- অভিষেক ঝা
আমাদের মিলেনিয়াল বলে ডাকে জেন জেড-রা। আর আমরা বয়স বেড়ে যাওয়াকে অস্বীকার করতে চাই নিজেদের এখনও ক্রমাগত নাইন্টিজ কিডস বলে। জেন জেড-দের তরফ থেকে আমাদের দিকে তাকালে শুধু একটি শতাব্দীর শেষ নয়, একটি পুরো অন্য দুনিয়াদারির মানুষ বলে মনে হয়। আর আমরা যখন নিজেদের দিকে তাকাই তখন মনে হয় এই তো সবে শুরু। বার্লিনের দেওয়াল ভেঙে দুই জার্মানি জুড়ে গিয়েছে। সোভিয়েত ভেঙে চুরমার। গ্যাট ও ডাঙ্কেলের ভারত টলমল পায়ে হাঁটছে সদ্য।
দুনিয়ার এইসবে আমাদের কোনও আগ্রহ ছিল না। তখন আমরা ‘নাইন্টিজ কিডস’ নই, সত্যি সত্যিই বাচ্চা। নিয়ম করে হওয়া লোডশেডিং-এর সময়ের লন্ঠনের আলোয়, দিস্তা খাতার ফাঁকে লুকিয়ে রাখা বুক ঢিবঢিবের ভিতর দিয়ে নতুন এক বিশ্বের খবর আমাদের কাছে আসছিল। আনন্দমেলা, শুকতারা, কিশোর জ্ঞান বিজ্ঞান, জুনিয়ার সায়েন্স রিফ্রেশার এগুলোর ভিতর দিয়ে এক নতুন জগতের কথা ভেসে আসছিল আমাদের কাছে। কানাডায় থাকা যে কাউকে চিঠি পাঠানো যাবে কয়েক সেকেন্ডে। ব্রিটিশ কাউন্সিলের লাইব্রেরির বই পড়ার জন্য ধার নেওয়া যাবে গ্রামে বসেই।
মুম্বইয়ের (তখন বোম্বে) ডাক্তারকে রিপোর্ট দেখানো যাবে ঘরে থেকেই। গোটা বিশ্ব পৌঁছে যাবে প্রতিটি গ্রামে। দুনিয়া হবে এক ‘গ্লোবাল ভিলেজ’। আর বিবিধ ভেদাভেদে মলিন দুনিয়াকে অমলিন এক বিশ্ব করে তুলবে ইন্টারনেট। এই অন্তর্জালের বিশ্ব নাকি প্রতীকীভাবে ভেঙে ফেলবে রাষ্ট্রীয় সীমারেখার বেড়াজাল। আর একদিন এই প্রতীক নাকি বাস্তবেও মুছে ফেলবে সব সীমারেখা। এগুলিই ছিল আমাদের মতো গড়পড়তা ডিগ্রিধারী শিক্ষিত পরিবারগুলির বাচ্চাদের ইন্টারনেটের ভব্যিষৎ নিয়ে ধারণা।
এক শীতের বিকেলে নয় বছর বয়সি আমি দেখছিলাম টেলিফোন এক্সচেঞ্জের কর্মীরা ‘কেবল’, ‘ফাইবার’ এইসব বলতে বলতে মাটি খুঁড়ছেন আমাদের এলাকায়। কী বিপুল আগ্রহ আর আনন্দ চোখে আমরা দেখছি ইন্টারনেট আসা। ইন্টারনেট আসছে এক ক্যানসার–বিষণ্ণ বাড়িতে। সেই বাড়ির কেউ কেউ সিঙ্গাপুরে সেটলড। বাড়ির এক সদস্যকে বাঁচাবার মরিয়া চেষ্টায় সিঙ্গাপুরে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানো হয়। সিঙ্গাপুরের ক্যানসার চিকিৎসা ভারতের চেয়ে অনেক এগিয়ে তখন। চিকিৎসা করিয়ে এনে নিয়মিত ফলোআপের জন্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ইন্টারনেট আনা হচ্ছিল ওই বাড়িতে। আমরা দেখছি সমস্ত দেশের মেলবন্ধন ও পারস্পরিক সহযোগিতায় সমুদ্রের তলা দিয়ে নটিক্যাল মাইলের পর নটিক্যাল মাইল অবাধে পেরিয়ে ফাইবার বয়ে চলেছে আমাদের গ্রামের মাটি দিয়ে নির্ভার হয়ে।
এক বিশ্ব, এক ইন্টারনেটের স্বপ্নে বিভোর আমাদের কৈশোরের চকচকে চোখে ইন্টারনেট ফ্র্যাগমেন্টেশন বলে কোনও আশঙ্কা ছায়াপাত করেনি। সেই কৈশোর চোখের থেকে আমাদের চোখের দূরত্ব এখন ৩০ বছর। এই চোখে ইন্টারনেট অভিন্ন এক বিশ্বের স্বপ্ন আনে না আর। এই চোখে ইন্টারনেট রাষ্ট্র, শ্রেণি এইসব স্বার্থকে পাশ কাটিয়ে নির্ভারে বয়ে চলা একটি জালিকার বিশ্বরূপ নয়। এটি সীমারেখা মেনে চলতে বাধ্য হওয়া আরেকটা ব্যবস্থামাত্র যেখানে রাষ্ট্র, ধনকুবের প্রত্যেকে নিজেদের স্বার্থের গণ্ডিরেখা দিয়ে ইন্টারনেটকে বেঁধে দেয়।
ইন্টারনেট ফ্র্যাগমেন্টেশন বা স্প্লিন্টারনেট প্রযুক্তিগতভাবে অন্তর্জালের দুনিয়াকে যতটা ধাক্কা দেয়, তার চেয়েও বেশি ধাক্কা দেয় ইন্টারনেটের অন্তর্নিহিত দর্শনটিকে। যে এক বিশ্ব, এক ইন্টারনেট দর্শনের জোরে বলীয়ান হয়ে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে ইন্টারনেট বিকল্প ইউটোপিয়ার হাতছানি দিত, স্প্লিন্টারনেট সেই ইউটোপিয়ার সমাপ্তি। ইন্টারনেট ফ্র্যাগমেন্টশনে প্রতিটি রাষ্ট্রের সহযোগিতায় তৈরি হওয়া ইন্টারনেটের সংযুক্তির জালিকাটিই আর গুরুত্বপূর্ণ নয়। পারস্পরিক সহযোগিতাপূর্ণ সংযুক্তির জায়গা নিচ্ছে পারস্পরিক অসহযোগিতাপূর্ণ বিচ্ছেদ। একটা মুক্ত, রাষ্ট্রীয় সীমারেখাহীন ইন্টারনেটের জায়গায় আমরা ঢুকে পড়েছি সেই সময়ে যখন অনেকগুলি নেটওয়ার্ক আলাদা আলাদাভাবে কাজ করছে। কিন্তু এই নেটওয়ার্কগুলি পারস্পরিক সহযোগিতায় ইন্টার-নেট হতে চাইছে না, বিচ্ছিন্ন থাকতে চাইছে। নেটিজেনদের যে প্রায় অভিন্ন একটি বিশ্ব, প্রায় অভিন্ন একটি তথ্যভাণ্ডার ছিল তা ভেঙে পড়ছে এই বিচ্ছিন্নতার ফলে। তাই নেটিজেনরা একটি অখণ্ড নেটবিশ্বের বাসিন্দা থাকছেন না আর। কেউ চিনের নেটওয়ার্কের নেটিজেন, কেউ রাশিয়ার নেটিজেন, কেউ ইরানের নেটিজেন, কেউ তুরস্কের, কেউবা ছদ্মবিশ্ববোধের আমেরিকার নেটিজেন হয়ে উঠছেন।
সিটিজেনের উপর যে যে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, তা আস্তে আস্তে নেটিজেনের উপরেও আনা হচ্ছে। ফলত নেটিজেন পরিসরটিই অবলুপ্ত হতে চলেছে। জন্ম নিতে চলেছে ভার্চুয়াল সিটিজেনশিপ ধারণার কোনও পরিসর। সিটিজেনশিপের মূল সূত্র মেনেই এই ধরনের ইন্টারনেট ব্যবস্থা উন্মুক্ত হবে না, হবে না অবাধ, হবে না ভয়শূন্য। এই ফ্র্যাগমেন্টেশনের ফলেই ১৯৯৮ থেকে চালু হওয়া চিনের প্রাচীরের মতোই দুর্ভেদ্য চিনের ‘গ্রেট ফায়ারওয়াল’ দিয়ে দেশের তথ্য কোনওভাবেই বাইরে যেতে না দেওয়ার ছুতোয় ইন্টারনেটের এক বিশ্ব, এক ইন্টারনেট নীতি চিন লঙ্ঘন করে চলেছে। ২০১৯ সালে কার্যকর হওয়া সার্বভৌম ইন্টারনেট আইনের জোরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালীন বিদেশি টেক প্ল্যাটফর্মের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করে রাশিয়া ইন্টারনেটের বিশ্বজনীন সুরটি কেটে দেয়। একই পথে হেঁটে ইরানের ন্যাশনাল ইনফর্মেশন নেটওয়ার্কই হোক, ইউরোপের জিডিপিআর হোক, ভারতে প্রস্তাবিত ব্যক্তিগত ডেটা সুরক্ষা বিলই হোক, মায়ানমার, তুরস্ক, বাংলাদেশ, নেপালের ব্যবস্থাই হোক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় আসীন ক্ষমতাবানরা যখনই চেয়েছেন তখনই এক বিশ্ব, এক ইন্টারনেটের পরোয়া না করে ইন্টারনেটের মূল দর্শনটিকেই ভেঙেচুরে দিয়েছেন। ফলে ইন্টারনেট তার অর্থ হারিয়ে পরিণত হয়েছে সীমারেখা মেনে চলা স্প্লিন্টারনেটে।
ইন্টারনেট ফ্র্যাগমেন্টেশনের প্রভাব কতটা তার আন্দাজ এখনও আমাদের নেই। যেমন চতুর্দশ শতাব্দী প্রাথমিকভাবে আন্দাজ পায়নি প্লেগ মহামারির ফলে সিল্ক রুট দিয়ে সংযুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থাই শুধু ভেঙে পড়েনি, ভেঙে পড়েছিল একটি প্রকৃত কসমোপলিটান বিশ্বায়িত দুনিয়া। যে দুনিয়া ভেঙে পড়ার পর আবার যখন জুড়তে শুরু করল তখন সেখানে মিশেছিল বিচ্ছেদ থেকে জন্ম নেওয়া পারস্পরিক অপরিচিতি। যে অপরিচিতির ফলে ঔপনিবেশিক মনে কোনও অপরাধবোধ আসেনি অন্যের উপর নিষ্ঠুরতম আগ্রাসন চালাবার সময়। ইন্টারনেটের ভাঙতে শুরু করা সেই প্লেগের মতোই ভয়ংকর প্রভাবশালী। বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে অশরীরী হয়ে এগোতে থাকে আগ্রাসন। ইন্টারনেট ফ্র্যাগমেন্টেশন সেই আগ্রাসী দুনিয়ার বীজতলা। যে বীজতলায় আলাদা আলাদা স্প্লিন্টারনেটের বাসিন্দা হয়ে আমরা রোপণ করছি অপরিচিতজনিত ঘৃণা। ঘৃণা সবসময়ই বিশ্বমানবতার বিপরীতে বয়।
(লেখক শিক্ষক। জলপাইগুড়ির বাসিন্দা)
The submit নেটের আজকাল এবং আমরা appeared first on Uttarbanga Sambad.
