ফুটবলের রাজনীতি, রাজনীতির ফুটবল

ফুটবলের রাজনীতি, রাজনীতির ফুটবল

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


তারকারা যখন গোলপোস্টের জাল কাঁপাতে ব্যস্ত, তখন ভিআইপি বক্সে ধুরন্ধর রাষ্ট্রপ্রধানরা কষছেন ক্ষমতার জটিলতম অঙ্ক। 

রূপায়ণ ভট্টাচার্য

চিনে অলিম্পিক হওয়ার সময় কথাটা শুনেছিলাম। রাশিয়া, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকায় বিশ্বকাপ ফুটবল হওয়ার সময়ও। আমেরিকায় বিশ্বকাপের সময়ও ঘুরেফিরে আসছে ওই একটা শব্দ।

আজকাল আন্তর্জাতিক স্তরে ওই শব্দের খুব চল হয়েছে। ‘স্পোর্টসওয়াশিং’। খুব সহজ ভাষায় বলতে গেলে, নিজের দেশের মানবাধিকারের কঙ্কালসার চেহারাটা ঢাকতে ফুটবলের একটা ঝকঝকে সিল্কের চাদর গায়ে চাপিয়ে দেওয়া। ধরা যাক, কোনও এক দেশে একনায়কতন্ত্র চলছে, মানুষের কথা বলার অধিকার নেই, প্রশাসন বিরোধীদের জেলে পুরছে। সেই দেশ হঠাৎ কোটি কোটি ডলার ঢেলে কোনও টুর্নামেন্ট আয়োজন করে ফেলল।

কথাটা কতটা সত্যি, এক ঝলকে বোঝার উপায় নেই। দেওয়া উচিতও নয়। কিন্তু মরক্কোর উদাহরণ দিতে পারি। সম্প্রতি আফ্রিকান ফুটবলে দুরন্ত হয়ে ওঠা সিংহ মরক্কোতে নানা আর্থিক ও সামাজিক দুর্নীতি নিয়ে সরব হয়েছিল জেন জেড। মরক্কোর সাফল্যে সব চাপা পড়ে গিয়েছে। ফুটবলটা দেখছে আবার রাজপরিবার। মরক্কো আবার পরের বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক।
আমাদের ক্রিকেট টিমের গেরুয়াকরণ নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে ইদানীং। বিজেপি কীভাবে জাতীয় দল হাইজ্যাক করে নিয়েছে। সেটাও কি স্পোর্টসওয়াশিংয়ের মধ্যে পড়বে না? বহু ব্যর্থতা চাপা দেওয়ার জন্য ক্রিকেট টিমকে ব্যবহার করা!

আপাতত চুলোয় যাক ক্রিকেট। ফুটবলের সময়। ফুটবলেই ফিরি।

হালফিলে পশ্চিম এশিয়ার কিছু দেশ বা দুনিয়ার নানা প্রান্তের একনায়করা এই খেলাটা খুব ভালো খেলছেন অন্যভাবে। বিশ্বের তাবড় ফুটবলারদের আকাশছোঁয়া টাকায় কিনে নিজেদের দেশে খেলানো হচ্ছে। উদ্দেশ্য? যাতে বিশ্ববাসী তাদের দেশের অন্ধকার দিকগুলো ভুলে গিয়ে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো বা অন্য তারকাদের পায়ের জাদু দেখে ধন্য ধন্য করে। ফুটবল এখানে স্রেফ একটা ডিটারজেন্ট, যা দিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের ভাবমূর্তি ধুয়ে সাফ করা হয়। মারাদোনার ‘হ্যান্ড অফ গড’ নিয়ে যত চর্চাই হোক না কেন, রাজনীতিকদের এই ‘হ্যান্ড অফ স্টেট’ ফুটবলের চেয়ে অনেক বেশি নিখুঁত। ফুটবল আর রাজনীতি এখন আলাদা থাকবে কী করে!

কিলিয়ান এমবাপে এবং মার্কাস থুরাম একবার প্রকাশ্যে জনগণকে বলেছিলেন, উগ্র দক্ষিণপন্থীদের দয়া করে ভোট দেবেন না।

ফ্রান্সের দুই সুপারস্টারের মতো সাহস সাম্প্রতিককালে আর কে কে দেখিয়েছেন, এটা বড় প্রশ্ন। ফুটবল তো বটেই, অন্য খেলাতেও তারকারা কখনও প্রকাশ্যে এভাবে নিজেদের জড়াননি। তবু ইদানীং ফুটবল ও রাজনীতি একাকার হয়ে যাচ্ছে বলে এঁদের নামটা আগে আসছে।

বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে রাজনীতির অঙ্ক জটিল থেকে জটিলতর হতে চলেছে। আর এসব দেখেই মনে হচ্ছে, রাজনীতি কবে ছেড়ে যাবে ফুটবলকে? ফ্রান্স টিমটা কার্যত বোঝাই হয়ে গিয়েছে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের দিয়ে। তাঁরা অনেকেই রাজনীতির শিকার। কুণ্ঠা বোধ করেন না রাজনীতি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে।

আমাদের হাতের সামনে রয়েছেন অন্তত পাঁচ গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ, যাঁরা রাজনীতিতে এসেছিলেন কিছু করবেন বলে। লাইবেরিয়ার প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন এসি মিলানের প্রাক্তন তারকা, ব্যালন ডি’অর জয়ী জর্জ উইয়া। জর্জিয়ার প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন ম্যাঞ্চেস্টার সিটির প্রাক্তন মিখাইল কাভেলাশভিলি। জর্জিয়ার আর এক নামী ফুটবলার কাকা কালাদজে মেয়র হয়েছিলেন টিবিলিসি শহরের।

রোমারিও বা জিয়ানি রিভেরা সাংসদ হয়েছিলেন একবার। পেলে যেমন মন্ত্রী হয়েছিলেন। এঁরা তেমনভাবে দাগ কাটতে পারলেন কই?

ফিফা প্রেসিডেন্ট যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে ‘ফুটবল বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করে’ বলে হাততালি কুড়োন, তখন আড়ালে বসে কোনও ধুরন্ধর রাজনীতিক মুচকি হাসেন। তিনি জানেন, বাইশটা মানুষের একটা বলের পিছনে ছোটার মধ্যে যতটা না খেলা থাকে, তার চেয়ে ঢের বেশি থাকে ভোটের অঙ্ক, ক্ষমতার আস্ফালন আর জাতীয়তাবাদের সস্তা আফিম। ফুটবল আর রাজনীতি আসলে সেই যমজ ভাইয়ের মতো, যারা জনসমক্ষে একে অপরকে চেনে না বলে দাবি করে, অথচ রাতে একই থালায় ভাত খায়।

সম্প্রতি এমবাপের দেশের ক্লাব পিএসজি ইউরোপের সেরা ক্লাব হল চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে জিতে। সেদিন প্যারিসে উল্লাসের নামে যে ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তাতে স্পষ্ট মিশে গিয়েছিল ফুটবল এবং রাজনীতি। ফুটবলের জয়োল্লাস রাজনীতিতে মিশে গিয়েছিল পুরোপুরি।

রাজনীতিকদের একটা মস্ত বড় গুণ, তাঁরা জনতার আবেগের গন্ধ শুঁকে ঠিক পৌঁছে যেতে পারেন। যেখানে লক্ষ মানুষ একসঙ্গে চিৎকার করছে, সেখানে ভোটব্যাংকের গন্ধ পাওয়া যাবে না, তা কি হয়? ফুটবল মাঠ হল সেই মোক্ষম জায়গা, যেখানে হাজার হাজার মানুষকে এক লহমায় ‘আমরা’ আর ‘ওরা’— এই দুই ভাগে ভাগ করে দেওয়া যায়। রাজনীতি তো এই বিভাজনের ওপর দাঁড়িয়ে। মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল নিয়ে সম্প্রতি রাজনীতিকরা কী নোংরাভাবে নিজেদের জড়িয়েছেন, সবার জানা।

ইতিহাসের পাতা ওলটালে দেখা যাবে, ফুটবলের প্রেমে সবচেয়ে বেশি মজেছিলেন স্বৈরাচারী শাসকরা। ইতালির মুসোলিনি ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপকে ব্যবহার করেছিলেন ফ্যাসিবাদী শক্তির প্রচারের বিজ্ঞাপন হিসেবে। রেফারিরা জানতেন, ইতালির বিরুদ্ধে বাঁশি বাজালে মাঠ থেকে সোজা যমঘরে যাওয়ার টিকিট মিলতে পারে। আর্জেন্টিনার ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপের কথাই ধরা যাক। যখন মাঠে লুকে বা কেম্পেসরা গোল করছেন, স্টেডিয়াম থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে তখন সামরিক জুন্টার টর্চার সেলে বন্দিদের চিৎকার ঢাকা পড়ে যাচ্ছিল গ্যালারির উল্লাসে।

ফুটবল একনায়কদের জন্য এক দারুণ আফিম। যখন দেশের মানুষ মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব আর অনাহারে ভুগছে, তখন তাদের হাতে একটা ফুটবল আর টিভিতে একটা হাইভোল্টেজ ম্যাচ ধরিয়ে দিন। ৯০ মিনিটের জন্য তারা ভুলে যাবে যে কাল সকালে র‌্যাশন দোকানে লাইন দিতে হবে। গোলপোস্টের জাল কেঁপে উঠলেই মনে হবে, দেশ মস্ত বড় এক পরাশক্তি হয়ে গেছে!

ফুটবল ক্লাবের বিবর্তনও দেখার মতো। তারা এখন আর স্রেফ খেলার দল নয়, একেকটা আদর্শের ধারক। স্পেনের রিয়াল মাদ্রিদ আর বার্সেলোনার লড়াইটা কি শুধুই এল ক্লাসিকো? মোটেও নয়। ওটা আসলে মাদ্রিদের কেন্দ্রীয় শাসকদল বনাম কাতালুনিয়ার স্বাধিকার আন্দোলনের লড়াই। বার্সেলোনার ন্যু ক্যাম্প স্টেডিয়ামে যখন হাজার হাজার মানুষ কাতালান পতাকা ওড়ান, তখন সেটা আর ফুটবল থাকে না, ওটা হয়ে ওঠে স্বাধীনতার ইস্তাহার।

আমাদের ঘরের মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল লড়াইয়ের পিছনেও তো জড়িয়ে রয়েছে দেশভাগ, উদ্বাস্তু সমস্যা আর সামাজিক পরিচিতির রাজনীতি। বাঙাল-ঘটির লড়াইয়ের অন্তরালে যে দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস লুকিয়ে আছে, তা আজকের কর্পোরেট স্পনসরশিপ দিয়ে ঢাকা যাবে না। কোন দল জিতলে কোন পাড়ায় উল্লাস হবে, তা দিয়ে একসময় কলকাতার ভোটব্যাংকের হাওয়া বোঝা যেত।

খেলোয়াড়রা ভাবেন তাঁরা স্বাধীন, তাঁরা দেশের জন্য খেলছেন। আসলে তাঁরাও এই বিশাল রাজনৈতিক দাবার এক-একটি ঘুঁটি। যখন কোনও ফুটবলার বর্ণবাদের বিরুদ্ধে হাঁটু গেড়ে বসেন, তখন তা যেমন প্রতিবাদের ভাষা, তেমনই আবার অন্য পক্ষের কাছে তা রাজনৈতিক উসকানি। আন্তর্জাতিক মঞ্চে যখন ইজরায়েল বা ইরানের মতো দেশগুলোর ম্যাচ থাকে, তখন মাঠের চেয়ে বেশি উত্তেজনা থাকে কূটনীতির টেবিলে। কে কার সঙ্গে করমর্দন করল, কে কার জাতীয় সংগীতের সময় মুখ ঘুরিয়ে রাখল— তা নিয়ে কাটাছেঁড়া করেন বিশ্বের তাবড় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

ফুটবলারদের পায়ে যখন কোটি কোটি টাকার চুক্তি থাকে, তখন তাঁদের পিঠের চামড়াটাও আসলে বিজ্ঞাপনী এবং রাজনৈতিক পোস্টার হয়ে যায়। তাঁরা চাইলেও আর স্রেফ ‘খেলোয়াড়’ থাকতে পারেন না। তাঁদের প্রতিটা মন্তব্য, প্রতিটা টুইট রাজনৈতিক দাঁড়িপাল্লায় মাপা হয়।

রেফারি ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজালেই খেলা শেষ হয়ে যায়, কিন্তু রাজনীতির খেলাটা চলতেই থাকে। ফুটবল যদি হয় আমজনতার আবেগ, তবে রাজনীতি হল সেই আবেগের রিমোট কন্ট্রোল।

বিশ্বকাপের চিরপরিচিত সোনালি ট্রফিটা যখন কোনও দেশের অধিনায়ক উঁচিয়ে ধরেন, তখন তাঁর ঠিক পিছনেই দাঁড়িয়ে হাসেন সেই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান। সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে আগামী নির্বাচনের জয়ের ব্লু-প্রিন্ট। অতএব, গ্যালারিতে বসে যখন পরেরবার প্রিয় দলের জন্য গলা ফাটাবেন, তখন মনে রাখবেন— আপনি স্রেফ একটা ফুটবল ম্যাচ দেখছেন না, আপনি আসলে না জেনেই কোনও এক রাজনৈতিক মহানাটকের অবৈতনিক অতিরিক্ত শিল্পী হিসেবে অভিনয় করে চলেছেন। খেলাটা তো স্রেফ বাহানা, আসল লক্ষ্য তো ক্ষমতা!

(লেখক সাংবাদিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *