বিশ্ব মঞ্চে স্তব্ধ রাষ্ট্রসংঘ

বিশ্ব মঞ্চে স্তব্ধ রাষ্ট্রসংঘ

শিক্ষা
Spread the love


 

  • শিবাশিস সেনগুপ্ত 

একসময় পৃথিবী দেখেছিল সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের স্বপ্ন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা শেষে এই বিশ্বসংস্থা জন্ম নিয়েছিল ভবিষ্যতের যুদ্ধ থামানোর পবিত্র অঙ্গীকার নিয়ে। কিন্তু আজকের বিশ্বে সেই স্বপ্ন যেন ধূলিসাৎ। ইউক্রেন থেকে গাজা, সুদান থেকে ইয়েমেন-বিশ্বজুড়ে যখন সংঘাতের আগুন জ্বলছে, তখন মনে হচ্ছে শান্তিরক্ষার প্রশ্নে রাষ্ট্রসংঘ যেন এক নীরব দর্শকের ভূমিকায় আটকে গিয়েছে। পশ্চিমি শক্তির বিভাজন এবং উদীয়মান আঞ্চলিক শক্তিগুলোর উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে, প্রশ্ন উঠেছে : বিশ্বের যুদ্ধ থামানোর ক্ষমতা কি সত্যিই হারিয়েছে রাষ্ট্রসংঘ? শান্তি আলোচনার মঞ্চ আজ ইউরোপীয় রাজধানী বা রাষ্ট্রসংঘের সদর দপ্তর থেকে সরে গিয়েছে দোহা, আঙ্কারা বা বেজিং-এর দরবারে। এই পরিবর্তন কেবল ভৌগোলিক নয়, এটি একটি গভীর সাংগঠনিক দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করছে, যা একসময় বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সংস্থাটিকে ক্রমশই অপ্রাসঙ্গিক করে তুলছে।

ইউক্রেন থেকে গাজা : অস্তিত্ব কোথায়? 

একথা স্পষ্ট যে, বড় আকারের সংঘাত নিরসনে রাষ্ট্রসংঘের ভূমিকা আজ কার্যত শূন্য। ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার পর, নিরাপত্তা পরিষদ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। কারণ, রাশিয়া নিজেই এই পরিষদের স্থায়ী সদস্য এবং তার ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। ফলে, বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক সংঘাতে নিরাপত্তা পরিষদ একটি নিন্দা প্রস্তাব বা শান্তিরক্ষার জন্য কার্যকর সামরিক হস্তক্ষেপ- কোনওটাই করতে পারেনি। যুদ্ধ যখন চলছে, তখন রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদ মাঝে মাঝে নিন্দা প্রস্তাব পাশ করেছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে সেই প্রস্তাবগুলি যুদ্ধ বন্ধে কোনও প্রভাব ফেলতে পারেনি। মধ্যস্থতা বা মানবিক করিডর খোলার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলির জন্য ইউক্রেনকে নির্ভর করতে হয়েছে তুরস্ক ও কাতারের মতো মধ্যম শক্তির ওপর, রাষ্ট্রসংঘের ওপর নয়।

গাজা এবং বৃহত্তর ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন সংকটে রাষ্ট্রসংঘের নিষ্ক্রিয়তা আরও প্রকট। বছরের পর বছর ধরে গাজার মানবিক পরিস্থিতি ভয়াবহ থাকলেও, স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান দিতে রাষ্ট্রসংঘ ব্যর্থ হয়েছে। সর্বশেষ সংঘাতে যখন মিশর, কাতার ও তুরস্ক যুদ্ধবিরতির আলোচনায় প্রধান ভূমিকা নিল, তখন রাষ্ট্রসংঘকে দেখা গেল কেবল ত্রাণ বিতরণকারী সংস্থা হিসেবে। সংস্থাটির মহাসচিব মাঝে মাঝে নৈতিক আহ্বান জানিয়েছেন, কিন্তু এর বাইরে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রসংঘের উপস্থিতি ছিল প্রায় অদৃশ্য।

নব্বইয়ের দশকে আফগান শান্তি প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রসংঘ ছিল কেন্দ্রীয় ভূমিকায়। কিন্তু ২০২১ সালে যখন তালিবান আবার কাবুলের দখল নিল, তখন আমেরিকা ও তালিবানদের মধ্যে আলোচনাটি হল কাতারের দোহায়। রাষ্ট্রসংঘ সেখানে কার্যত অনুপস্থিত। একইভাবে ইয়েমেন, সুদান বা মায়ানমারের মতো সংঘাতগুলিতেও সংস্থাটির প্রভাব কমতে কমতে আঞ্চলিক শক্তিগুলির হাতে চলে গিয়েছে।

 ভেটো ও ক্ষমতার বিভাজন 

রাষ্ট্রসংঘের এই ব্যর্থতার মূল কারণ নিহিত তার কাঠামোগত ত্রুটির মধ্যে। ১৯৪৫ সালে এই সংস্থা গঠনের সময় পাঁচটি দেশকে (আমেরিকা, রাশিয়া, চিন, ফ্রান্স ও ব্রিটেন) ভেটো ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বশান্তি রক্ষায় এই বৃহৎ শক্তিরা যেন একমত হয়ে কাজ করে। কিন্তু বাস্তবে, এই ভেটো ক্ষমতা বারবার শান্তি প্রক্রিয়াকে আটকে দিয়েছে। রাশিয়া বা চিন যখন তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনও সংঘাতের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদের কোনও পদক্ষেপকে ভেটো দেয়, তখন বিশ্বসংস্থাটি পঙ্গু হয়ে যায়। ইউক্রেন বা সিরিয়াতে রাশিয়া এবং পশ্চিমা দেশগুলির ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই প্রতিষ্ঠানকে অকেজো করে দিয়েছে। যখন শান্তিরক্ষার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, ঠিক তখনই প্রতিষ্ঠানটি দুই মেরুতে বিভক্ত হয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।

উন্নয়নশীল দেশগুলির কাছে রাষ্ট্রসংঘের ভাবমূর্তি এখন অনেকটাই পশ্চিমা স্বার্থের ধারক হিসাবে। বহু বছর ধরে রাষ্ট্রসংঘের কার্যক্রম পশ্চিমা দেশগুলির বিদেশনীতির দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, রাশিয়া ও চিন এখন এই সংস্থাকে পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি মঞ্চ হিসাবে ব্যবহার করছে। এই পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং ক্ষমতার খেলা সংঘাত নিরসনের জন্য নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসাবে রাষ্ট্রসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করেছে।

ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের শিকার

রাষ্ট্রসংঘের এই দুর্বলতা ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতার পট পরিবর্তনের সরাসরি ফল। একসময় আমেরিকা বা ইউরোপের শক্তি ছিল অটুট। তাদের কূটনৈতিক এবং সামরিক প্রভাবের সামনে রাষ্ট্রসংঘের সিদ্ধান্ত মানতে হত। কিন্তু এখন পশ্চিমা ব্লক নিজেই অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্ত। একইসঙ্গে তাদের অর্থনৈতিক এবং সামরিক প্রভাব কমতে থাকায়, অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিগুলি সেই ক্ষমতার শূন্যতা পূরণ করতে এগিয়ে আসছে। আমেরিকা বা ইউরোপের ওপর নির্ভরশীল না থেকে, সংঘাতের পক্ষগুলি এখন তুরস্কের সঙ্গে কথা বলছে, কারণ তুরস্ক একইসঙ্গে ন্যাটো এবং রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে, বা কাতারের সঙ্গে কথা বলছে, কারণ কাতার ধনী এবং হামাস-তালিবানের মতো অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর সঙ্গেও সরাসরি যোগাযোগ রাখতে পারে।

কাতার, তুরস্ক, সৌদি আরব এবং চিন মধ্যস্থতাকে তাদের পররাষ্ট্রনীতির একটি শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত করেছে। কাতার তার বিপুল সম্পদ ও কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে। চিন, সৌদি আরব-ইরান চুক্তি করিয়ে নিজেকে বিশ্বশান্তির একজন নতুন চালক হিসাবে তুলে ধরছে, যা পশ্চিমা-নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। তারা এমন একসময় এই ভূমিকা নিচ্ছে, যখন পশ্চিমা দেশগুলির দৃষ্টি ইউক্রেন বা অন্যান্য বিষয়ে নিবদ্ধ। এই নতুন শক্তিরা রাষ্ট্রসংঘের কাঠামো বা নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধির জন্য মধ্যস্থতাকে ব্যবহার করছে।

ভবিষ্যতের পথে প্রশ্নচিহ্ন 

রাষ্ট্রসংঘের এই করুণ পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের বিশ্বব্যবস্থা এখন তার শেষ পর্যায়ে। বিশ্বকে এক মঞ্চে আনার যে প্রতিষ্ঠানটি তৈরি হয়েছিল, আজকের বহুমেরু বিশ্বে সেই মঞ্চটি নিজেই টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রসংঘ আজও গুরুত্বপূর্ণ মানবিক সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা। কিন্তু বড় আকারের রাজনৈতিক বা সামরিক সংঘাত থামানোর ক্ষেত্রে, শান্তিরক্ষার আলো তার হাত থেকে ফসকে যাচ্ছে। এখন নতুন শান্তিদূতদের উত্থান প্রমাণ করে যে, এই বিশ্ব সংস্থাটিকে হয় কাঠামোগতভাবে সংস্কার করতে হবে, না হলে এটি ক্রমশ একটি কেবল আলোচনা সভা বা পরামর্শ মঞ্চে পরিণত হবে, যার হাতে যুদ্ধ থামানোর কোনও ক্ষমতা থাকবে না। রাষ্ট্রসংঘ কি তার প্রাসঙ্গিকতা পুরোপুরি হারাবে, নাকি নতুন বিশ্বশক্তির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে নিজেকে পুনর্গঠন করবে, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *