সমস্ত সৃষ্টিতেই নিজের মতো বাঁচার বার্তা – Uttarbanga Sambad

সমস্ত সৃষ্টিতেই নিজের মতো বাঁচার বার্তা – Uttarbanga Sambad

ভিডিও/VIDEO
Spread the love


স্বাতি দাশ চৌধুরী

গত ১১ ডিসেম্বর সমরেশ বসুর ১০১তম জন্মদিনে আলোচনায় সঞ্চালক বললেন, শতবর্ষ পরে সমরেশ বসু কতটা এই সময়ের সংলগ্ন। ঠিকই, শতবর্ষ অতিক্রান্ত একজন সাহিত্য প্রতিভার প্রাসঙ্গিকতার কথা তো ভাবায়। সমরেশ বসুর মৃত্যুর পর ৩৭ বছর অতিক্রান্ত। ইতিমধ্যে ভুবনায়নের হাত ধরে সারা বিশ্ব একটি দৃশ্যশ্রাব্য মাধ্যমের ঘেরাটোপে গুছিয়ে বসেছে। সেই ঘেরাটোপের অভ্যস্থতায় এই প্রজন্ম শুধু নয়, আমরা অধিকাংশ মানুষ আকণ্ঠ নিমজ্জিত। বইকে আঁকড়ে থাকার জ্ঞান এবং বিনোদনে আগ্রহী মানুষ এখন আণুবীক্ষণিক সংখ্যালঘু। গত ২০ বছর আমার নিরানব্বই শতাংশ তরুণ ছাত্রছাত্রীকে আকুল প্রশ্ন করেও সিলেবাসের বাইরে বই পড়ার কোনও হদিস আমি পাইনি। তাই বলে ‘গেল গেল’ এমন হা-হুতাশের সঙ্গী আমি নই। এই মাধ্যমটি আশ্রয় করেই সম্ভব বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণাক্ষর ওদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

কেন জানব এবং পড়ব সমরেশ বসুকে। তার উত্তর খুঁজতে হবে লেখকের জীবন প্রবাহে। তাঁর জীবন শেখায় নিজের শর্তে বাঁচা, জীবনের একটি লক্ষ্যে অবিচল থাকা, নিবিড় অনুশীলন, শিরদাঁড়া সোজা রাখা, সত্যি কথা বলার অদম্য সাহস, সমাজ, রাজনীতি সচেতনতা এবং মানুষকে আধ্যাত্মিক উপলব্ধি করা। হ্যাঁ, এই সবক’টির সন্ধান মেলে তাঁর জীবন এবং সাহিত্যে।

ছেলেবেলা থেকে সমরেশ সৃষ্টিছাড়া বাউন্ডুলে। লেখাপড়া ছাড়া সবেতে তাঁর আগ্রহ এবং কৌতূহল। পিতা অতিষ্ঠ হয়ে পাঠিয়ে দিলেন নৈহাটিতে দাদার কাছে। ভর্তি হলেন অষ্টম শ্রেণিতে। কোনওরকমে হয়তো নবম শ্রেণিতে উঠেছিলেন– ছেড়ে দিলেন প্রথাগত পড়াশোনা। বাঁশি বাজানো, গান গাওয়া, ছবি আঁকা, অভিনয়ে তাঁর মন। এরপর যেটা করলেন তার জন্য সেই সময় শুধু নয়, আজকের দিনের অভিভাবকও সন্তানের ওপর সব আশাভরসা জলাঞ্জলি দেবেন নিশ্চিত। ১৭ বছর বয়সে বন্ধুর দিদি, চার বছরের বড়, বিবাহবিচ্ছিন্না, ব্রাহ্মণ কন্যাকে বিয়ে করে উঠলেন শ্রমিক বস্তিতে। জীবিকা? ঘরে ঘরে ডিম, সবজি বিক্রি। কিন্তু তাঁর চেতনে অবচেতনে একটা লক্ষ্য স্থির। লেখা। সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য শুরু হল নিজেকেই শান দেওয়া। অনুশীলন এবং অনুশীলন। কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়ে মিটিং, মিছিল, পার্টির জন্য পোস্টার লেখা, আঁকা, সেই সঙ্গে শ্রমিক মহল্লায় ঘুরে ঘুরে পার্টির আদর্শ প্রচার। হাতে লেখা পত্রিকা প্রকাশ করছেন এবং নিজেদের তৈরি উদয়ন পাঠাগারে রাত ১২টা–১টা পর্যন্ত হ্যারিকেনের আলোয় বিশ্বসাহিত্য এবং দেশীয় সাহিত্য পরিক্রমা। লেখক সত্তাকে গনগনে করছেন সমরেশ। নিজের লক্ষ্যে স্থির প্রতিজ্ঞ।

১৯৪৬ সাল। পরিচয় পত্রিকায় প্রকাশিত হল সমরেশের গল্প ‘আদাব’। দাঙ্গাবিধ্বস্ত সময়ে ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে,  এমন একটি মানবিক আখ্যান সাহিত্যসমাজ সহ পাঠককুলকে চমকে দিল। শুরু হল তাঁর বৃহত্তর লেখকজীবনে পদচারণা, শেষ হল ১৯৮৮ সালে ‘দেখি নাই ফিরে’ অর্ধসমাপ্ত রেখে। পাড়ি দিলেন অমৃতলোকে।

তাঁরই ভাষ্যে, তাঁর রাজনৈতিক গুরু সত্যপ্রসন্ন দাশগুপ্তের চেষ্টায় গান ফ্যাক্টরিতে বন্দুকের নকশা আঁকার কাজ পেয়েছিলেন এক টাকা চার আনা রোজে। কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হলে ১৯৪৯ সালে কারাবাসে যান এবং চার বছর জেল খেটে ফিরে আসেন। ইতিমধ্যে চাকরিটি গিয়েছে। চাকরি ফেরতের সম্ভাবনায় জল ঢেলে, শিরদাঁড়া সোজা রেখে স্থির করলেন শুধুই লিখবেন। কমিউনিস্ট পার্টি থেকেও বিচ্ছিন্ন হলেন সক্রিয়ভাবে। কারণ পার্টির ভেতরে স্ববিরোধিতা তাঁকে পীড়া দিত। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কমিউনিজমে বিশ্বাস রেখেও পার্টির চাপানো কোনও শর্তে নিজের কলমকে চালনা করেননি। এরকম একটি সাহসকে জানবে না এই প্রজন্ম!

ফেরা যাক সমরেশের লেখালেখির সাম্রাজ্যে। সমরেশ বসু এবং কালকূট নামে দুই ভিন্নতর সত্তায় লিখেছেন ২০০টি গল্প, শ-খানেক উপন্যাস। ভ্রমর ছদ্মনামেও লিখেছেন বেশকিছু উপন্যাস। কিশোরদের জন্য তাঁর রচনা গোগোল সমগ্র। লিখেছেন বেশকিছু মূল্যবান প্রবন্ধ। সমরেশের লিখন প্রতিভার এই বিশালতাকে কীভাবে ধরা সম্ভব! সব তো পড়াও হয়নি। তবু যতটুকু পড়েছি তার আলোচনাই বা কোথা থেকে শুরু করে কোথায় দাঁড়ি টানব।

‘উত্তরঙ্গ’, ‘নয়নপুরের রূপকথা’ পেরিয়ে ধরা যাক ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত ‘শ্রীমতী কাফে’ উপন্যাসটি। একটি সামান্য চায়ের দোকান, যাকে অতি কষ্টে তরুণ ভজন উন্নীত করেছে রেস্টুরেন্টে, সেটাই যেন হয়ে উঠল স্বাধীনতা পূর্ব শেষ আড়াই দশকের ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ঠেক। গান্ধিজির রাজনৈতিক দর্শন, সশস্ত্র সংগ্রামের চেতনা, মৃদুস্বরে কমিউনিজমেরও আড্ডাখানা হয়ে উঠল ‘শ্রীমতী কাফে’। এ যেন স্বাধীনতাকামী আপামর মানুষের নানাবিধ ব্যাকুল কণ্ঠস্বর। দেশ স্বাধীন হল। কিন্তু খণ্ডিত হল সেই স্বাধীনতা। ‘সুচাঁদের স্বদেশ যাত্রা’ এবং ‘খণ্ডিতা’ দেশভাগের যন্ত্রণার আকুল করা আখ্যান।

‘আপনার সামনে কেউ একটা অসহায় মেয়েকে রেপ করে গেল। আপনি মনে মনে বললেন ছিঃ খুব খারাপ। এটাকে মনে মনে খাঁটি থাকা বলে না। ময়দানে আসতে হবে মশাই, ময়দানে, কাজ আর আচরণ দিয়ে বোঝাতে হবে।’ এই কথাগুলো ১৯৬৭ সালে ‘স্বীকারোক্তি’ গল্পের।  আত্মানুসন্ধানের গল্প। আজকে এমনকি আগামী ৫০ বছর পরও থাকবে সমানভাবে সত্য। ফিরে যাই ‘যুগ যুগ জিও’, ‘মহাকালের রথের ঘোড়া’, ‘শেকল ছেঁড়া হাতের খোঁজে’র মতো উপন্যাসের পাঠে। ‘যুগ যুগ জিও’ এমন একটি সময়ের দর্পণ যখন ফ্যাসিবাদ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দাপটে বিশ্ব কাঁপছে। সমরেশ বসুর তীক্ষ্ণ সন্ধানী কলমে ফুটে উঠছে বিদ্রোহ-বিপ্লবের অমোঘ সত্যতা।

৭০-এর দশকে নকশাল আন্দোলনের সময় গ্রাম দিয়ে শহর ঘিরে নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখা রুহিতন কুরমির জীবন আলেখ্য ‘মহাকালের রথের ঘোড়া’। আশির দশকে লেখা ‘শেকল ছেঁড়া হাতের খোঁজে’। ভারতের বামপন্থী আন্দোলনের এমন গঠনমূলক সমালোচনা ক’জন বামপন্থী তাত্ত্বিক এভাবে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে পারবেন,  ভাবার বিষয়।

ছোটগল্প ‘ষড়ঋতু’, ‘অকাল বসন্ত’, ‘উজান’, ‘শুভ বিবাহ’, ‘শানা বাউড়ির কথকতা’, ‘উড়াতিয়া’, ‘কিলমিশ’, ‘ফুলবর্ষিয়া’, ‘ধর্ষিতা’ – এইসব গল্প, খেটে খাওয়া নিম্নবিত্ত, বস্তিবাসী, পথবাসী মানুষের সুখ-দুঃখ, ভালোবাসা, স্বার্থপরতা, যৌনতা, তথাকথিত নীচতা, সহমর্মিতা– সবটা যেন আদ্যন্ত নিংড়ে নিয়ে লিখলেন আপন অভিজ্ঞতার আলোকে। তাঁর লেখার চরিত্রগুলোকে তিনি পরম যত্নে আদরে রূপ দিতেন। তাঁর কথায় ‘আমি জীবনের জন্য লিখি, সাহিত্যের জন্য লিখি না’।

কালকূট, সমরেশ বসুর দ্বিতীয় সত্তা। কালকূটের অবয়বে, হাজারো চেষ্টায়ও সমরেশ বসুকে খুঁজে পাওয়া দুরূহ। ‘শাম্ব’, ‘প্রাচেতস’, ‘পৃথা’, ‘কোথায় পাব তারে’, ‘অমৃত কুম্ভের সন্ধানে’, ‘স্বর্ণ শিখর প্রাঙ্গণে’ ইত্যাদি আখ্যান আমাদের এক অনন্য, গভীর জীবন পথের পথিককে চেনায়! রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণের এমন নির্মোহ বিশ্লেষণ, যেন এক নিবিড় গবেষকের অনুসন্ধান। ‘শাম্ব’ একজন মানুষের সব বাধা পেরিয়ে উত্তরণের গল্প। ‘পৃথা’ সেই নারীর কথা যিনি সংসারের সমস্ত ঘাতপ্রতিঘাতেও অবিচল।

‘অমৃত কুম্ভের সন্ধানে’ – কুম্ভমেলায় যেন কালকূট খুঁজে ফেরেন সারা ভারতের বিচিত্র মানুষকে, তাদের মননকে। আসলে সমরেশের ছিল একটি বলিষ্ঠ জীবনবোধ যা তাঁকে দিয়েছে একই সঙ্গে কার্ল মার্কস এবং গান্ধিজির প্রতি সমান শ্রদ্ধা। দুজনেই তাঁকে দিয়েছেন প্রভূত লেখার জোর এবং মানুষকে ভালোবাসার অন্তর্দৃষ্টি, সঙ্গী হয়েছিল বাউন্ডুলে বহুমাত্রিক জীবনাভিজ্ঞতা। চমৎকৃত করে তাঁর লিখনশৈলী। কালকূটসত্তা বাদ দিয়েও স্বনামে তাঁর লেখায় নিজেকে কতভাবে ভেঙেছেন! ‘স্বীকারোক্তি’, ধর্ষিতা’, ‘আয়নায় নিজের মুখ’, ‘বিবর’, ‘প্রজাপতি’, আরও কত লেখায়  ক্রমাগত পালটেছেন লিখনশৈলীকে। জীবনসায়াহ্নে  সমরেশ আক্ষেপ করেছেন ‘তারাশঙ্করের মতো একটা লাইনও লিখতে পারলাম না’। এই অতৃপ্তিই কি লেখককে তাঁর লিখনশৈলীর পরীক্ষানিরীক্ষায় প্রণোদনা দিয়েছে!

প্রচুর লিখেছেন। ৪২ বছরের সাহিত্য জীবনে এত লেখা সম্ভব! সত্যি এও এক বিস্ময়! প্রচুর লিখলে সব লেখা সমমানে উত্তীর্ণ হয় না। মনে রাখতে হবে লেখাই ছিল তাঁর একমাত্র রুটিরুজির আশ্রয়। ‘বিবর’, ‘প্রজাপতি’ ইত্যাদি তাঁর লেখা নিষিদ্ধ এবং বিতর্কিত উপন্যাস তাঁকে দিয়েছিল বিপুল জনপ্রিয়তা এবং অর্থ। এই লেখাগুলো লিখতে কলজে এবং কবজির জোর, দুটোই লাগে। আজকের তুমুল জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘অ্যানিমাল’–এর দর্শক পড়ে দেখতে পারেন ষাটের দশকে লেখা ‘বিবর’, ‘প্রজাপতি’। মালুম হবে পৌরুষ কাকে বলে!



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *