তিন হাজার বিঘা। সে কতটা জমি? যতদূর চোখ যায়, ততটা? নাকি তার থেকে বেশি, কে জানে! কতগুলো ঘরবাড়ি, ঘর কী বলছি, কতগুলো মহল্লা, গ্রাম ওই তিন হাজার বিঘার পেটে ঢুকে যাবে কে জানে! সেই বিশাল ভূখণ্ড একটা বেসরকারি সিমেন্ট কোম্পানির হাতে তুলে দিয়েছে অসম সরকার।
সিমেন্ট কোম্পানিকে অতটা জমি? শুনে অবাক হয়ে যাচ্ছেন তো? আরে, আমরা তো বটেই, অবাক হয়ে গিয়েছেন হাইকোর্টের জজও। বিস্মিত জজসাহেব বলেছেন, তিন হাজার বিঘা! সে তো একটা জেলার সমান। কেমন সিদ্ধান্ত এটা? এটা কি ইয়ার্কি হচ্ছে? ওই কোম্পানির উকিলবাবু কোর্টকে জানিয়েছেন, টেন্ডারের মাধ্যমে খনির লিজ পেয়েছেন তাঁরা।
অসমে এক শিল্প সম্মেলনে তাঁরা একটা সমঝোতাপত্রে সই করেছিলেন। তাতে এই প্রকল্পে ১১ লক্ষ কোটি টাকা লগ্নির কথা বলা হয়েছিল। গত অক্টোবরে অসম সরকার ওই সিমেন্ট কোম্পানির জন্য গোড়ায় ২ হাজার বিঘা জমি বরাদ্দ করেছিল। তার এক মাস পর ওই জমির লাগোয়া আরও ১ হাজার বিঘা তাদের দেওয়া হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে ওই বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে রাজ্য সরকারের ১১০ বিলিয়নের চুক্তি সই হয়।
এই চোখ ধাঁধানো চুক্তি না হয় একরকম। গোল বেধেছে আরেকটা জায়গায়। ওই বিপুল পরিমাণ জমি অসমের ডিমা হাসাও এলাকায়। ভারতীয় সংবিধানের ষষ্ঠ তফশিল অনুযায়ী যে এলাকা আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষিত। তাঁদের জীবনধারণ, বসবাসের অগ্রাধিকার দিতে সরকার আইনত বাধ্য। এই অঞ্চল উত্তর কাছাড় পার্বত্য স্বশাসিত পর্ষদের অধীন।
ক্ষিপ্ত আদালত সরকারের কাছে জানতে চেয়েছে, কী করে এত জমি একটি সিমেন্ট কারখানার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে? কোন নীতির ভিত্তিতে? ডিমা হাসাওয়ের উমরাংসো প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য বিখ্যাত। সেখানে রয়েছে উষ্ণ প্রস্রবণ। নানা ধরনের পরিযায়ী পাখি সেখানে আসে। রয়েছে নানা ধরনের প্রাণীও।
বিষয়টা প্যাঁচালো হয়ে পড়েছে এর সঙ্গে আদানিদের নাম জুড়ে যাওয়ায়। আদানিরা জানিয়েছে, অসমের কোকরাঝাড়ে তারা ১৬০০ মেগাওয়াটের তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র বানাতে চাইছে ঠিকই, কিন্তু ডিমা হাসাওয়ের সিমেন্ট কোম্পানির সঙ্গে তাদের কোনও লেনাদেনা নেই। ওটা আলাদা কোম্পানি। তবে বিতর্ক কোকরাঝাড়েও আদানিদের পিছু ছাড়েনি। সেখানকার পর্বতঝোরা এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগ করছেন, তাঁদের ৩৪০০ বিঘা জমি জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
যে জমিতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হবে আদানিদের। আদিবাসী ছাত্র সংগঠন দাবি করছে, এভাবে জমি দেওয়া অসাংবিধানিক। ষষ্ঠ তফশিলে আদিবাসীদের দেওয়া জমিতে অধিকার একমাত্র তাঁদেরই। সেই আইনের তোয়াক্কা না করে সবকিছু কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ওই এলাকায় রয়েছে পাগলিঝোরা সংরক্ষিত বনাঞ্চলও। বনভূমি সংরক্ষণের যাবতীয় আইন ভেঙে সেখানে আদানিদের জমি দেওয়া হয়েছে। এজন্য কোনও ছাড়পত্রও নেওয়া হয়নি।
জমি নেওয়ার আগে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কোনও আলোচনা হয়নি। সরকারি কর্তারা অবশ্য ভরসা দিয়েছেন, কথা না বলে কোনও জমি নেওয়া হবে না। আদানিরা জানিয়েছে, তারা অসমে এয়ারপোর্ট, গ্যাস, রাস্তা, পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানিতে আরও ৫০ হাজার কোটি টাকা লগ্নি করবে। তার মধ্যে জমি নিয়ে ঝামেলা সরকারের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। কীভাবে জমি অধিগ্রহণ করা হবে, তা নিয়ে চিন্তায় দু’পক্ষই।
এবছরের গোড়া থেকে বিক্ষোভে নেমেছেন আদিবাসীরা। কিন্তু আরও বড় বিতর্ক যে ছত্তিশগড়ের হসদেও আরান্দ সংরক্ষিত বনাঞ্চল নিয়েও। ওই এলাকায় বহু মানুষের বসবাস। তাঁদের মধ্যে বেশি গোন্ড আর ওরাওঁ জনগোষ্ঠীর। এখানেও চলছে খনির কাজ। তার জেরে বাস্তচ্যুত আদিবাসীরা। তাঁদের জমির অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তাঁরা নির্ভর করেন জঙ্গলের ওপর। অথচ কাটা পড়েছে লাখ লাখ গাছ। ফলে ন্যাড়া হয়ে পড়েছে বিস্তীর্ণ বনভূমি।
অসমের মতো ছত্তিশগড়ের সরকারও এই সংরক্ষিত বনাঞ্চলে খনি তৈরির অনুমতি দিয়েছে। এখানকার পারসা ইস্ট আর কান্তাবাসন কোল ব্লকে খনির জন্য যেসব কোম্পানি এসেছে, তাদের মধ্যে আছে আদানিরা। একইরকম অবস্থা ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায়। সেখানে তৈরি হয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্র। আদানিদের। এখানেও অভিযোগ, পশ্চাৎপদ শ্রেণির গরিবদের জীবনজীবিকা কেড়ে নেওয়ার।
ন্যায্য ক্ষতিপূরণ, প্রতিশ্রুতিমতো চাকরি না দেওয়ায় বিক্ষোভ দেখিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য একশো কিলোমিটার লম্বা পাইপে গঙ্গা থেকে জল আনার কথা। এর জন্য লাগবে মোট ১২১৪ একর জমি। তাতে চলে যাবে ১০টি গ্রাম। তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের ধুলোধোঁয়ায় ইতিমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন মানুষ। ক্ষতি হচ্ছে প্রকৃতির। কে শুনবে এসব কথা? প্রশ্ন তুললেই তো দেশবিরোধী তকমা সাঁটিয়ে দেওয়া হবে। সে হুমকি আগাম দিয়ে রেখেছেন গোড্ডার মাননীয় বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবে!
