শুভ্র মৈত্র
এই যে রাস্তায় এখন গিজগিজ করছে টোটো, ওদের জ্বালায় হাঁটা দায়, তাদের কাউকে আপনার বাড়ির ঠিকানা বলুন, অবধারিত উত্তর পাবেন ‘যাব না, স্টেশনে গেলে উঠুন’। আচ্ছা আপনি খামোকা স্টেশনে যেতে যাবেন কেন? বা প্রয়োজন না থাকলেও হাসপাতাল বা কোর্ট, বড়জোর বাজার? আপনি ধন্দে পড়বেন সব মানুষ কি শুধু এইসব জায়গাতেই যায়? কেউ বাড়ি ফেরে না? রাগ হয়, বিরক্তি হয়, ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ে নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ লিখতেও ইচ্ছে হয়, কিন্তু ওদের শক্ত চোয়ালে ‘না’ বলা ঠেকাতে পারবেন না। যদি কেউ খানিক দয়া করে, তবে বড়জোর বলতে পারে, ‘একজন? নাহ যাব না’। অর্থাৎ আপনার এক মারাত্মক অপরাধ পাওয়া গেল, কেন কোনও সঙ্গী, তাও জনা তিনেক, জোটাতে পারেননি। আর আরও বড় অপরাধ তো আগেই করে রেখেছেন, বাড়িটা বাজারে বা স্টেশনে করেননি! অথচ আপনার মনে হয় না, এত সংখ্যা এদের, সকলে ভাড়া পায়? সবার নিশ্চয়ই যথেষ্ট উপার্জন হয় না!
তবে যদি বলেন, টোটো নয়, রিকশাতে বসলেই আমার খানিক রাজা রাজা মনে হয়। না রিকশাতে বিশেষ কারও সঙ্গে গা ঘেঁষে বসার সুবিধার জন্য ততটা নয়, যতটা একা পায়ের ওপর পা তুলে বসার সুবিধার জন্য। চাই কি একটা সিগারেটও ধরানো যায়। ওই মুহূর্তটাই যে নিজেকে রাজা ভাবার সময়। মাটির থেকে ফিট তিনেক ওপরে, তার বেশি নয়, বেশ একটা ওপরে বসে থাকাও হল, আবার সবাইকে দেখাও যায়, তার চেয়েও বেশি দেখানোও যায়। আর কোথাও এমন আয়েশ আছে? নাহ। এই যে একটা মানুষ আমার দিকে পেছন ফিরে প্যাডেল ঠেলছে, আর আমি আপাত উদাসীন কিন্তু সচেতন চোখে তাকিয়ে দেখছি রাস্তার মানুষকে, সুবেশা বৌদি থেকে কলেজ ফেরত মেয়েদের, এমন সুযোগ রিকশা ছাড়া আর কে দেয়? এমনকি টোটোয় বসা যাত্রীদের দেখেও খানিক করুণা করা যায়। ওরা হয়তো পৌঁছোবে আগে, কিন্তু এটা কোনও জার্নি হল, কেউ কাউকে চেনে না, চুপ করে বসে থাকো, অথবা মোবাইলে মুখ গুঁজে।
কিন্তু এ হেন আয়েশ পাওয়া কি সোজা কথা? এই যে নিজের রিকশায় সিটে বসে, চালকের সিটে পা তুলে অনন্ত সময় ধরে বসে থাকা মানুষটি, ‘যাবে?’ (রিকশাওয়ালাদের ‘তুই’ বড়জোর ‘তুমি’ সম্বোধন করাই আমাদের সাহেব রীতি) শুনলে কেমন দার্শনিক ভঙ্গিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে গন্তব্য না জেনেই বলে দিল, ‘য্যেবে না’। এমন তাচ্ছিল্য ছিল সেই না বলায় যে আর প্রশ্ন করা যায় না। নইলে এসেছিল অনেকগুলো- কেন যাবে না? যাবেই না যদি তাহলে স্ট্যান্ডে বসে আছ কেন? আজকাল টোটোর দাপটে তো এমনিই ভাড়া পাও না, তাও এই ‘না’ আসে কোথা থেকে? কলকাতায় শুনেছি হলুদ ট্যাক্সির এমন ‘যাবে না’ বলারও ফুরসত নেই। শুনতেই পায় না। তা বলে আমাদের এই গঞ্জ শহরে এমন প্রত্যাখ্যান? তাৎক্ষণিক গজিয়ে ওঠা প্রচণ্ড রাগ কমলে ভেবে দেখি, ওর না যাওয়ায় যতটা না, ওর এই উদাসীন ‘না’ বলার ভঙ্গিতেই আমার যাবতীয় ঈর্ষা। দুটো টাকা’র জন্য কত কিছু করি আমরা! মনের আরও কিছু কাজ কুলুঙ্গিতে তুলে রেখে হিসেব কষতে বসি, দিনে কত টাকা উপার্জন হলেই ওদের এমন নির্লিপ্তি আসে!
আচ্ছা, এই ‘না’ শোনাটা কি শুধুই এই চালকদের থেকে পেতে হয়? ছেলেবেলা থেকে মা-বাবার কাছে শুনে শুনেই অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তখন সান্ত্বনা ছিল, বড় হই, দেখছি! তখন রাজ্য লটারির প্রথম পুরস্কার ছিল এক লক্ষ টাকা। তা ‘লটারিতে প্রথম পুরস্কার পেলে তুমি কী করবে’ বিষয়ক রচনায় আমার বন্ধু তোতা যখন লিখল, ‘এক লক্ষ টাকা পেলে প্রথমেই যাব ঘুগনি-চপের দোকান, তারপর আইসক্রিম…’ — মাস্টারমশাই মেরেছিল কি না আজ আর মনে নেই, তবে সে ইচ্ছা যে বাড়িতে শোনা হাজার হাজার ‘না’ এর বিরুদ্ধে আমাদের সকলের প্রতিস্পর্ধা, তা নিশ্চিত।
তবুও সেই ‘না’ আর পিছু ছাড়ে না। এই যে বাড়িতে সেদিন ব্রহ্মমুহূর্তে টিভিটা অফ হয়ে গেল, মানে পর্দায় সরল বৌমা’র বিরুদ্ধে করা শাশুড়ির ষড়যন্ত্র সবে প্রকাশ পেতে শুরু করল, তক্ষুনি টিভি বন্ধ। রিমোটের গালে গালে চড় কষিয়ে, এমনকি হারিয়ে যাওয়া অভ্যাস ফিরিয়ে দু’-একবার ভয়ে ভয়ে টিভিকেও থাপ্পড় মেরে যখন কিছুতেই আর দজ্জাল শাশুড়ির মুখ দেখা গেল না, তখন বাধ্য হয়েই ফোনে ধরতে হল পাশের পাড়ার টিভির মেকানিককে, ‘বাবা, টিভিটা না…’। সপাটে উত্তর এল, ‘কাল সকালে ফোন করবেন’। ঠিক যেমন একটু আগে রিমোটে থাপ্পড় মারছিলাম আমি। এমন দাপট সেই গলায়, কী করে বলি, আজ রাতে তাহলে কীভাবে…?
তবে কি, এসব প্রত্যাখ্যানের প্রস্তুতি থাকা উচিত। পৃথিবীর কোনও কলের মিস্ত্রি বা বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে দেখা করতে আসা প্রেমিকা ঠিক সময়ে এসেছে, এমন দুর্নাম তাদের কেউ দিতে পারেনি। হাসপাতালে রাউন্ডে আসা ডাক্তারবাবুও যে দেরি করবেনই তা তো জানা কথা। তা বলে ঠেলতে ঠেলতে বাইকটা পেট্রল পাম্পে নিয়ে গিয়ে শুনতে হবে ‘হবে না, তেল নেই’? আর ও ব্যাটা এটা বলার সময় মোবাইল থেকে মুখ তোলার অবধি প্রয়োজন মনে করল না!
আর ইদানীং তো রান্নার গ্যাস ডেলিভারির ছেলেটা প্রশ্নের উত্তরে ঘাড়ও ঘোরাচ্ছে না, ‘আপনার নাই’ ছুড়ে দিচ্ছে আকাশে। ঠিক যেমন সাধন’দা, আমাদের স্কুলের লাইব্রেরিয়ান, কোনও নির্দিষ্ট বই চাইলেই বলতেন, ‘নাই’। গ্যাসের ছেলেটাকে যে বকশিশ দিই নিয়মিত, ওর গলায় তার নামগন্ধ নেই।
কে জানত, বড় হওয়া থুড়ি বুড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ‘না’ শোনার অভিজ্ঞতা ক্রমেই বাড়বে। এবং সেই না-এর বেশিরভাগটাই আসে গিন্নির কাছ থেকে। প্রথম প্রথম দুটো মাত্র নাইট শোয়ের টিকিট নিয়ে এলে শুনতে হত ‘না’, রবিবার দুপুরে ঘরের দরজা বন্ধ করলেও ‘না’। আর এখন সেই ‘না’ একই থেকে গেছে, শুধু জায়গাগুলি পালটেছে। নেমন্তন্ন বাড়িতে যাওয়ার আগে যে পোশাকটাই পরি না কেন, তাতেই না। তিনি নিজে যে জামাটা বের করে দেবেন সেটাই পরতে হবে। বা খাওয়ার পাতে আর একটা রসগোল্লা চেয়ে নিলেও, না। সেটার জন্য আজকাল আবার মুখে শব্দ করতেও হয় না, সুগার-কোলেস্টেরল-ডাক্তার সব মিলেমিশে একটা তীব্র ‘না’ বেরিয়ে আসে দৃষ্টিতে। ধুত্তেরি, খাবই না, হয়েছে? দাঁড়ান দাঁড়ান, উঠতেও পারবেন না, সেখানেও এক পুলিশি ‘না’।
এত হাজারো ‘না’ এর মধ্যেই ভোট এসে যায়। এবার তেমন ‘না’ শুনতে হবে না। ওই যে হাসি হাসি মুখে এগিয়ে আসছে আপনার বাড়ির দিকে, পরনে সাদা পাঞ্জাবি, এই সাতসকালেও কপালের টিকা ধেবড়ে গেছে ঘামে, আপনার দিকে তাকিয়ে এমন করে হাসছেন যেন সেই শৈশবে মেলায় হারিয়ে যাওয়া সহোদর– তিনি কিন্তু শুধুই অস্ত্যর্থক অর্থাৎ হ্যাঁ বাচক। রাস্তা? -হ্যাঁ, জল?-হ্যাঁ, বিদ্যুৎ? -হ্যাঁ। চাকরি? – হ্যাঁ। একটু সাহস করে যদি জিজ্ঞেস করতে পারেন, এবারের চাঁদে যাওয়ার মহাকাশযানে একটা সিট খালি হবে?- সেটারও উত্তরে ‘হ্যাঁ’ শুনতে পারেন।
কিন্তু এতে ভুলে গেলেই ভুলভুলাইয়া। ভোটের পরে এ সবগুলোতেই ‘না’ শুনতে প্রস্তুত থাকতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা দেখা পাওয়াতেই পড়বে বড় ঢ্যারা।
সব ‘না’ মনে থাকলে যে জীবন চলে না, তা আর কে না জানে? রিকশাওয়ালার গতকালের অপমান বিলকুল হজম করে নিতে হয়, আবার বলতে হয়, ‘যাবে?’ এবং সেদিন দয়াপরবশ হয়ে রাজি হলে আপনি আবার চেপে বসেন ফুরফুরে মেজাজে। আর স্কুলফেরত ছেলেমেয়ের দল দেখে মনে পড়ে যায় নিজের সেই সব দিনের কথা। সেই যে টিউশন কিশোর সাইকেলে পথ আটকেছিল কিশোরীর, আর ঝড়ের বেগে শুধু বলতে পেরেছিল, ‘কিছু বুঝিস না, না?’ তারপরেই আরও জোরে প্যাডেলে চাপ দিয়ে উড়ে গেছিল দিগন্তরেখা পার হয়ে। শুনতে চায়নি শেষ সূর্যের রং মাখা দুই বিনুনি কিশোরীর চোখে কী লেখা ছিল।
আসলে ‘না’ শুনতে ভয় পেত সে।
