নিজের দামাল সাহসকে বুনেছিলেন গোগোলের অন্তরে – Uttarbanga Sambad

নিজের দামাল সাহসকে বুনেছিলেন গোগোলের অন্তরে – Uttarbanga Sambad

শিক্ষা
Spread the love


ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য

ততদিনে ফেলুদার গোটা চার পাঁচেক গল্প আর কাকাবাবুর পাহাড়চূড়ায় আতঙ্ক ও মিশর রহস্য পড়া হয়ে গেছে। এমনই একসময়ে হঠাৎই হাতে এসে পড়ল একটি ছোট চটি বাঁধানো বই। ‘সোনালি পাড়ের রহস্য’। সাত বছরের দারুণ কৌতূহলী আর দুঃসাহসী খুদে গোয়েন্দা গোগোলের পুরীতে পোড়োবাড়ির রহস্য উদ্ঘাটনের কাহিনী। অপেক্ষাকৃত বৃহত্তর এবং জটিলতর ক্যানভাসে আঁকা সেযাবৎ পড়া রহস্যরোমাঞ্চ ও অ্যাডভেঞ্চার কাহিনীগুলো দুর্দান্ত রকমের রোমহর্ষক হলেও কীভাবে যেন এই প্রথম বইটি থেকেই মনে মনে ভীষণভাবে জুড়ে গেলাম গোগোলের সঙ্গে। সময়টা নব্বই দশকের মাঝামাঝি। সেসময় স্কুলে গরমের আর পুজোর ছুটি পড়লেই কোচবিহার ছেড়ে হয় মালদায় জেঠুর বাড়ি নয়তো শ্রীরামপুরে মামাবাড়ি যাওয়া ছিল বরাবরের দস্তুর। ছুটির হোমওয়ার্কের পাট চুকিয়ে কখন যে আবারও গোগোলের গল্পে ফিরব তাই মাথায় ঘুরত সারাক্ষণ। এক নিঃশ্বাসে তখন পরপর পড়ছি চোরা হাতি শিকারি, রত্ন রহস্য ও গোগোল, অদৃশ্য মানুষের হাতছানি, পশ্চিমের ব্যালকনি থেকে, দুর্গের গড়খাইয়ের দুর্ঘটনা। সেসময় সদ্য কৈশোর। এক বুক দুরুদুরু কৌতূহল আর চোখভরা অপার বিস্ময় দুনিয়ার যে কোনও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়েই। গোগোলের পাশাপাশিই আবার সমান তালে চলছে পাণ্ডব গোয়েন্দা, টেনিদা, অর্জুনও। কমিকসে টিনটিন। সবক’টিই কিশোরমনের কৌতূহলী, রোমাঞ্চপ্রেমী, অনুসন্ধিৎসু চরিত্রের খিদে মেটানোর জন্য দুর্ধর্ষ হলেও গোগোল কিন্তু ছিল বেশ স্বতন্ত্রই। ঘরের মধ্যে বা কাছেপিঠে, আমাদের চেনা গণ্ডির মধ্যেই মূলত ছিল তার বিচরণ। এবং, কিশোর পাঠকের উপযুক্ত বোধবুদ্ধি ও সাধারণ জ্ঞানের সাহায্যেই সব রহস্যের সমাধান করত সে। ফলে তার বয়সি বা কোনও সদ্য কৈশোরও অনায়াসে একাত্মবোধ করতে পারত তার সঙ্গে, মনে মনে জড়িয়ে পড়তে পারত রহস্য সন্ধানে।

সমরেশ বসু মোটামুটি সত্তর দশকের গোড়া থেকে যখন কিশোর গল্প লিখতে আরম্ভ করলেন কিছু গল্প বিচ্ছিন্নভাবে নানা বহুলপ্রচারিত জনপ্রিয় মাসিক ও শারদীয়া পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে ১৯৭৫ সালে লিখেছিলেন ছোটদের জন্য মজার গল্প ‘মোক্তারদাদুর কেতুবধ’। আরও একটি গল্পে পাই একটি ছোট ছেলের রিজার্ভ ব্যাংক দেখতে যাওয়ার ঘটনা। মজার মোড়কে অথচ শিক্ষণীয় বিভিন্ন বিষয়কে খুব হালকা মেজাজে কিশোর পাঠকের উপযোগী করে তিনি ফুটিয়ে তুলতেন এই কিশোরপাঠ্য গল্পগুলিতে। তবে কিশোরদের জন্য যে চরিত্রটিকে তিনি দীর্ঘসময় ধরে, অত্যন্ত যত্নে গড়ে তুলেছিলেন সে গোগোলই। গোগোলের প্রথম আবির্ভাব ‘ইঁদুরের খুট খুট’ গল্পে, ১৯৭২ সালে। এরপর প্রায় টানা দুই দশক প্রতি শারদীয়ায় গোগোলের উপন্যাস ছিল বাঁধা। আমরা যেসময় পড়েছি তখন অবশ্য গোগোল এসে গেছে ছোট ছোট চটি বই অথবা মোটা বাঁধাই করা অমনিবাসের খণ্ডে। গরমের নির্জন দুপুরে তেতলার ছাদে বসে অথবা পেছন বাগান ঘেঁষা বক্স জানলায় হেলান দিয়ে তখন গোগ্রাসে গিলছি গোগোলের একের পর এক বড় গল্প, উপন্যাস।

গোগোল সম্বন্ধে মোক্ষম কথাটি বলেছিলেন গোগোল অমনিবাসের মুখবন্ধে শ্রীনিতাই বসু মহাশয় স্বয়ং, ‘‘গোগোল যার নাম, তার নামে যে ‘গোল’ কথাটা আছে। যার নামের পিছনে গোল আছে, তার কাজে তো গোলমাল থাকবেই।’’ তবে নানান সময়ে নানান রহস্যে যে জড়িয়ে পড়ে গোগোল, তা যে কেবলমাত্র তার স্বভাবসুলভ অতি কৌতূহলী চরিত্রের কারণেই এটা বারবার বিভিন্ন গল্পে স্পষ্ট করেছেন সমরেশ নিজেই। আসলে এই দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত বালকটিকে তিনি আর পাঁচটা স্বাভাবিক প্রাণোচ্ছল বাচ্চার মতো করেই গড়তে চেয়েছিলেন। গোগোলের প্রথম গল্প ‘ইঁদুরের খুট খুট’-এর শুরুতে তাই নিজেই বলেছেন, ‘সম্প্রতি আমি এক বিশিষ্ট বিজ্ঞানীর লেখা পড়ছিলাম। তিনি একটা অদ্ভুত কথা শুনিয়েছেন। তিনি মানুষের মন নিয়ে অনেক গবেষণা করে আবিষ্কার করেছেন, মাত্র ছ’বছর বয়সের মধ্যে শিশুদের মনে যেসব ভাবনাচিন্তা, কল্পনা এবং জ্ঞানবুদ্ধির প্রসার ঘটে, পরবর্তীকালে অর্থাৎ ভবিষ্যতে মানুষ যত বুড়ো হয়, সেই ছ’বছরের ভাবনাচিন্তা কল্পনা জ্ঞানবুদ্ধিই নানারূপে নানাভাবে বিকাশলাভ করে। তার মানে হল, ছ’বছর বয়স পর্যন্তই মানুষের যা কিছু অনুভূতির পূর্ণতা ঘটে, পরে তা নানারূপে বিকাশলাভ করে। তা তিনি বিজ্ঞানী হোন, কবি বা সাহিত্যিক হোন, রাজনৈতিক নেতা বা ডাক্তার হোন।’

কিশোর সাহিত্যের অন্যতম প্রয়োজনীয় উপাদান হল তা থেকে প্রাপ্ত শিক্ষণীয় বিষয়গুলি। এখানেই গোগোলের কাহিনীগুলি বাকি সমসাময়িক কিশোর গল্প উপন্যাসের থেকে সচেতনভাবে আলাদা। এই বৈশিষ্ট্য সমরেশের অন্যান্য কিশোর উপযোগী ছোটগল্পগুলিতেও লক্ষণীয়। প্রথমেই আসি গোগোলের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রসঙ্গে। বাড়িতে দুই কাজের লোক বঙ্কিম ও হারাধন বাদে গোগোলের পরিবারে আছে কেবল গোগোলের বাবা সমীরেশ চ্যাটার্জি ও মা সুনীতিদেবী। বাবা পদস্থ বেসরকারি চাকুরে ও মা ঘরোয়া কাজে সারাদিন ব্যস্ত। ফলে ছোট্ট গোগোলের দিনগুলো অধিকাংশ সময়েই কাটে নিঃসঙ্গ। তা সত্ত্বেও যেটুকু সময় মা-বাবার সঙ্গে কাটায় সে, তা কাটে তাঁদের সঙ্গে শিশুসুলভ খেলাধুলো, গল্প ও রাজ্যের প্রশ্ন করে। পড়াশোনায় সবসময় ভালো রেজাল্ট হয় না। মা রাগ করেন। আবার বাবা সামলে নেন যুক্তিপূর্ণ সংযত শাসনে। ইংরেজি মিডিয়ামে পড়লেও বাংলায় কথা বলা, বাঙালি সাধারণ সহবত গোগোলের পারিবারিক শিক্ষা। আজকের এই ভাষা বিপন্নতার সময়ের প্রেক্ষিতে যে পারিবারিক নীতিশিক্ষা ও মূল্যবোধগুলি ভীষণ ভীষণ প্রাসঙ্গিক।

কিশোর বয়সে নতুনকে জানার আগ্রহ ভারী প্রবল হয়। অবশ্য সে উৎসাহ বড় বয়সেও কিছু কমে না। তাই হয়তো গোগোলের গল্পগুলি টেকনিকালি সম্পূর্ণভাবে ছোটদের জন্য হলেও গল্পের অজস্র বিস্ময়কর তথ্য সব বয়সি পাঠককেই সমৃদ্ধ করে। কুড়িটির মতো এই গল্পগুলিতে গোগোল ঘুরে বেড়িয়েছে মধুপুর (গোগোলের কেরামতি), চুর্নি নদীতীরে কালীনারায়ণপুর (জোনাকি ভূতের বাড়ি), জলদাপাড়া (বুনো হাতির বন্ধুত্ব), কোয়েলের তীরঘেঁষা সারাণ্ডার জরাইকেলা (গরাদহীন জানলায় রাক্ষস) থেকে দার্জিলিং কালিম্পং পাহাড় (অদৃশ্য মানুষের হাতছানি, কাইরং মঠে গোগোলের কাণ্ড, হারানো বুদ্ধগুপ্তি), এমনকি কাশ্মীরও (ইঁদুরের খুট খুট)। সবক’টি জায়গাতেই কিছু না কিছু নতুন জিনিস জেনেছে সে। এখান থেকেই উঠে আসে দুর্গা প্রতিমার মুখের ঘামতেলের কথা, অষ্টধাতু আসলে কী, গুলতি কীভাবে বানানো হয়, চোরাবালি কাকে বলে, ডুয়ার্সের বৈকুণ্ঠপুর জঙ্গলের সাংঘাতিক হিংস্র বুনো কুকুরদের গল্প, জলপাইগুড়ির করলা নদীর ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি ইত্যাদি। গল্প তাই শুধু আর গল্প থাকে না। হয়ে ওঠে নিজের দেশ চেনার আয়নাও। একটি বালক অথবা কিশোর যখন গড়ে উঠছে, বড় হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে, নিজের পারিপার্শ্বিক, পরিবেশ ও সংস্কৃতি নিয়ে তার আকাশজোড়া বহুবিচিত্র কৌতূহলের অনেক অনেক উত্তর এভাবেই আলগোছে ছড়িয়ে আছে গোগোলের প্রতিটি গল্পে। ফলে গল্পগুলি চিরকালীন, কালজয়ী। সেকারণেই হয়তো ক’বছর আগেই পরপর সিনেমার পর্দাতেও দেখা গেল এই খুদে গোয়েন্দাকে, সোনালি পাড়ের রহস্যগল্প অবলম্বনে অরিন্দম দে’র পরিচালনায় ‘গোয়েন্দা গোগোল’(২০১৩) এবং গোগোলের রায়রাজা উদ্ধার ও মহিষমর্দিনী উদ্ধার অবলম্বনে পম্পি ঘোষ মুখার্জির ‘গোগোলের কীর্তি’(২০১৪) ছবি দুটিতে। সবশেষে ইতি টানব গোগোলের বাবা সমীরেশের কথাতেই, যখন তিনি ছেলেকে কথা প্রসঙ্গে বলছেন, ‘কাপুরুষতা আমি মোটেই পছন্দ করিনে।’ আসলে এই অসম্ভব অমূল্য কথাটিই কিন্তু শেষপর্যন্ত গোগোলের সব দুঃসাহসের মূলে। সমরেশ সৃষ্ট দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত, সাহসী, আদ্যন্ত বাঙালি এই চরিত্রটি তাই হয়তো আজও অমর বাংলার কিশোর সাহিত্যে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *