তেরঙা ওড়ানোর দিন অন্য রংয়ের কারবার। কলকাতায় অ্যাকাডেমির একটি ঘরের রং পালটাল তিনবার। শেষবার নামলেন বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষ।
রূপায়ণ ভট্টাচার্য
আপনার সন্তানের পেন্সিল বক্সে রং পেন্সিলের সংখ্যা ঠিক ক’টা?
কোথায় স্বাধীনতা দিবসে তেরঙা নিয়ে লেখালেখি করব, তা না, লিখতে হচ্ছে অন্য তিন রং নিয়ে!
ওই রং পেন্সিলের কথা জানা থাকলে অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষকে পাঠিয়ে দিতে পারেন। অনেকদিন তিনি নেটে আমাদের ছড়া শোনাননি। ওঁকেই বিদ্রুপাত্মক ছড়া শোনাচ্ছেন নেটিজেনরা। রুদ্রনীল, না-না। রুদ্রগেরুয়া একটা পালটা ছড়া শোনাবেন বহুদিন পর। রুদ্রনীল নামটাই না পালটে ফেলেন তিনি।
স্কুলে সিক্স-সেভেনের আঁকা প্রতিযোগিতায় যারা কোনওদিন সান্ত্বনা পুরস্কারও পায়নি, এখন তারা রাজনীতির মঞ্চে নেমে ক্যানভাস ভরিয়ে দিচ্ছে। রং সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ একেবারে। তুলি হাতে সবাই এখন এক একজন প্রখ্যাত শিল্পী। কারও পছন্দ গেরুয়া। কারও আবার নীল-সাদা। মাঝখান থেকে দেওয়ালের চুনকাম বেচারা থরথর করে কাঁপছে।
কলকাতা শহরের আবহাওয়া এমনিতেই বেশ আর্দ্র। কিন্তু সেই আর্দ্রতার মধ্যে এখন উড়ছে রং-তুলির গন্ধ। সমস্যা হল, এই তুলিগুলো কোনও ছবির প্রদর্শনীতে যাচ্ছে না। এগুলো সোজা গিয়ে ঠেকছে দেওয়ালের গায়ে। অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের একটা ছোট্ট ঘর। ঘরটা সুবিশাল কোনও রাজপ্রাসাদ নয়। স্রেফ একটা সাধারণ ঘর। কিন্তু সেখানেই চলছে মহাকাব্যিক রঙের মহাযুদ্ধ।
প্রথমে বিজেপি সমর্থকরা এলেন। তাঁদের মনে হল, ঘরের দেওয়ালটা বড্ড ফ্যাকাশে। মেটে। একপোচ গেরুয়া লেপে না দিলে ঠিক ভারতীয় সংস্কৃতি রক্ষা হয় না। ব্যাস, অমনি রং মেরে দেওয়াল একদম সূর্যোদয়ের মতো রাঙিয়ে দেওয়া।
এর পর মাঠে নামলেন সিপিএম সমর্থকরা। লাল রং তখন ক্যাবিনেটে তালাবন্ধ নাকি? লাল না মেরে তাঁরা হঠাৎ আবিষ্কার করলেন, গেরুয়ার মোক্ষম জবাব নাকি সাদা। যেন শান্তির বার্তা দিচ্ছেন! বোতল বোতল সাদা রং এনে এক নিমেষে গেরুয়া ঢেকে গেল। প্রাচীর ফিরে পেল তার তথাকথিত ‘নিরপেক্ষ’ ধবধবে চেহারা।
খবর পৌঁছোল অভিনেতা-বিধায়কের কানে। যিনি সিপিএমের লাল গলি পার করে, তৃণমূলের নীল-সাদা অলিন্দ ঘুরে, এখন বিজেপির গেরুয়া পতাকা কাঁধে তুলে নিয়েছেন। রুদ্রনীল ঘোষমশাইয়ের পথচলাটা রোমাঞ্চকর ট্রাভেলগের চেয়ে কম কীসের! অভিনেতা ভালো হতে পারেন, রাজনীতিতে তিনি ধান্দাবাজির সুধা খেতে অভ্যস্ত। আরও বেশি অভ্যস্ত দাদাগিরিতে। তিনি তাঁর দলবল নিয়ে ছুটে এলেন। তাঁকেও তো ফুটেজ খেতে হবে!
তাঁর মতে, সাদা রং নাকি ঘোর অপরাধ! অতএব, আবার বেরোল গেরুয়া বালতি। অভিনেতা বিধায়কের নেতৃত্বে দ্বিতীয় দফায় সেই সাদা আবার ঢেকে গেল গেরুয়ায়। অভিনেতা রুদ্রনীল আর গায়ক ইন্দ্রনীলে ফারাক নেই কোনও। দল বদলানোয় মাস্টার, সুপার জিনিয়াস। সব সময় অনুগামী তৈরিতেও সুপারহিট। অনেক অবাঙালি রুদ্র-কর্মী সেখানে বাংলা থিয়েটার নিয়ে ভাষণ দিলেন। অহো, কত বঙ্গ নাট্যকর্মী। শ্যামানন্দ জালান, চেতনা জালান, ঊষা গাঙ্গুলিরা যদি থাকতেন ওখানে!
এই তো দেখলাম, যেদিন বিধায়ক হলেন রুদ্রনীল, তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে গেলেন রাতারাতি দলবদলিয়া পরিচালক, সুরকার, মিডিয়ার জনা চারেক লোক। ছাড়েনই না রুদ্রনীলকে। ক্ষমতার অলিন্দে ঘুরপাক খেয়ে ইন্দ্রনীলের গান গিয়েছে, রুদ্রনীলের অভিনয় না মার খায়। হলে বাংলা ছবির ক্ষতি। এঁরা কেউই বুঝলেন না, সব মৌমাছি ভনভন করছে তিনি ক্ষমতায় বলে। ক্ষমতায় না থাকলে কাছের লোকগুলো চোখ উলটে দেবে। জড়ানো গলায় বলবে, আপনি কে! সেই রুদ্র অবধারিত রং বিশেষজ্ঞ হয়েছেন অনুগামীদের কথায়— দাদা আপনিই পারেন! কিন্তু তিনি গেরুয়া ও মেটে রঙের ফারাকই জানেন না।
দু’দিন আগে দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য অতি বিজেপিদের সতর্ক করেছিলেন রং নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার জন্য। রুদ্রনীল সেটাও মানেননি। মনে হবে, থিয়েটার, সিনেমা, সিরিয়াল— সব নাকি তাঁর সম্পত্তি! এতে আর অরূপ-স্বরূপের সঙ্গে ফারাক কোথায়! আর দু’দিন পরে এই লোকগুলো ব্যান কালচার শুরু করে দেবেন তো! রুদ্রনীল গেরুয়া রং করতে এসে সিপিএমকে তেড়ে আক্রমণ করেছেন। একসময় তিনি ওই দলেরই ছায়ায় ছিলেন। তৃণমূলের আমলে তো সরকারি মাইনে, সুযোগসুবিধে নিতেন। এত সক্রিয় হয়ে তিনি কী বোঝাতে চাইছেন, তাঁর মতো অতি-বিজেপি আর কেউ নেই?
ভাবুন একবার অবস্থাটা! দেওয়ালের এক ইঞ্চি জায়গায় কতটা রঙের প্লাস্টার জমা হলে তা ভেঙে পড়ে, সেই নিয়ে পদার্থবিদদের গবেষণা শুরু করা উচিত। এক পক্ষ মারছে গেরুয়া। অন্য পক্ষ ঢালছে সাদা। আবার এসে সেখানে দেওয়াল হচ্ছে গেরুয়া। রুদ্রর রাজনীতিতে রং বদলের খেলা যেমন ক্ষমার অযোগ্য, তেমনই হাসির খোরাক অ্যাকাডেমির একটা ছোট্ট ঘরের রং বদলের খেলায় বড় প্লেয়ার হওয়া।
দাদাগিরির এই ডিজিটাল মডেল সত্যিই প্রশংসনীয়। একটা সামান্য ঘর নিয়ে এই যে মহাভারতের যুদ্ধ, একে রাজনৈতিক কৌশল বলবেন নাকি শিশুসুলভ বাহাদুরি বলবেন? না ক্ষমতার স্পৃহা! এটা এত ভয়ংকর যে শিবপুরের রুদ্রনীল টালিগঞ্জে এসে দাদাগিরি করতে চান। তা নিয়ে টালিগঞ্জের বিধায়ক পাপিয়া অধিকারী, যাদবপুরের শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের মারাত্মক গোঁসা। হতে পারে। তাঁদের উত্তমকুমার শতবার্ষিকী উদযাপন কমিটিতে রাখা হয়নি অজ্ঞাত কারণে। কার অঙ্গুলিহেলনে ভাই!
আসলে দল পালটায়। জমানাও পালটায়। কিন্তু দাদাগিরির মূল ধারাটা একই থেকে যায়।
আজকে যারা গেরুয়া নিয়ে চ্যাঁচামেচি করছে, কিছুদিন আগে নীল-সাদা ছিল তাঁদের চোখের শূল। তৃণমূল যখন ক্ষমতায় এল, পুরো শহরকে নীল-সাদা করে দেওয়ার হিড়িক উঠেছিল। নবান্ন থেকে শুরু করে উড়ালপুল, ব্রিজের রেলিং, এমনকি রাস্তার ট্রাফিক পোস্ট— সব নীল-সাদা। নবান্নের সামনের রূপ বদলে গেল। নতুন প্রতীকের মহিমা চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল।
এখন আবার শাসকের নীল-সাদা দেখলে অ্যালার্জি। নীল-সাদা রং নাকি স্রেফ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত পছন্দের প্রতীক!
অথচ এই মানুষগুলোর অনেকে বিশ্বকাপের সময় কী অদ্ভুত কাণ্ডটাই না করেছিল! আর্জেন্টিনা যখন বিশ্বকাপ ফুটবলে খেলছিল, এরা তখন রাত জেগে নীল-সাদা পতাকা ওড়াত। গায়ে নীল-সাদা জার্সি চাপিয়ে রাস্তায় চিৎকার করত। তখন কিন্তু সেই নীল-সাদায় কোনও রাজনীতি থাকত না, কোনও অ্যালার্জি ধরে না। আর্জেন্টিনা জিতলে উল্লাস, কিন্তু শহরের দেওয়ালে নীল-সাদা দেখলে ক্ষোভ! এই বৈপরীত্য সত্যিই চমৎকার।
রং নিয়ে এই ছেলেখেলা এখন এক চূড়ান্ত রসিকতায় পরিণত। রঙে কি কোনও মতাদর্শ থাকে? নাকি একটা রঙের বালতি খালি করলেই কোনও দলের নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়?
দেওয়ালগুলো যদি কথা বলতে পারত, তবে বলত, ‘ভাই, তোদের রাজনীতির চক্করে আমাদের চামড়া উঠে গেল! একটু তো রেহাই দে!’
রুদ্রনীলদের মতো নেতারা অবশ্য এই সহজ সত্যটা বুঝবেন না। লাল থেকে নীল-সাদা, নীল-সাদা থেকে গেরুয়া— রঙের মতো পোশাক এবং দল বদলানোর খেলা যাঁদের অভ্যাসে পরিণত, তাঁদের কাছে রঙের রাজনীতিই আসল কথা। আজ এখানে গেরুয়া চড়াবেন, কাল হয়তো হাওয়া বদলালে অন্য কোনও রঙের বালতি হাতে দাঁড়িয়ে পড়বেন।
সমস্যা হল, সাধারণ মানুষের সমস্যা কিন্তু সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। রুটি, রুজি, চাকরি কিংবা রাস্তার গর্ত— সেগুলোর সমাধান কোনও রঙেই হচ্ছে না। তাতে মাথাব্যথা নেই রুদ্রনীলদের। কিন্তু শহরের দেওয়ালে কার রং কতটা গাঢ় হল, তা নিয়ে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে।
একদল ভাবছে, গেরুয়া লেপে দিলেই বোধহয় সংস্কৃতি বেঁচে গেল। অন্য দল ভাবছে, সাদা করলেই সব বিশুদ্ধ হয়ে গেল। আর সদ্য বিরোধীদের এক অংশ ভাবছে, নীল-সাদা না থাকলে বুঝি তাদের অস্তিত্বই মুছে যাবে। মীরজাফরদের রং নিয়ে মাথাব্যথা নেই।
এ যেন একটা মস্ত বড় সার্কাস। আর সেই সার্কাসের রিংমাস্টাররা হাতে চাবুকের বদলে তুলে নিয়েছেন রঙের তুলি আর রঙের বালতি।
কলকাতার সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে কী জন্য এই নাটক? উত্তর একটাই। নিজেদের ক্ষমতা জাহির করার জন্য। ‘আমি এলাম, আমি দেখলাম, আর আমি আমার রঙের পোচ মেরে গেলাম’ —এই হল বর্তমান রাজনীতির মূল মন্ত্র।
সামনে হয়তো আবার কোনও নতুন দল আসবে। তারা এসে বলবে, এই কোনও রংই চলবে না। তারা নিজেদের নতুন পছন্দমতো সবুজ বা বেগুনি রং লেপে দেবে। আর আমাদের বেচারা দেওয়ালগুলো সেই ভার বহন করে যাবে।
রং আসলে চোখের শান্তি দেয়। অবশ্য কলকাতার রাজনীতিতে রং এখন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে রুচির দুর্ভিক্ষ।
রাজনীতি উন্নয়ন ছেড়ে স্রেফ দেওয়াল রাঙানোর প্রতিযোগিতায় নেমে এলে বুঝে নিতে হয়, ধারণক্ষমতা ঠিক কতটা তলানিতে।
পেন্সিল বক্সের সবক’টা রংই সুন্দর। শুধু রাজনৈতিক নেতাদের হাতের বালতিতে পড়লেই তারা বিশ্রী রূপ নেয়। ক্যানভাস তৈরিই আছে। আপনারা কি শুধু রঙের পোচ দেখে হাততালি দেবেন, নাকি এবার শিল্পীদের আসল মুখোশটা খুলে নেওয়ার সাহস দেখাবেন? সিদ্ধান্ত শুধুই দর্শকাসনে বসে থাকা সাধারণ জনতার।
(লেখক সাংবাদিক)

