বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে অন্নপূর্ণা যোজনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যতখানি রাজনৈতিক লাভ হয়েছিল, এখন ততটাই ক্ষতির সম্মুখীন রাজ্যের শাসকদল। অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা থেকে বঞ্চিত মহিলার মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। প্রমীলা বিক্ষোভ স্তিমিত হওয়ার কোনও লক্ষণ নেই আপাতত। বরং তা ক্রমবর্ধমান। ওই যোজনায় বঞ্চিতরা ভাতা না পাওয়া ইস্তক এই বিক্ষোভের আঁচ রাজ্য সরকারকে সহ্য করতে হবে মনে হচ্ছে।
এই বিক্ষোভের দুটি বিশেষ দিক যথেষ্ট ইঙ্গিতবাহী। প্রথমত, মহিলারা অরাজনৈতিকভাবে স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভে শামিল হচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, তাঁদের বিক্ষোভের মধ্যে একটি পরিকল্পনারও আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ফলে বিক্ষোভটি ভিন্ন মাত্রা পাচ্ছে। এই বিক্ষোভের যৌক্তিকতা স্বীকার করতে বাধ্য হওয়ায় সরকার আন্দোলন দমনে কোনওরকম প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে অপারগ হচ্ছে।
বিক্ষুব্ধদের মধ্যে যেমন সিপিএম, কংগ্রেস বা তৃণমূল সমর্থকরা আছেন তেমন বিজেপি সমর্থকরাও আছেন। ফলে এটি সর্বাঙ্গীণ সামাজিক বিক্ষোভের রূপ পরিগ্রহ করছে। পরিস্থিতি যাতে হাতের বাইরে না চলে যায়, তার জন্য সরকারের ইচ্ছা থাকলেও আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনের ফাঁসে তথ্য যাচাই প্রক্রিয়া প্রহসনে পরিণত হয়েছে। এই কারণেই সমস্যার তীব্রতা আরও বেড়ে চলেছে।
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে হাজার হাজার মহিলা নিজেদের অধিকারের দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন। তাঁদের আন্দোলনের জেরে ব্যাহত হচ্ছে জনজীবন। ক্ষুব্ধ মহিলারা কোথাও পথ অবরোধ করছেন, আবার কোথাও সরকারি দপ্তরের সামনে ধর্না ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন। বহু এলাকায় সরকারি আধিকারিকদের ঘেরাও করে রাখা হচ্ছে। নজিরবিহীন এই বিক্ষোভের জেরে গেরুয়া শিবিরের নেতারা চরম অস্বস্তির মধ্যে পড়ছেন।
রাজ্যের মন্ত্রী থেকে শুরু করে বিজেপির নির্বাচিত সাংসদ ও বিধায়করা সাধারণ মহিলাদের রোষের মুখে পড়ছেন। তাঁদের ঘিরে ধরে জবাবদিহি চাওয়া হচ্ছে। রাজ্যের পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালকে সরকারি বৈঠক মাঝপথে বন্ধ করে মহিলাদের সঙ্গে কথা বলে বিক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা চালাতে হয়েছে। মহিলাদের মূল প্রশ্ন, কেন বারবার আবেদন করা সত্ত্বেও তাঁরা প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন? সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, সরকার মহিলাদের প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারছে না।
পুরমন্ত্রী অবশ্য দাবি করেছেন, সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে যে তৃণমূল সমর্থকরা আছেন, তাঁদের অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবে ত্রুটিপূর্ণ তথ্য আপডেট করেছেন। এজন্য যোগ্য মহিলারা বাদ পড়ছেন। তৃণমূলের মদতে কেন্দ্রীয় প্রকল্পকে কালিমালিপ্ত করতে এই ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে বলেও তাঁর অভিযোগ। মন্ত্রীর কথা সত্য ধরে নিলে রাজ্য সরকারের অসহায়তাই প্রকট হয়। কারণ, এইসব কর্মীকে নিয়েই রাজ্য পরিচালনা করতে হবে সরকারকে।
এইসব কর্মীকে চিহ্নিত না করতে পারলে, সেটাও সরকারের ব্যর্থতা বলে পরিগণিত হবে। আত্মপক্ষ সমর্থনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অবশ্য বলেছেন, অন্নপূর্ণা যোজনা যাঁদের প্রাপ্য, তাঁদের অধিকাংশের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সেই অর্থ চলে গিয়েছে। কিন্তু তাঁর আশ্বাসবাণীর পরেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। বরং পরিস্থিতি জটিল হয়েছে বহু জায়গায় স্থানীয় বিজেপি নেতা-কর্মীরা বঞ্চিত মহিলাদের পাশে দাঁড়ানোয়।
তাঁদের মতে, গ্রামীণ এলাকার গরিব মহিলারা সত্যিই এই প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য। ঘরের মহিলাদের এই ক্ষোভকে বিজেপি সমর্থকরাও আর এড়িয়ে যেতে পারছেন না। ফলে দলের অন্দরে চাপা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। মহিলাদের স্পষ্ট বক্তব্য, যতক্ষণ না তাঁদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অন্নপূর্ণা যোজনার ভাতা ঢুকছে, ততক্ষণ আন্দোলন চলবে।
শুধু আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনের ওপর ভরসা করে এই সমস্যার সমাধান হতে পারে না। আমলারা সরকারের কাছে দায়বদ্ধ নিশ্চয়ই। কিন্তু নির্বাচিত সরকার আবার জনসাধারণের কাছে দায়বদ্ধ। নির্বাচনের আগে ভোটারের কাছে জবাবদিহির দায়িত্ব পালন করতে হয় জনপ্রতিনিধিদের। সরকারি কর্মীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয় সাধিত না হলে এই সমস্যার দ্রুত সমাধান অসম্ভব।
The put up রণংদেহি ‘অন্নপূর্ণা’ appeared first on Uttarbanga Sambad.
