- শুভজিৎ দত্ত
আজন্মের ভিটেমাটি। বড় হয়েছে বাপ-দাদাদের সেখানে কাজ করতে দেখে। জেনারেশন জেড অবশ্য আর উৎসাহী নয়। তারা মুখ ফিরিয়েছে চা বাগান থেকে। কালের নিয়মে শ্রমিক পরিবারে মধ্যবিত্তায়নের ঢেউ। ফলে শ্রমিকের কাজে আর আগ্রহ নেই। বদলে বেশি আয়ের সন্ধানে নতুন প্রজন্ম দলে দলে ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক। সেখানে গতরে খেটে কাজ করলেও চা বাগানে আর নয়!
শুধু কি তাই! স্থায়ী কাজ থাকা সত্ত্বেও চা শ্রমিকদের অনেকেও বাগান ছেড়ে অন্য কর্মক্ষেত্রে পাড়ি দিচ্ছেন। নিট ফল প্রতিটি চা বাগানে প্রতিদিন কাজে গরহাজিরের সংখ্যা বাড়ছে। সেই হার বাড়তে বাড়তে কোথাও ৪০ আবার কোথাও ৫০ শতাংশ ছুঁয়ে ফেলেছে। চা বাগানের পরিচালকদের ভাষায় যে প্রবণতার পোশাকি নাম ‘অ্যাবসেন্টিজম’।
নীরবে ঘটে চলা এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে বদলে যাওয়া আর্থসামাজিক অবস্থা। প্রত্যাশা ও চাহিদার বৃদ্ধি। রোদে পুড়ে, জলে ভিজে, হাতি-চিতাবাঘের আতঙ্ক বুকে চেপে মাত্র ২৫০ টাকা মজুরি মেলার আক্ষেপ। ডুয়ার্সে চা শিল্পের গোড়াপত্তনের পর ইংরেজ জমানা কিংবা স্বাধীনতা উত্তরপর্বে পাঁচ থেকে সাতের দশকের স্বর্ণযুগের কথা নাহয় বাদই দেওয়া গেল। বছর পনেরো আগেও মজুরির পাশাপাশি বাগিচা শ্রম আইন অনুসারে যেসব বস্তুগত সুযোগসুবিধা (ফ্রিঞ্জ বেনিফিট) মোটের ওপর নিয়মিত মিলত, তাও এখন অতীত।
সেইসব সুবিধা যেমন, প্রতি দু’বছরের ব্যবধানে বাড়িঘর মেরামত, রোদে-বৃষ্টিতে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কাজ করার সুবিধার জন্য ছাতা, জুতো, চটি, গামবুট, রুমাল, কম্বল (গাছ থেকে তুলে কাঁচা পাতা রাখার থলে) ইত্যাদি। সেসব এখন প্রায় ইতিহাসের পাতায়। শ্রমিক সংগঠনগুলিকে কিংবা ইউনিয়নের ব্যানার ছাড়াই শ্রমিকদের একজোট হয়ে সেসবের দাবিতে আন্দোলন এখন প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা। চা বাগানের নিজস্ব চিকিৎসা পরিষেবাও তলানিতে। পাশ করা ডাক্তার নেই হাতেগোনা কয়েকটি বাগান ছাড়া। অমিল প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্সও।
বাগানের হাসপাতালগুলিতে হয়তো ব্রিটিশ আমলের কাঠামো আছে। কিন্তু নিদেনপক্ষে অ্যাম্বুল্যান্সও নেই বহু বাগানে। ফলে ভরসা কাছেপিঠের সরকারি হাসপাতাল। গেলে সেই সরকারি হাসপাতালেই পাঠিয়ে দেওয়া হবে জেনে বাগানের হাসপাতালে যাওয়াই ছেড়ে দিয়েছেন শ্রমিকরা। যদিও একটা সময় ডুয়ার্সের চা বাগানের অনেক গ্রুপ হাসপাতাল টেক্কা দিত সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবাকে। হত শল্য চিকিত্সা থেকে সিজারিয়ান প্রসবও।
নয়া প্রজন্মের বাগানবিমুখতার এটাও একটা কারণ। কে না জানে, স্বাস্থ্য পরিষেবা যে কোনও মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অন্যতম বড় শর্ত। সঙ্গে রয়েছে গত দু-তিন দশকে নতুন প্রজন্মের পোশাক-আশাক, খাদ্যাভ্যাস এমনকি ভাষার পরিবর্তন। নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয়ে বাঁচতে উন্মুখ এই প্রজন্মের পরিবর্তিত জীবনযাত্রা ও আধুনিকমনস্কতার কারণে বাড়ছে আর্থিক চাহিদা। হাতে হাতে স্মার্ট ফোন বদলে যাওয়া সমাজকে আরও বেশি করে চেনাচ্ছে তাদের।
এই প্রজন্মের মানসিক, সামাজিক ও পারিবারিক চাহিদার পরিবর্তন চিরাচরিত প্রথায় কোনও ট্রেড ইউনিয়ন আর পূরণ করতে পারছে না। বাগানের প্রতি বৈরাগ্য সৃষ্টির এসবও কারণ। চা বাগান পঞ্চায়েত ব্যবস্থার আওতায় আছে ১৯৯৮ সাল থেকে। এরপর সরকারি পরিকাঠামোর পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ হয় বাগানে। গড়ে ওঠে বহু হিন্দিমাধ্যম প্রাথমিক, উচ্চপ্রাথমিক ও উচ্চবিদ্যালয়।
বাগানের আদি বাসিন্দা আদিবাসী ও গোর্খা জনগোষ্ঠীর শ্রমিক ও অ-শ্রমিক পরিবারগুলি ভাষাগত নৈকট্যের কারণে ছেলেমেয়েদের হিন্দিমাধ্যম স্কুলগুলিতে ভর্তি করে। এতে বাগানের হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী কলেজ, ইউনিভার্সিটির গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষিত হচ্ছেন। পড়াশোনা করে সেই প্রজন্ম আর চা শ্রমিকের কাজে যোগ দিতে রাজি হচ্ছে না।
১৯৯১ সালে উত্তরবঙ্গের চা বাগানগুলিতে ১০ হাজার নতুন নিয়োগের চুক্তি হলেও পুরোটা বাস্তবায়িত হয়নি। চা শিল্পের কোনও অনুসারী শিল্প কিংবা অন্য কোনও সংগঠিত শিল্প গড়ে ওঠেনি এই অঞ্চলে। সরকারি চাকরির বাজার ক্রমশ পড়তির দিকে। যেটুকু সুযোগ আছে, তাতে এত সংখ্যক ছেলেমেয়ের কাজ পাওয়া সম্ভব নয়। কর্মসংস্থানের এই অনিশ্চয়তাও তাদের অন্যত্র ছুটে যাওয়ার কারণ।
চা বাগান থেকে ভিনরাজ্যে গিয়ে কেউ বিউটি পার্লারে, কেউ নির্মাণশ্রমিকের, কেউ গাড়িচালকের, কেউ হোটেল-রেস্তোরাঁয় আবার কেউ গৃহসহায়কের কাজ খুঁজে নিচ্ছেন। একজন গিয়ে থিতু হওয়ার পর আত্মীয় বা চেনাপরিচিতদের নিয়ে যাচ্ছেন। যেখানে মজুরি নিদেনপক্ষে দিনে ৫০০ টাকা। দক্ষ শ্রমিক হলে ৮০০-১০০০ টাকা। অনেকে একসঙ্গে থাকেন। কিছু ক্ষেত্রে নিয়োগকারী এজেন্সি থাকার ব্যবস্থা করে। ফলে খরচের সাশ্রয় হয়।
তাঁদের সঞ্চিত টাকায় লজঝড়ে বাগানে শ্রমিক কোয়ার্টারের খালি জায়গায় অনেক ছাদ দেওয়া দু’কামরার ঘর তৈরি হয়েছে। বাগানের এমন অনেক শ্রমিক মহল্লা রয়েছে, যেখানকার ১৮-৪০ বছর বয়সি সবাই ভিনরাজ্যে। আসল কথা, নতুন প্রজন্ম চা বাগানের বাইরে কাজ চায়। আর পাঁচজনের মতো স্বপ্ন দ্যাখে আরও বেঁচে থাকার। তাতে চা বাগানের সংকট বাড়লে বাড়ুক, সেদিকে আর নজর নেই। নতুন স্বপ্নের খোঁজ অন্যত্র।
