- রুদ্র সান্যাল
মৌলবাদ কোনও স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক বিকৃতি নয়; এটি প্রায়শই রাজনৈতিক প্রয়োজন, ক্ষমতার হিসাব ও কর্তৃত্ব কায়েমের কৌশল থেকে জন্ম নেয়। ইতিহাসের দিকে তাকালেই দেখা যায়—ধর্ম, জাতি বা সংস্কৃতির নামে যে উগ্রতা সমাজকে গ্রাস করে, তার পেছনে সক্রিয় থাকে সংগঠিত রাজনীতি। মানুষের ভয়, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তাকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের উদ্দেশ্য পূরণ করে; মৌলবাদ তখন হয়ে ওঠে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।
ভোটব্যাংকের হাতিয়ার
মৌলবাদের মূল বৈশিষ্ট্য হল—একটি ‘আমরা বনাম তারা’ বিভাজন তৈরি করা। রাজনীতি যখন গণতান্ত্রিক বিতর্কে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন এই বিভাজন ভোটব্যাংক মজবুত করার সহজ রাস্তা হয়ে দাঁড়ায়। যুক্তির বদলে আবেগ, সহাবস্থানের বদলে শত্রুতা—এই রূপান্তর ঘটাতে মৌলবাদী ভাষ্য খুব দ্রুত কাজ করে। ফলে সমাজে সহিংসতা শুধু অনুমোদিতই হয় না, অনেক সময় নৈতিকতার মোড়কও পায়।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে মৌলবাদের উত্থানকে আলাদা করে বোঝা জরুরি। ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, শিক্ষার সংকট—এই বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধান না করে রাজনীতি যখন ধর্মীয় পরিচয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন মৌলবাদ বাড়ে। বাংলাদেশও এই বাস্তবতার বাইরে নয়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ একাধিকবার ধর্মীয় রাজনীতির উত্থানপতনের সাক্ষী। সাম্প্রতিক সময়ে উগ্র মৌলবাদের প্রকাশ আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে—যেখানে ব্যক্তি নয়, মানবতাই নিশানা।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালের উগ্র মৌলবাদের এক নির্মম উদাহরণ দীপুচন্দ্র দাসকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা। অভিযোগ-গুজব-উসকানি— এই তিনের মিশ্রণে একটি মানুষের জীবন নিমেষে শেষ হয়ে যায়। এই হত্যাকাণ্ড কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা। কারণ এখানে আইনের শাসনের বদলে ‘উন্মত্ত নৈতিকতা’ প্রতিষ্ঠা পায়—যেখানে জনতা বিচারক, জল্লাদ ও সাক্ষী—সবই একসঙ্গে।
সুবিধাবাদের নীরবতা
এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। মৌলবাদী রাজনীতির চাপে প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা, সামাজিক নীরবতা ও রাজনৈতিক সুবিধাবাদ একত্রে কাজ করে। যারা ক্ষমতায় আছে, তারা অনেক সময় ‘সংবেদনশীলতা’র অজুহাতে কঠোর অবস্থান নেয় না; যারা বিরোধী, তারা ঘটনাকে নিজেদের রাজনীতির পুঁজি বানায়। মাঝখানে পড়ে সাধারণ মানুষ—যাদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও জীবনের মূল্য ক্রমশ কমে যায়।
এখানে অতীতের আরেকটি নির্মম হত্যাকাণ্ড স্মরণ করা জরুরি—গ্রাহাম স্টেইনস ও তাঁর দুই শিশুপুত্রকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা। ঘটনাটি ঘটেছিল ভারতে, ১৯৯৯ সালে। ধর্মান্তরের গুজব ও উগ্র জাতীয়তাবাদী উসকানিতে একটি পরিবারকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। শিশুদের আর্তনাদ, আগুনের লেলিহান শিখা—এসব কেবল সংবাদ শিরোনাম নয়; এগুলো মৌলবাদী রাজনীতির নগ্ন চেহারা। দেশ-কাল বদলালেও পদ্ধতি একই—ভয় দেখাও, শত্রু বানাও, সহিংসতাকে বৈধতা দাও।
এই দুই ঘটনার মধ্যে একটি গভীর সাদৃশ্য আছে। কোথাও ধর্মীয় সংখ্যালঘু, কোথাও ভিন্নমত বা পরিচয়—টার্গেট বদলায়, কৌশল বদলায় না। মৌলবাদী রাজনীতি প্রথমে মানুষকে মানব হিসেবে দেখে না; দেখে পরিচয়ের খোপে। এরপর সেই খোপকে ‘হুমকি’ বানিয়ে সহিংসতাকে ন্যায্য বলে প্রচার করে। ফলাফল—মানবাধিকার লঙ্ঘন, সামাজিক ভাঙন এবং দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা।
ক্ষমতার লড়াই
প্রশ্ন উঠতেই পারে—রাজনীতির প্রয়োজন কেন মৌলবাদকে আঁকড়ে ধরে? কারণ মৌলবাদ দ্রুত ফল দেয়। উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য—এসব দীর্ঘমেয়াদি কাজ। কিন্তু ধর্মীয় উসকানি মুহূর্তে জনতাকে জড়ো করে। ক্ষমতার লড়াইয়ে এই তাত্ক্ষণিক সমর্থনই অনেক রাজনীতিকের কাছে অমূল্য। তাই মৌলবাদকে পুরোপুরি দমন না করে কখনও নীরব প্রশ্রয়, কখনও প্রকাশ্য সমর্থন—দুটোই দেখা যায়।
কিন্তু এই কৌশল আত্মঘাতী। মৌলবাদ একবার শক্তি পেলে সে আর নিয়ন্ত্রণে থাকে না। আজ যে রাজনীতিক তাকে ব্যবহার করছে, কাল সেই রাজনীতিকই তার লক্ষ্য হতে পারে। ইতিহাসে তার অসংখ্য উদাহরণ আছে। সমাজে ভয়ের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হলে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মেধা পালায়, আইন দুর্বল হয়। সবচেয়ে বড় ক্ষতি—মানুষ মানুষের ওপর বিশ্বাস হারায়।
বিষবৃক্ষের বাড়বাড়ন্ত
মৌলবাদের এই বিষবৃক্ষ ওপড়াতে কেবল প্রশাসনিক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ। রাজনীতি যখন মৌলবাদকে প্রশ্রয় দেয়, তখন সমাজ ক্রমশ তার সৃজনশীলতা ও মুক্তচিন্তার ক্ষমতা হারায়। আমরা দেখি, পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে লোকজ সংস্কৃতি—সবখানেই মৌলবাদী সেন্সরশিপের থাবা বসানোর চেষ্টা চলে। বৈচিত্র্যময় জীবনবোধের পরিবর্তে একটি সংকীর্ণ ও একরৈখিক জীবনধারা চাপিয়ে দেওয়ার এই প্রচেষ্টা মূলত সমাজকে পঙ্গু করে দেওয়ার কৌশল। যখন একটি জাতি তার হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ভুলে কেবল পরিচয়ের উগ্রতায় মত্ত হয়, তখন তার রাজনৈতিক পতন অনিবার্য হয়ে পড়ে। তাই রাজনীতির বিকল্প হিসেবে সুস্থ ধারার সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে বেগবান করতে হবে, যা তরুণ প্রজন্মকে উগ্রবাদের মোহ থেকে মুক্ত রাখবে।
আন্তর্জাতিক ক্ষমতার দাবার ঘুঁটি
বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে তাকালে দেখা যায়, মৌলবাদ অনেক সময় আন্তর্জাতিক ক্ষমতার দাবার ঘুঁটি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। এক দেশের মৌলবাদ অন্য দেশের চরমপন্থাকে উসকে দেয়, যা শেষপর্যন্ত আঞ্চলিক অস্থিরতা তৈরি করে। দীপুচন্দ্র দাস বা গ্রাহাম স্টেইনসের মতো বিয়োগান্তক ঘটনাগুলো তাই কেবল স্থানীয় আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা নয়; এগুলো একটি সমষ্টিগত সমস্যার অংশ। যখন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো মৌলবাদী শক্তির কাছে আপস করে, তখন উগ্রবাদীরা নিজেদের ‘রাষ্ট্রের চেয়েও শক্তিশালী’ ভাবতে শুরু করে।
উত্তরণের পথ
এই অচলাবস্থা থেকে বেরোতে হলে কয়েকটি মৌলিক পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, আইনের শাসন—কোনও আপস নয়। সহিংসতা যে-ই করুক, তার রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজনীতির ধর্মনিরপেক্ষ ভাষ্য—ধর্ম ব্যক্তিগত বিশ্বাস; রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার হাতিয়ার নয়। তৃতীয়ত, শিক্ষা ও নাগরিক সচেতনতা—গুজব চিনতে শেখানো, ভিন্নমতকে সহ্য করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। চতুর্থত, মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যমের দায়িত্ব—উসকানি নয়, তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন।
দীপুচন্দ্র দাসের মৃত্যু কিংবা গ্রাহাম স্টেইনস ও তাঁর শিশুদের হত্যাকাণ্ড আমাদের সামনে একটাই প্রশ্ন রেখে যায়—আমরা কোন সমাজ চাই? যেখানে রাজনীতির প্রয়োজনে মানুষ পুড়ে মরবে, নাকি যেখানে রাজনীতি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে? মৌলবাদের জন্ম রাজনীতির প্রয়োজনে হলেও, তার মৃত্যু নির্ভর করে নাগরিকদের সচেতনতা ও রাষ্ট্রের নৈতিক সাহসের ওপর। মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোই আজ সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক কাজ।
(লেখক শিক্ষক)
