মার্কিন খবরদারির কারণে বহুকাল রাষ্ট্রসংঘ (United Nations) এমনিতেই ছিল ঠুঁটো জগন্নাথ। এখন সেই ঠুঁটো জগন্নাথের অস্তিত্বও টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রসংঘের বিভিন্ন শাখা সংগঠন থেকে ক্রমাগত সরে দাঁড়াচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষার প্রশ্নে রাষ্ট্রসংঘের সমান্তরাল একটি সংস্থাও গড়ে ফেলেছে আমেরিকা।
দ্বিতীয়বার মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) বসার পর থেকে আমেরিকার এইসব প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছিল। ২০২৪-এর জানুয়ারিতে ফের প্রেসিডেন্ট হয়ে ট্রাম্প প্রথমে ঘোষণা করেছিলেন, কোভিড মোকাবিলায় ব্যর্থতার কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) (WHO) ছেড়ে বেরিয়ে যাবে আমেরিকা। ১৯৪৮ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে হু’র কর্মকাণ্ড চলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়মানুযায়ী, সদস্যপদ ছাড়তে হলে সেই দেশকে এক বছর আগে নোটিশ দিতে হয়। নিয়ম মেনে এক বছর আগে নোটিশ দিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। ঠিক এক বছর পর আনুষ্ঠানিকভাবে হু ছাড়ল আমেরিকা।
নোটিশের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমার শর্ত মানলেও বকেয়া অর্থ মিটিয়ে দেওয়ার শর্ত মানবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে মার্কিন সরকার। মজার বিষয় হল, বহু দশক আগে এইসব নিয়মকানুনের স্রষ্টা ছিল আমেরিকাই। বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে হু’র প্রাপ্য বকেয়ার পরিমাণ ২৬ কোটি ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় ২৪০০ কোটি টাকা)। নিজের চাপানো শর্ত আজ নিজেই ভাঙছে আমেরিকা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ছেড়ে আমেরিকা বেরিয়ে যাওয়ায় পৃথিবীতে বহু রোগের চিকিৎসা বড়সড়ো ধাক্কা খাবে। বিশেষ করে পোলিও নির্মূলকরণ, প্রসূতি ও শিশুদের পুষ্টিকরণ, এইডস ইত্যাদির চিকিৎসার যথেষ্ট ক্ষতি হল। ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, এখন থেকে হু-কে আর অনুদান দেবে না আমেরিকা। বিভিন্ন দেশে হু-তে কর্মরত মার্কিন অফিসারদেরও ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। হু’র সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগের আগে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রাষ্ট্রসংঘের ইউনেসকো ছেড়েও বেরিয়ে গিয়েছিল আমেরিকা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৫ সালে রাষ্ট্রসংঘ গঠনের লক্ষ্য ছিল একটাই- সারা বিশ্বে যুদ্ধ, হানাহানি, রক্তারক্তি বন্ধ করে শান্তি, সম্প্রীতি, উন্নয়ন, সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা সুনিশ্চিত করা। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট যা শুরু করেছেন, তাতে সেই লক্ষ্যে বিরাট আঘাত নেমে আসছে। যা বিশ্বজুড়ে চরম বিশৃঙ্খলার পূর্বাভাস দিচ্ছে।
আমেরিকার মতিগতিতে স্পষ্ট, আগামীদিনে আন্তর্জাতিক শান্তি-নিরাপত্তা বজায় রাখার দায়িত্ব তারা নিজের হাতে তুলে নিতে চাইছে। প্রসঙ্গটি এই কারণেই উঠল যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে ‘বোর্ড অফ পিস’ বা শান্তির পর্ষদ তৈরি করে দিয়েছেন। মার্কিন সরকারের দাবি, বিশ্বের ৬০ দেশের রাষ্ট্রনেতাকে এই পর্ষদে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ৩৫টি দেশ ইতিমধ্যে ওই পর্ষদে যোগও দিয়েছে।
আমেরিকা এই দাবি করলেও বাস্তব চিত্রটি অন্যরকম। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ট্রাম্পের আমন্ত্রণ এখনও পর্যন্ত গ্রহণ করেননি। ভারত ছাড়া ফ্রান্সের মতো বেশ কিছু বড় দেশ ট্রাম্পের আবেদনে সাড়া দেয়নি। শুধু ট্রাম্প নন, ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু মোদিকে এই ‘বোর্ড অফ পিস’-এ যোগ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী তাঁর আবেদনেও সাড়া দেননি।
মোদির দিক থেকে সাড়া না পেয়ে চূড়ান্ত হতাশ ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু উভয়ে। গাজা নিয়ে এই ‘বোর্ড অফ পিস’ কিন্তু আদতে রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কর্মসূচি ছিল। রাষ্ট্রসংঘের সেই কর্মসূচি ‘হাইজ্যাক’ করে নিয়েছেন ট্রাম্প। সবক্ষেত্রেই কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা ট্রাম্পের। সেটা ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ থামানো হোক বা অন্য কিছু। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী, উন্নত দেশ, অন্যতম প্রধান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যদি এমন স্বার্থপর, দায়িত্বজ্ঞানহীন, হঠকারী, আত্মকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে, তাহলে মানবজাতির সংকট নিশ্চিত বৈকি।
