিকতা এখনও কোণঠাসা হয়নি। উগ্র হিন্দুত্বের ধ্বজাধারীরা উচ্চবর্ণের প্রাধান্য চান। জাতপাত, ধর্মবর্ণনির্বিশেষে সবাই যে ভারতবাসী, সেটা এখনও তাঁরা বুঝতে চান না।
হরিওম বাল্মীকির হত্যার নিন্দায় রাহুল এবং মল্লিকার্জুন খাড়গে যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, রায়বরেলিতে যা হয়েছে, তা দেশের সংবিধানের প্রতি ঘোরতর অপরাধ। ভারতে মেরুকরণ এখন প্রকট। আমরা-ওরার বিভাজনরেখায় চিহ্নিত করা হচ্ছে মানুষকে। ভাগবাঁটোয়ারার যে বীজ দেশভাগের সময় বপন করা হয়েছিল, তা এখন মহীরুহের আকার নিয়েছে। তার শিকড় ছড়াচ্ছে সমাজের অন্দরে। কখনও জাতপাত, কখনও ভাষা আবার কখনও ধর্ম নিয়ে।
এই বিভাজনকে সূক্ষ্মভাবে রাজনীতির অস্ত্রে পরিণত করা হচ্ছে। তাতে আমজনতাকে শামিল করানো হচ্ছে। ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে সকলেই যে মানুষ- সেই সরল সত্যিটাকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। যে ভারত বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের আদর্শকে আঁকড়ে ধরে স্বাধীনতার সংগ্রাম করেছিল, যে ভারত হাজারো অমিলের মধ্যে ‘মিলে সুর মেরা-তুমহারা’ ছন্দ-তালে একত্রিত হয়েছিল, সেই ভারতে বিভাজন ও বিভেদ ক্রমশ বাড়ছে। প্রধান বিচারপতির দিকে জুতো ছোড়া বা দলিত তরুণকে হত্যা তারই অশনিসংকেত।
The put up সংকট গভীরে appeared first on Uttarbanga Sambad.
