যে হাতে ক্ষমতা, সেই হাতে বন্দি বঙ্গ বিবেক

যে হাতে ক্ষমতা, সেই হাতে বন্দি বঙ্গ বিবেক

শিক্ষা
Spread the love


রূপায়ণ ভট্টাচার্য

পঁচিশে বৈশাখ। সদ্য প্রাক্তন হয়ে যাওয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের বাড়িতে রবীন্দ্র স্মরণে অনুষ্ঠান করছেন। এবারই প্রথম রবীন্দ্র সদনে সরকারি অনুষ্ঠান হয়নি। ফলে মমতার বাড়ির অনুষ্ঠানের দিকে নজর ছিল অনেকের।

সেখানে দেখা গেল, বাচিকশিল্পী প্রণতি ঠাকুর, সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং গায়ক বাবুল সুপ্রিয় ছাড়া কোনও পরিচিত মুখ নেই। অভিনেতাদের মধ্যে শুধু সুভদ্রা মুখোপাধ্যায়। এমনকি মমতার খুব কাছের শিল্পী ইন্দ্রনীল সেন পর্যন্ত হাওয়া।

মমতার সভা থাকলে এতদিন নচিকেতা, কবীর সুমন, শ্রীরাধা বন্দ্যোপাধ্যায়, ইমন চক্রবর্তী, রূপঙ্কর বাগচী, সৈকত মিত্র, মনোময় ভট্টাচার্যদের মতো শিল্পীদের সহাস্য উপস্থিতি অবধারিত ছিল। এখন এক মুহূর্তে তাঁরা হাওয়া। মমতার কাছে তাঁদের আর কিছু পাওয়ার নেই। সিনেমা ও টিভি সিরিয়ালের এক ঝাঁক কচিকাঁচা ঘিরে থাকতেন মমতাকে। তাঁরাও কেটে পড়েছেন কিছু মিলবে না বুঝে।

মমতা এখন প্রাক্তন। কে আসবে তাঁর কাছে?

মমতাকে নিয়ে লেখাটা নয় আদৌ। এই ছবিটা এখন বঙ্গসমাজের প্রতিটি দিকে ছড়িয়ে। স্কুল থেকে কলেজ, সরকারি অফিস থেকে হাসপাতাল, বাড়ি থেকে আত্মীয়ের বাড়ি, পঞ্চায়েত থেকে জেলা পরিষদ, সিনেমার আর্টিস্ট ফোরাম– সর্বত্র এই পালটিবাজির খেলা। মমতাকে দিয়ে লেখাটা শুরু হল, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই কথাগুলো বিমান বসু বা সূর্যকান্ত মিশ্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এতদিন প্রযোজ্য ছিল শমীক ভট্টাচার্যদের ক্ষেত্রেও।

কেউ ক্ষমতায় থাকলে তাঁকে ঘিরে ধরে মৌমাছির মতো ভিড়। তাঁর এমন প্রশংসা যে মনে হবে, তিনি অন্য গ্রহ থেকে এসেছেন। তাঁকে ঘিরে উৎসব, তাঁর টাকায় খাওয়াদাওয়া, প্রতি মুহূর্তে তাঁকে আকাশে তুলে দেওয়া। এবং যখনই এই লোকটির খারাপ সময় আসবে, তাঁকে গণপ্রত্যাখ্যান করে দূরে বসে মজা দেখা। তখন আবার ওই প্রশংসাকারীরাই নিন্দার ডালি নিয়ে বসবেন প্রকাশ্য রাস্তায়। ভুলে যাবেন তাঁরা কী বলতেন এতদিন। ভুলে যাবেন ওই লোকটি তাঁর কী কী উপকার করেছেন।

টালিগঞ্জের সিনেমাপাড়া, ময়দানের খেলাপাড়া, অ্যাকাডেমি এলাকার নাটক মঞ্চ, সর্বত্র দেখবেন একই দৃশ্য। সাহিত্যিক, অভিনেতা সবাই জনতার মতো হয়ে উঠবেন। আগ বাড়িয়ে নিন্দা শুরু করবেন প্রতিপক্ষের চোখে পড়ার জন্য। এতদিন যাঁর ক্ষীর খেয়েছেন, দিব্যি ভুলে বলে দিতে পারেন উনি তো আমাকে জোর করে করলার রস খাওয়াচ্ছিলেন।

অতীতে বাঙালির সঙ্গে অন্য রাজ্যের লোকেদের মনোভাবের ফারাক ছিল। এখন আর নেই। এখন সবার হাতে ফেসবুক। সবাই সাংবাদিক, সবাই বিশেষজ্ঞ হতে চান। তার জন্য না হয় নিজেরা ডিগবাজি খেয়ে নিলাম হঠাৎ। তাতে কী এসে গেল। ভোটের রেজাল্ট বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে অটোরিকশার ড্রাইভাররা গাড়িতে পদ্মের পতাকা লাগিয়ে এদিক-ওদিক ছুটেছেন। ওই অজানা মুখগুলোর সঙ্গে গায়ক, অভিনেতা, প্লেয়ার, নেতাদের কোনও ফারাক নেই।

ক্ষমতার কাছে মাছির মতো ভনভন করা এটা বাঙালির সাম্প্রতিকতম রোগ। আদর্শকে মারো গুলি। কাল ওই আদর্শ ছিল, আজ অন্য আদর্শ। দুটোর মধ্যে আকাশপাতাল ফারাক থাকলেও কোনও অসুবিধা নেই। আপনার হাতে প্রচুর ক্ষমতা। তখন দেখবেন লোকে আপনার কী প্রশংসা করছে। যেই তারা বুঝে গেল আপনার হাতে আর কোনও ক্ষমতা নেই, আপনার প্রতি তাদের মনোভাবই পালটে যাবে। স্যর থেকে তুইতোকারিতে নেমে যাবে রাতারাতি।

আমাদের সমাজের একদল লোককে আমরা দেখতে পাচ্ছি, যারা মাছির ডানা লাগিয়ে ‘ক্ষমতা’র বিশাল হাতের চারদিকে ভনভন করছে। তাদের লোভাতুর দৃষ্টি শুধু সুবিধার ওপর। যে হাত ক্ষমতার লোভ দেখায়, বাঙালির বিবেক আজ সেই হাতেই বন্দি।

এই ঘিঞ্জি, বিশৃঙ্খল বাজারের নাম দেওয়া যেতে পারে ‘সুবিধা বাজার’ বা ‘সুবিধেগঞ্জ’। এখানে আদর্শ, বিবেক বা পুেরানো সম্পর্কের কোনও মূল্য নেই। এই ভিড়ের নীচে চাপা পড়ে আছে কিছু ছোট ছোট প্রতীকী মূর্তি : ‘আদর্শ’, ‘বিবেক’, ‘পুরানো কৃতজ্ঞতা’। সবার চোখে শুধু লোভ, সবাই আঁকড়ে ধরতে চায় সেই সুবিধাবাদী হাত।

বৃহস্পতিবারই শুনলাম, কলকাতা মেডিকেল কলেজের ৭২ জন ডাক্তার একসঙ্গে আরএসএস দপ্তরে গিয়ে সমর্থন জানিয়ে এসেছেন। সিপিএমের আমলে এঁরা ছিলেন তাঁদের লোক। তৃণমূল আমলে তৃণমূলের। এখন আর জার্সি পালটাতে সময় নেননি।
এই সামাজিক অবক্ষয়ের দ্রুত গতির পেছনে কারণ কী? দর্শনের এক অধ্যাপক জোর দিলেন বস্তুবাদী প্রতিযোগিতার ওপর। তাঁর ব্যাখ্যা পরিষ্কার। মানুষের মধ্যে সম্পদ ও ক্ষমতার প্রতি মোহ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। আধুনিক জীবনযাপনের জন্য সম্পদ অর্জনই একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে নৈতিকতা বা কৃতজ্ঞতা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে।

এখানে সামাজিক গণমাধ্যমের প্রভাবও কম নয়। সোশ্যাল মিডিয়া তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তা এবং প্রদর্শনের সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে। মানুষ সারাক্ষণ নিজেকে অন্যের চেয়ে বেশি সফল বা সুবিধাজনক অবস্থানে দেখাতে ব্যস্ত। এই অসম প্রতিযোগিতা সুবিধাবাদকে আরও উসকে দিয়েছে।

ক্ষমতার রাজনীতির প্রভাবও এই অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করেছে। সমাজে যখন ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সুবিধাবাদকে সাফল্যের চাবিকাঠি হিসেবে দেখা হয়, তখন সাধারণ মানুষও সেই পথেই হাঁটার অনুপ্রেরণা পায়।

বাঙালি সমাজ আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিবেক হারিয়ে যাওয়াটা এখন একটা ‘ট্রেন্ড’-এ পরিণত। আমরা আজ এতটাই সুবিধাবাদী যে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার চেয়ে সুযোগ নেওয়াটা বেশি পছন্দ করি। আমরা ভুলে গেছি যে, আমাদের পূর্বপুরুষরা আদর্শ এবং মূল্যবোধের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতেও কুণ্ঠাবোধ করতেন না। কিন্তু আজ আমরা স্রেফ কিছু সুযোগের জন্য নিজেদের সত্তা বিক্রি করে দিচ্ছি। এই দ্রুত সামাজিক পরিবর্তন আমাদের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলেছে। যদি আমরা এখনই সচেতন না হই, তবে অচিরেই আমাদের পরিচয় এবং ঐতিহ্য পুরোপুরি হারিয়ে যাবে।

এই সামাজিক অবক্ষয়ের উৎসব চূড়ান্ত আত্মঘাতী পথে নিয়ে যাচ্ছে বাঙালিকে। আমরা যখন ক্ষমতার চারপাশে ভনভন করি, তখন স্রেফ কিছু সুবিধাই পাই না, বরং আমাদের মনুষ্যত্ব, মর্যাদা হারিয়ে ফেলি। বিবেক এবং নৈতিকতা হল মানুষের মূল ভিত্তি, যা আজ আমাদের সমাজে ধসে পড়েছে। এই দ্রুত পরিবর্তনের পেছনে লুকিয়ে আমাদের নিজেদের লোভ এবং স্বার্থপরতা। যদি আমরা এই পথ থেকে ফিরে না আসি, তবে ভবিষ্যতে আমরা এমন এক সমাজ তৈরি করব, যেখানে কেবল সুবিধাবাদ এবং ক্ষমতারই জয়গান হবে। আর আদর্শ ও বিবেক থাকবে অন্ধকারে ঢাকা।

মাছির ডানায় ভনভন করে কিছু সুযোগ পাওয়া হয়তো আনন্দের হতে পারে। কিন্তু সেই আনন্দে আমরা বাঙালিরা উপড়ে ফেলছি নিজেদের অস্তিত্বের ভিত্তিকেই।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *