রাজনৈতিক দূষণ রোধ এবং প্রকৃত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন সকলের সম্মিলিত সচেতন উদ্যোগ।
অমিত দে
ভোট এলেই একটি পরিচিত শব্দবন্ধ বারবার শোনা যায়, তা হল ‘আদর্শ আচরণবিধি’। ভারতের মতো বৃহত্তম গণতান্ত্রিক কাঠামোয় সুষ্ঠু নির্বাচন (Election 2026) পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা নির্বাচন কমিশন। ভোট ঘোষণা থেকে শুরু করে ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত তারা এই বিধি কঠোরভাবে কার্যকর করে। এর ফলে প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলিকে কিছুটা বিধিনিষেধের মধ্যে থাকতে হয়। তবে নির্বাচন কমিশনের এই নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কার্যত ফল ঘোষণা হওয়া পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে। এরপর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণের কোনও ক্ষমতা আর কমিশনের হাতে থাকে না।
নির্বাচন কমিশনের (ECI) এই সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়েই আজকের দিনে রাজনৈতিক দূষণ বহুমাত্রিক রূপ ধারণ করেছে। প্রতিবার গণতন্ত্র রক্ষার নামে এহেন বিবিধ ‘দূষণ’ দেখতে দেখতে সাধারণ মানুষের সহনশীলতা আজ শেষ সীমানায় পৌঁছে গিয়েছে। খাতায়-কলমে দলত্যাগবিরোধী আইন বিদ্যমান। তা সত্ত্বেও দলবদল, বিশেষ করে নির্বাচনে জয়ের পর রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষ পরিবর্তন সাধারণ মানুষের নীতি ও আদর্শের প্রতি আস্থাকে একটি হাস্যকর পর্যায়ে নামিয়ে আনে। একইভাবে, গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বহু প্রার্থী নির্বাচনে অবাধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। কারণ, আইনি নিয়মে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের প্রার্থী হওয়া থেকে আটকানো যায় না।
এই সুযোগে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত প্রার্থীরা রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেন। নির্বাচন চলাকালীন অপরাধ, সন্ত্রাস, হুমকি, বুথ দখল, ভয় দেখিয়ে ঘরছাড়া করা বা নিরীহ মানুষকে হত্যার মতো ঘটনা এখন আর নতুন কিছু নয়। নির্বাচন কমিশন কিছু ক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপ করলেও দীর্ঘমেয়াদি শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। এর জন্য প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে প্রভাবশালী রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির খুব বিরল। আদর্শ ও উন্নয়নের রাজনীতির বদলে অর্থবল এবং প্রলোভনই প্রাধান্য পায়। নির্বাচন বাদে অন্য সময়ে রাজনৈতিক দলগুলির ওপর নজরদারির দায়িত্ব বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে বিভক্ত। পুলিশ, বিধানসভার স্পিকার বা আয়কর দপ্তরের মতো সংস্থাগুলি বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করায় সার্বিক নজরদারির বড় অভাব পরিলক্ষিত হয়।
এই বিচ্ছিন্ন কাঠামোর কারণে দায় এড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে অনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার অপচেষ্টায় একে কাজে লাগানো হয়। দীর্ঘদিনের এই অভিজ্ঞতায় সাধারণ মানুষ অনেকাংশেই এই দূষিত পরিবেশকে রাজনীতির অবশ্যম্ভাবী অংশ হিসেবে মেনে নিতে শুরু করেছেন। গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ যে ভোটার এবং ভোটকর্মীরা, তাঁরাই অনেক সময় ক্ষমতার লড়াইয়ে ‘উলুখাগড়া’য় পরিণত হন। তাঁদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা যথাযথভাবে রক্ষিত হয় না। তাই নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা আরও বিস্তৃত ও প্রভাবমুক্ত করা একান্ত প্রয়োজন। পাশাপাশি, নির্বাচনকালের অপরাধ দমনে বিশেষ আদালতে দ্রুত বিচার, কঠোর আইন প্রণয়ন এবং রাজনৈতিক দলগুলির অর্থায়নে স্বচ্ছতা আনা বিশেষ জরুরি।
দেশের শীর্ষ আদালত বিভিন্ন রায়ে ইতিমধ্যেই নির্বাচনি স্বচ্ছতা রক্ষা এবং প্রার্থীদের অপরাধমূলক অতীত প্রকাশ বাধ্যতামূলক করেছে। তবে এর সঙ্গে নাগরিকদের সঠিক রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়াটাও অপরিহার্য। ভোটাররা যেদিন দুর্নীতি ও অপরাধকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করবেন এবং প্রকৃত উন্নয়নমুখী কর্মক্ষমতাকে যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে প্রাধান্য দেবেন, একমাত্র তখনই রাজনৈতিক দলগুলি বাধ্য হবে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করতে। পরিশেষে, নির্বাচন কমিশন, বিচার ব্যবস্থা ও প্রশাসনের ঐকান্তিক সদিচ্ছা এবং সর্বোপরি সাধারণ জনগণের সম্মিলিত সচেতন উদ্যোগই পারে রাজনীতির এই অবক্ষয় রুখে দিয়ে প্রকৃত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে।
(লেখক শিক্ষক ও অক্ষরকর্মী।)
