…শশী হে!

…শশী হে!

শিক্ষা
Spread the love


মায়ের মুখের রূপকথা থেকে মহাকাশ জয়ের মঞ্চ

দেবাশীষ সরকার

শিশুকালে ঠোঁটে বোল ফোটার আগেই মায়ের কোলের ওমে জীবনের প্রথম চাঁদ দেখার আসর বসে। পৃথিবীর প্রায় সব প্রান্তেই শিশুদের এই এক অভিন্ন অভিজ্ঞতা। কিন্তু নিতান্তই এক দুপেয়ে প্রাণী থেকে ‘মানুষ’ হয়ে ওঠার প্রায় ২০ লক্ষ বছরের সুদীর্ঘ যাত্রাপথের ঠিক কোন স্তরে এসে শুরু হয়েছিল এই চাঁদ দেখা?

ফ্রান্সের বোর্দো মিউজিয়ামে সংরক্ষিত একটি দেড় ফুট লম্বা চুনাপাথরের মূর্তির কথা বলা যাক। এক অন্তঃসত্ত্বা নারী, যাঁর ডান হাতে উঁচু করে ধরা একফালি চাঁদের মতো দেখতে একটি মহিষের শিং। তাতে কাটা রয়েছে ১৩টি দাগ। বিমূর্ত সেই নারী একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন ‘চাঁদ’-এর দিকে। এখনও পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে এটিই মানুষের চাঁদ-চর্চার প্রাচীনতম সরাসরি প্রমাণ। মূর্তিটির বয়স আনুমানিক ২৬ থেকে ৩৪ হাজার বছরের মধ্যে। অর্থাৎ, মানুষের চাঁদ দেখা ও তাকে নিয়ে চর্চা করার ইতিহাস ৩৪ হাজার বছরের চেয়েও অনেক বেশি প্রাচীন।

আরও পিছিয়ে যাওয়া যাক, প্রায় আড়াই লক্ষ বছর আগে। যূথবদ্ধ মানুষ দুই পায়ে দাঁড়াতে শেখার পর সবে আগুনকে বশ করেছে। বন্যজন্তু বা শীতের ভয় তখন আর নেই। হুড়মুড় করে বাড়ছে জনসংখ্যা। শুধু জঙ্গলে শিকার করে বা কুড়িয়ে পাওয়া খাবারে দলের পেট ভরছে না। বাঁচতে হলে আরও খাবার চাই। এদিকে, কাঁচা মাংসের বদলে আগুনে পোড়ানো খাবার খাওয়ার অভ্যাসে দ্রুত বিকশিত হচ্ছে মানুষের মস্তিষ্ক ও চিন্তাশক্তি।

সেই আদিম মানুষেরা খেয়াল করল, দিনের বেলা মাথার ওপর এক ভয়ংকর উজ্জ্বল বস্তু দূর দিগন্ত থেকে ওঠে এবং অস্ত যায়। কিন্তু তার দিকে তাকানো যায় না। আবার সে অস্ত গেলেই চারদিক অন্ধকারে ঢেকে যায়। এরপর রাতের আকাশে দেখা মেলে অন্য এক সঙ্গীর – সাদা, উজ্জ্বল, শান্ত ও শীতল। ছোট হতে হতে সে একদিন হারিয়ে যায়, আবার ধীরে ধীরে বড় হয়ে সম্পূর্ণ গোলাকার রূপ নেয়। এই চক্রাকার আবর্তন প্রতিবার একেবারে নির্দিষ্ট সময় ধরে চলে, যার সঙ্গে নারীদের শারীরবৃত্তীয় চক্রের অদ্ভুত এক মিল রয়েছে। আর এখান থেকেই মানুষের মধ্যে জন্ম নিল সময় মাপার প্রথম বোধ।

এদিকে, ক্রমশ খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে। মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে শিখল, খাওয়ার পর ফলের বীজ নষ্ট না করে আকাশ থেকে বৃষ্টি নামার ঠিক আগে মাটিতে পুঁতে দিলে অনেক বেশি শস্য পাওয়া যায়। আকাশে সেই সাদা গোলাকার বস্তুটি কয়েকটি নির্দিষ্ট চক্র পার হওয়ার পরই শুরু হয় বৃষ্টিপাত। ‘বর্ষা’ শব্দটি তখন যদিও সুদূর ভবিষ্যতের গর্ভে, তবু সেই জলেই মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে চারাগাছ, বাঁচে প্রাণ। আদিম মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করল, এই সাদা গোলকটির প্রাণ বাঁচানোর অদ্ভুত এক ক্ষমতা রয়েছে। এভাবেই প্রচ্ছন্নভাবে এক সর্বশক্তিমানের ধারণা তৈরি হল, জন্ম নিল ‘প্রোটো গড’ বা আদিম ঈশ্বর।

যেহেতু চাঁদের এই চক্রাকার পুনরাবৃত্তি ছিল একেবারে নিখুঁত, তাই তার হিসাব রাখলেই আগে থেকে বোঝা যেত কখন আকাশ থেকে জল ঝরবে আর কখন বীজ পুঁততে হবে। এই একটি ভাবনাই নীরবে এক বিশাল বিপ্লব ঘটিয়ে দিল। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবার কোনও প্রাণী তার সহজাত প্রবৃত্তির গণ্ডি পেরিয়ে তথ্য ও যুক্তিনির্ভর চিন্তার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে শিখল। আজও অন্যান্য প্রাণীর সিদ্ধান্ত চালিত হয় কেবল তার সহজাত প্রবৃত্তির দ্বারা। একমাত্র মানুষই যুক্তিবোধ ও প্রবৃত্তির মেলবন্ধন ঘটাতে পারে, যার প্রথম পাঠ শুরু হয়েছিল ওই চাঁদকে চেনার মধ্য দিয়ে। তাই বলা যেতেই পারে, বন্যপ্রাণী থেকে আধুনিক মানুষে রূপান্তরিত হওয়ার সিঁড়ির প্রথম ধাপটি চাঁদেরই তৈরি। আর সেই চাঁদকে আরও নিবিড়ভাবে চেনার ও ছোঁয়ার নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা আজও চলছে।

লক্ষ লক্ষ বছর ধরে দূর থেকে চাঁদ দেখার পর, ১৬০৯ সালে গ্যালিলিও গ্যালিলি টেলিস্কোপের সাহায্যে আকাশ পর্যবেক্ষণ করে জানালেন, চাঁদের বুকেও পাহাড় ও সমুদ্র রয়েছে। এর প্রায় ৩০০ বছর পর, গত শতকের গোড়ায় মানুষ চাঁদকে ছুঁয়ে দেখার স্বপ্ন দেখতে শুরু করল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রয়োজনে মিসাইল প্রযুক্তির প্রভূত উন্নতি ঘটেছিল। মাথায় বোমা নিয়ে মিসাইল হাজার হাজার কিলোমিটার উড়ে যেতে পারত। যুদ্ধ শেষে বিজ্ঞানীরা ভাবলেন, এই মিসাইলগুলোর ওড়ার পাল্লা বাড়িয়ে বোমার বদলে যদি বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি জুড়ে দেওয়া যায়, তবে অনায়াসেই চাঁদকে ছোঁয়া সম্ভব। যেই ভাবা সেই কাজ। আমেরিকা ও রাশিয়ার সাতটি ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর, ১৯৫৯ সালের জানুয়ারিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘লুনা-১’ প্রথমবারের মতো চাঁদের কাছাকাছি পৌঁছায়। নয় মাস পর, সেপ্টেম্বরে ‘লুনা-২’ পরিকল্পনামাফিক চাঁদের বুকে আছড়ে পড়ে। মানুষের তৈরি কোনও যন্ত্র প্রথমবার স্পর্শ করে চাঁদের মাটি। এরপর আরও প্রায় ৫০টি অভিযানের পর, ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই মানুষ প্রথম চাঁদের বুকে পা রাখে।

তবে পঞ্চাশের দশকের ১৩টি এবং ষাটের দশকের ৬৩টি অভিযানের পর চাঁদ ছোঁয়ার এই দৌড়ে কিছুটা ভাটা পড়ে। সত্তরের দশকে ২৩টি মিশন হলেও, আশির দশকে তা শূন্যে নেমে আসে। নব্বইয়ের দশকে ৭টি এবং ২০০০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত মাত্র ৮টি অভিযান হয়। এর মধ্যেই ২০০৮ সালের ১৪ নভেম্বর ভারতের প্রথম ও সফল মহাকাশযান ‘চন্দ্রযান-১’ চাঁদের মাটি স্পর্শ করে। পঞ্চম দেশ হিসেবে চাঁদকে ছোঁয়ার গৌরব অর্জন করে ভারত।

সাফল্যের পরিসংখ্যান দেখলে চোখ কপালে উঠবে। আমেরিকার মোট ৫৩টি অভিযানের মধ্যে সাফল্যের হার ৭০ শতাংশ। রাশিয়ার ৪০টি অভিযানের মধ্যে সফল হয়েছে ৪০ শতাংশ। ভারতের ক্ষেত্রে ৩টি মিশনের মধ্যে সাফল্যের হার ৬৭ শতাংশ। তবে এই তালিকায় চিন সবার ওপরে—তাদের ১০টি অভিযানের ১০০ শতাংশই সফল।

২০১০ সালের পর থেকে চন্দ্রাভিযানের গ্রাফ আবার ঊর্ধ্বমুখী। গত দশকে ১০টি অভিযানের পর চলতি দশকে ইতিমধ্যেই ২০টি মিশন সম্পন্ন হয়েছে, পরিকল্পনায় রয়েছে আরও প্রায় ৩০টি। তবে চন্দ্রাভিযানের মূল উদ্দেশ্য এখন আমূল বদলে গেছে। চাঁদ নিজে আর আসল টার্গেট নয়; মঙ্গল গ্রহ সহ গভীর মহাকাশে পাড়ি দেওয়ার ‘লঞ্চপ্যাড’ বা বেস-ক্যাম্প হিসেবে চাঁদকে ব্যবহার করা যায় কি না, সেটাই এখন বিজ্ঞানীদের মূল লক্ষ্য।

যে কোনও মহাকাশযাত্রার সিংহভাগ খরচ হয় মহাকাশযানকে পৃথিবীর অভিকর্ষ বল ও বায়ুমণ্ডলের বাধা পেরিয়ে প্রথম ২০০ কিলোমিটার ওপরে নিয়ে যেতে। বর্তমানে পৃথিবী থেকে ১ কেজি ওজন মহাকাশে পাঠাতে খরচ হয় প্রায় ২০ লক্ষ টাকা। অথচ চাঁদের অভিকর্ষ পৃথিবীর ছয় ভাগের এক ভাগ এবং সেখানে বায়ুমণ্ডলের বাধাও নেই। ফলে চাঁদ থেকে ১ কেজি ওজন মহাকাশে পাঠানোর খরচ নেমে আসবে মাত্র ১ লক্ষ টাকায়। তবে মহাকাশযান পাঠানোর প্রস্তুতি হিসেবে চাঁদের বুকে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের প্রয়োজন। আর তার জন্য অপরিহার্য হল জল, বিদ্যুৎ ও অক্সিজেন। বর্তমান চন্দ্রাভিযানগুলোর মূল উদ্দেশ্যই হল এই জল ও জ্বালানির সন্ধান।

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, চাঁদের মাটিকে বিশেষ রিঅ্যাক্টরে সূর্যের আলো দিয়ে উত্তপ্ত করলে লুকিয়ে থাকা জল বাষ্প হয়ে বেরিয়ে আসবে। সেই জলকে ভেঙে মিলবে অক্সিজেন। চাঁদের মাটিতে প্রচুর লোহা, টাইটানিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম মজুত রয়েছে। এগুলো জল ও কার্বন ডাইঅক্সাইডের সঙ্গে বিক্রিয়া ঘটিয়ে মিথেন গ্যাস তৈরি করতে পারে, যা রকেটের নিখুঁত জ্বালানি। খেয়াল করলে দেখা যাবে, ভারতের চন্দ্রযান-৩ সহ সাম্প্রতিক প্রায় প্রতিটি অভিযানের লক্ষ্য চাঁদের দক্ষিণ মেরু। কারণ এখানেই সবচেয়ে বেশি জল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি চাঁদের মাটির গভীরে ফাটল থেকে পর্যাপ্ত উত্তাপ বা জিওথার্মাল এনার্জি পাওয়ার আশাও প্রবল।

এই নতুন প্রজন্মের চাঁদ-চর্চায় সরকারি সংস্থার পাশাপাশি গুগল, স্পেসএক্স, মুন-এক্সপ্রেস বা লাক্সস্পেসের মতো বেসরকারি সংস্থাও জোরকদমে এগিয়ে এসেছে। তবে অতীতের সেই প্রতিযোগিতার বদলে এখন মহাকাশ গবেষণায় সহযোগিতার বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। রাশিয়া ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা করছে, যার মাধ্যমে তারা চাঁদ থেকে মঙ্গল অভিযানের নানা দিক খতিয়ে দেখবে। একই সময়ে আমেরিকাও মঙ্গলে মানুষ পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আমেরিকা ও রাশিয়া ছাড়াও ভারত, চিন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থাও একাধিক যুগান্তকারী মিশনের রূপরেখা তৈরি করেছে। নাসার ‘আর্টেমিস’ মিশন ফের চাঁদে মানুষ নিয়ে যাবে এবং সেখানে তৈরি হবে ‘আর্টেমিস বেস ক্যাম্প’। চিনের ‘চাং’ই মিশন দক্ষিণ মেরুর মাটি ওখানেই পরীক্ষা করবে; বস্তুত চাঁদের মাটি থেকে জ্বালানি তৈরির প্রযুক্তিতে চিন ইতিমধ্যেই অনেকটা এগিয়েছে। অন্যদিকে, ভারতের ‘চন্দ্রযান-৪’ এবং ‘৫’ এবং জাপানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ ‘লুপেক্স’  মিশন চাঁদের মাটি পরীক্ষা ও জলের সন্ধানে পৃথিবীতে মাটি নিয়ে আসার কাজ করবে।

সব মিলিয়ে, আদিম মানুষের প্রথম চাঁদ দেখার সেই মুহূর্ত থেকে শুরু করে লক্ষ বছরের পথ পেরিয়ে চার লক্ষ কিলোমিটার দূরের চাঁদ যেন আজ সত্যিই আমাদের ‘টিপ দেওয়ার’ দূরত্বে এসে পৌঁছেছে। এই অভাবনীয় বৈজ্ঞানিক সাফল্যের যুগে দাঁড়িয়ে, কপালে চাঁদের টিপ পরিয়ে দেওয়া সেই মায়ের অভাবটা বড্ড নিবিড়ভাবে নাড়া দেয়।

বাঙালির সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এক আবহমান চরিত্র

মনিমা মজুমদার

আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা / চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা।- এই ছড়াটি শুনে বড় হয়নি এমন বাঙালি শিশু খুঁজে পাওয়া ভার! একটি উপগ্রহের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে তোলাও বুঝি শুধুমাত্র বাঙালির পক্ষেই সম্ভব! এই ছোট্ট ছড়া শুধু একটি ছন্দময় বাক্য নয়, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে বাঙালি পরিবারের স্নেহ, শিশুর কল্পনা এবং লোকসংস্কৃতির সহজ সরল সৌন্দর্য। আকাশে ওঠা এক টুকরো রুপোলি গোলক- চাঁদ। পৃথিবীর বহু সংস্কৃতিতেই চাঁদ মানুষের কল্পনা, আবেগ ও শিল্পকে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু বাঙালির সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে চাঁদের উপস্থিতি যেন বিশেষভাবে গভীর ও অন্তরঙ্গ। গ্রামবাংলার নির্জন রাত, নদীর জলে চাঁদের আলো, প্রেমিকের অপেক্ষা, শিশুর ঘুমপাড়ানি গান- সবখানেই চাঁদ এক অনিবার্য প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাই বাংলা কবিতা, গান, গল্প এবং লোকসংস্কৃতির ভেতর দিয়ে চাঁদ বারবার ফিরে আসে।

বাংলা সাহিত্যে চাঁদ মূলত ব্যবহৃত হয়েছে প্রেম ও সৌন্দর্যের প্রতিরূপ হিসেবে। কে লেখেননি বলুন তো চাঁদ নিয়ে! ‘চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে, উছলে পড়ে আলো’- রবি ঠাকুরের লেখা এই গান বাঙালির অনুভূতির একটি অংশ। এই গানে চাঁদের আলোকে যে উচ্ছ্বাস ও আনন্দের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে, তা আমাদের মনোজগতের সঙ্গে খুব সহজেই মিলে যায়। শিশুদের জন্য লেখা একাধিক ছড়া ও গানের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ চাঁদের উল্লেখ করেছেন। শিশুর কল্পনার জগতে চাঁদ একটি আপন সঙ্গী। তাই তাঁর শিশুকবিতাতেও চাঁদের আলো, আকাশ এবং রাতের সৌন্দর্য সহজ ও মধুর ভাষায় ফুটে উঠেছে।

বাংলা সাহিত্যে যদি কোনও জিনিসের জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতা হয়, তাহলে মনে হয় চাঁদ খুব সহজেই প্রথম দিকের স্থানটি দখল করে নেবে। নদী, বৃষ্টি, কাশফুল- এসবের সঙ্গে সঙ্গে চাঁদও যেন বাংলা কবিতা ও গানের এক স্থায়ী চরিত্র। কখনও সে প্রেমিকা, কখনও কবির সঙ্গী, আবার কখনও শিশুর ‘মামা’ হয়ে হাজির হয়। কাজী নজরুল ইসলামের একটি কাব্যগ্রন্থ- ‘নতুন চাঁদ’। শিরোনামের সঙ্গে গ্রন্থের মধ্যে ঘুরেফিরে বারবার এসেছে চাঁদের প্রসঙ্গ। নজরুলের গানে পাই, ‘চাঁদ হেরিছে চাঁদমুখ তার সরসীর আরশিতে’। বিদ্রোহী কবির চেয়েও তিনি যে অনেক বেশি প্রেমিক কবি তার প্রমাণ এই চাঁদই দিয়েছে।

‘যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ / মরিবার হলো তার সাধ’- জীবনানন্দের ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার এই শব্দমালার সঙ্গে কবিতাপ্রেমী প্রত্যেক বাঙালি পরিচিত। জীবনানন্দের কবিতায় চাঁদ শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এটি রহস্য, নিঃসঙ্গতা, মৃত্যুচেতনা এবং স্বপ্নময়তার এক নীরব চিহ্ন হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় চাঁদ যেখানে উজ্জ্বল, আনন্দময় এবং সুরেলা, সেখানে জীবনানন্দের কবিতায় চাঁদ অনেক বেশি নিস্তব্ধ ও ধ্যানমগ্ন। তাঁর কবিতার জগৎ প্রায়ই গোধূলি, রাত কিংবা আধো অন্ধকারে ভরা। সেখানে চাঁদ কখনও মৃদু আলো ছড়িয়ে দেয়, আবার কখনও এক ধরনের বিষণ্ণ সৌন্দর্য সৃষ্টি করে। আর সেই সৌন্দর্য আমাদের আয়ু বাড়িয়ে দেয়।

চাঁদের রোমান্টিক আদলকে ভেঙে দিয়েছেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। ‘হে মহাজীবন’-এ তিনি এঁকেছেন চাঁদ নিয়ে চিরকালের সেই বিখ্যাত, বিপরীত চিত্র। ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় / পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’- সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে পূর্ণিমার চাঁদ ক্ষুধার তীব্রতাকে তুলে ধরেছে। দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলার বুকে বসে কবির কলমে চাঁদ নিয়ে কোনও প্রেম আসেনি। কাব্যিক স্নিগ্ধতা বর্জন করে কবি কঠিন বাস্তব নিয়ে এসেছেন।

বাংলা সাহিত্যে ব্যস্ততম উপাদান মনে হয় চাঁদ! বিভিন্ন ভূমিকা তাকে পালন করতে হচ্ছে! আনন্দ কিংবা দুঃখ, দুইয়ের প্রকাশেই তিনি আছেন স্বমহিমায়। এমনকি ছোট্ট ছেলেটির ‘মামা’ পর্যন্ত হতে হয় তাকে! এত দায়িত্ব বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আর কোনও গ্রহনক্ষত্রের কপালে পড়েছে কি না সন্দেহ আছে! আসলে চাঁদের উপমা চাঁদ নিজেই। ‘এই মোম জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে এসো না গল্প করি’- গীতিকবি গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখায়, আরতি মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে গাওয়া এই গান বাঙালির রোমান্টিক ভাবনার এক আদর্শ উদাহরণ। রাঘব চট্টোপাধ্যায় গেয়েছেন- ‘চাঁদ কেন আসে না আমার ঘরে’। গানটির মূল অনুভূতি অপেক্ষার। চাঁদ নিজেই এখানে প্রিয়জনের ছায়া। এক বিষণ্ণ রোমান্টিকতার ছোঁয়া সমস্তটা জুড়ে। কিশোর কুমারের কণ্ঠে ‘আজ মিলন তিথির পূর্ণিমা চাঁদ’ অথবা রূপঙ্কর বাগচীর ‘ও চাঁদ তোর বান্ধবীদের সঙ্গে যাব’- চাঁদ নিয়ে এই শব্দখেলার তালিকা অনেক লম্বা। চাঁদের প্রতি এক অমোঘ আকর্ষণ সবার। অনেক দূরের যে জিনিস আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে, অথচ তার জ্যোৎস্না এই পৃথিবীর বুক ছুঁয়ে এক মায়াময় পরিবেশের জন্ম দিচ্ছে! যে কোনও সৃষ্টিশীল মানুষ খুব সহজেই এর মোহে পড়ে যায়। তাই তো কবিতা বলুন, অথবা গান কিংবা কোনো সিনেমার রোমাঞ্চকর দৃশ্য- চাঁদ চলে আসে নিয়ত। ‘পৃথিবী আমারে চায়’ সিনেমার ‘নিশিরাত বাঁকা চাঁদ’ গানে সাদাকালো পর্দায় আলো আঁধার এক অপূর্ব দৃশ্যায়নের জন্ম দিয়েছে। ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ গানের শেষ মুহূর্তে ছোট চাঁদ দৃশ্যটিকে পূর্ণতা দান করে আর আমরা মায়ের আঁচলের মতো নরম হয়ে আসি। বাংলা সিনেমায় এইরকম অসংখ্য মণিমুক্তোর মতো দৃশ্য ছড়িয়ে আছে।

আমরা যদি উপন্যাসের কথা বিবেচনায় আনি চাঁদ সেখানেও নিজেই একটি চরিত্র। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চাঁদের পাহাড়’ কিংবা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘চাঁদের অমাবস্যা’- নামকরণেই আলোকিত। বিভূতিভূষণের আরেকটি উপন্যাস ‘আরণ্যক’-এ চাঁদ, পূর্ণিমা এবং জ্যোৎস্না অরণ্যের সঙ্গে মিশে কখনও অপার সৌন্দর্য কখনও বা ভয়ের সঞ্চার করেছে। এই বহুমাত্রিকতা চাঁদকে করেছে অতুলনীয়। জ্যোৎস্না এক ধরনের শূন্যতা এবং বেদনার আবহ সৃষ্টি করে৷ সৃজনশীল শিল্পমাধ্যমে যার প্রভাব অনেক। তাই তো তুলিতেও চাঁদ করেছে জাদু। ভোলানাথ রুদ্রর ‘পেনসিভ মুন’-এর কথা আমরা ভাবতেই পারি! চাঁদের বিভিন্ন রূপ এবং জঙ্গলের রহস্যময় পরিবেশ ফুটে উঠেছে ক্যানভাসে। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের আড়ালে মানুষের কার্যকলাপের অসংগতি ছবির মূল বিষয়। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্যতম একটি শিল্পকর্ম হল- ‘অ্যা মুনলাইট মিউজিক পার্টি’। আনুমানিক ১৯০৩ সালে আঁকা এই ছবিতে শিল্পী চাঁদনি রাতের মাদকতা ও শান্ত পরিবেশ তুলে ধরেছেন।

উত্তরবঙ্গের নিজস্ব ভাওয়াইয়া ও ভাটিয়ালিতে চাঁদ এসেছে প্রকৃতির সঙ্গে। নদীর বুকে মাঝির একাকিত্বের সঙ্গী হয় একমাত্র চাঁদ। তাই গানের ভাষাতে খুব পরিচিত ও প্রিয় শব্দটি বারেবারে ফিরে আসে। ‘নাও ছাড়িয়া দে’ লোকসংগীতের আঞ্চলিক সংস্করণে পাই ‘চাঁদের আলোয় নাও ভাসাই’। এরকম অজস্র গুরুত্বপূর্ণ চিত্রকল্প লোকসংগীতের আবেগময় জগতে ছড়িয়ে আছে। লোকসমাজের দৈনন্দিন জীবন, আবেগ, প্রেম, বিশ্বাস এবং কল্পনার জগতে চাঁদ এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। তাই তো শুধু লোকসংগীত নয়, রূপকথার গল্পেও চাঁদ থাকে এক রহস্যময় ও জাদুকরী উপাদান হিসেবে। ‘চাঁদের দেশে যাওয়া’ বা ‘চাঁদের বুড়ির চরকা কাটা’ শিশুর কল্পনার জগৎকে বিস্তৃত করে।

এইসব উদাহরণ যেন এক সমুদ্র জল থেকে কয়েক ফোঁটা তুলে নেওয়া। বাংলা সাহিত্যে চাঁদের বহুমাত্রিক উপস্থিতি- প্রেম, সৌন্দর্য, বিরহ, আধ্যাত্মিকতা এবং প্রকৃতির সৌন্দর্যের সঙ্গে সংযুক্ত। সাহিত্যিক ও গীতিকারের কল্পনা এবং মানুষের আবেগকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে চাঁদ বাংলা সাহিত্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। চাঁদ শুধু আকাশের বস্তু নয়, বরং মানুষের অনুভূতি, চিন্তা এবং কল্পনার সঙ্গে গভীরভাবে মিশে থাকা সাংস্কৃতিক প্রতীক।

‘বাঁশ বাগানের মাথার উপর / চাঁদ উঠেছে ওই / মাগো আমার শোলক বলা / কাজলা দিদি কই?’- যতীন্দ্রমোহন বাগচীর এই পংক্তিগুলো তো আবহমান বঙ্গজীবনের এক নিবিড় অনুষঙ্গ। চাঁদ এত নিঃসঙ্গ বুঝি আর কোথাও নেই! আকাশের চাঁদ দেখে হারিয়ে যাওয়া দিদির কথা মনে পড়ছে এক শিশুর! আমরাও তো সেই অনুভূতিতে ভেসে চলেছি এক নিরন্তর বিষণ্ণতায়। এভাবেই চাঁদ বহুমাত্রিকতায় জড়িয়ে থাক আমাদের এ জীবনজুড়ে, আমরা বরং কিঞ্চিৎ ‘লুনাটিক’ হয়েই কাটিয়ে যাই বাকি জীবন।

মায়াবী আলোয় বোনা অনন্ত প্রেমের উপাখ্যান

সৌগত ভট্টাচার্য

সন্ধ্যায় হলদিবাড়ি-এনজেপি প্যাসেঞ্জার এসে দাঁড়ায় মণ্ডলঘাট স্টেশনে। ট্রেনের চৌকো জানলার বাইরে একটা আস্ত চাঁদ এসেছে বেলাকোবা স্টেশন থেকে। ট্রেন চললে চাঁদও চলে, ট্রেন থামলে চাঁদটা থামে— এ তো এক আদিম বিস্ময়! এই ট্রেনের যাত্রাপথের প্রতি স্টেশনে চাঁদ অপেক্ষা করে ট্রেন ছাড়ার… এবার মণ্ডলঘাট স্টেশনে এসে চাঁদটি দাঁড়িয়ে পড়েছে। চারজনের একটা চড়কের দল ট্রেন থেকে নেমে রওনা দেয় তিস্তার চরের দিকে। বাঁধের ওপর কিছুটা হাঁটা পথ, তারপর চর শুরু। দলটি পা চালিয়ে হাঁটছে চরের বালির ওপর দিয়ে। যতদূর চোখ যায় শুধুই চর দেখা যায়। সাদা বালির ওপর চাঁদের আলো পড়লে চরকে সমুদ্রের মতো লাগে। যদিও এই চড়ক দলের কেউ কখনও সমুদ্র দেখেনি। বেলাকোবা থেকে ওদের সঙ্গে আসা চাঁদের আলো ও তিস্তা নদীর চরাচর মিলে চড়ক দলের লোকরা না দেখা সমুদ্রের কল্পনা করে। বর্ষায় নদীর জলে ভেসে আসা কাঠের গুঁড়ি পড়ে থাকে সাদা বালির চরের বুকে। চাঁদ তার আলো থেকে কাঠের গুঁড়িটিকে বঞ্চিত করেনি। চরের বালিতে চড়ক দলের চারজনের একটা টলমল ছায়া হাঁটে। অনেক দূর থেকে নদীপাড়ের মাদার গাছটাকে দেখা যায়। পূর্ণিমার রাতে গাছের পিছন দিয়ে গোল চাঁদ উঠলে গাছের ডালপালাগুলো চাঁদের গায়ে রাস্তা বলে মনে হয়। গাছটির সামনে নদী। নদীর জলে চাঁদের ছায়া পড়ে। গাছের গোড়া থেকে চারজনই বাড়ি ফেরার আলাদা আলাদা পথ নেবে। মানুষ একলা হলে চাঁদ তার পথচলার সঙ্গী হয়!

সেটাও ফাল্গুন মাসের কথা। আজ থেকে চাঁদের বয়স তখন দেড়শো বছরের মতো কম। গোটা দুনিয়া তখনও উজ্জ্বল নিয়ন আলোর দখলে চলে যায়নি। রাতের পৃথিবীর আলো-আঁধারির নিয়ন্ত্রণ ছিল চাঁদের হাতেই। তেমনই এক সময়কার জলপাইগুড়ি রাজবাড়ির গল্প এটা— বৈকুণ্ঠনাথ ছিলেন জলপাইগুড়ির রাজবাড়ির গৃহদেবতা। রীতি অনুযায়ী দোলযাত্রার দিন বৈকুণ্ঠনাথের মূর্তি রাজবাড়ি থেকে বের করে হাতির পিঠে চাপিয়ে স্নান করানোর জন্য নিয়ে যাওয়া হত পূর্বদিকের দিঘিতে। বৈকুণ্ঠনাথের এই স্নানযাত্রাকে ঘিরে চলত উৎসব। বাদ্য বাজত, আবির খেলা হত, দিঘির চারপাশে মেলা বসত, যে মেলার নাম ছিল সোয়ারিমেলা। এদিকে রাজবাড়ির আদেশ ছিল, দোলযাত্রার দিন বৈকুণ্ঠপুর এস্টেটের প্রজারা যেন তাঁদের গৃহদেবতাকেও বৈকুণ্ঠনাথের স্নানযাত্রা উৎসবে শামিল করেন। সুতরাং রাজ-আদেশ মেনে প্রজারা যাঁর যাঁর গৃহদেবতাকে মাথায় চাপিয়ে হেঁটে বা গোরুর গাড়িতে নিয়ে আসতেন জলপাইগুড়ি রাজবাড়ির দিঘির পাড়ে। ছোট ছোট ছাউনি বানিয়ে তাঁদের গৃহদেবতার মূর্তি সাজিয়ে রাখেন পুকুর পাড়ে। নিয়নহীন সন্ধ্যার আকাশে দোলপূর্ণিমার চাঁদ উঠলে, দিঘির কালো জলে তার ছায়া পড়ে… সেই সময় চাঁদের আলোয় রাজার দেবতার সঙ্গে গৃহস্থের দেবতার দেখাসাক্ষাৎ হত।

চাঁদের বয়স বাড়ে। এখন আর বৈকুণ্ঠনাথের স্নানযাত্রা হয় না। কিন্তু সেই কোন কাল থেকে রং খেলায় মানুষ মাতোয়ারা হয়! রং খেলা শেষে নিস্তব্ধ শহরে সন্ধ্যার আকাশে বিরাট এক চাঁদ তার উপস্থিতি জানান দেয়। বিজন একটি শহর চিত হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে শুয়ে থাকে, অলিতে গলিতে তখন জ্যোৎস্নাকে নেশাধরা, মায়া জড়ানো লাগে। রং খেলার চিহ্ন হয়ে রং মাখা ছেঁড়া জামাকাপড় তখনও ঝুলে থাকে পাড়ার মোড়ের ইলেক্ট্রিকের তারে। রং-লাগা ছেঁড়া জামাকাপড়ের গায়ে জ্যোৎস্না লাগে এই শহরে…

ছেঁড়া জামাকাপড়ের পাট চুকলে নতুন জামাকাপড়ের গন্ধে ভরে যায় পয়লা বৈশাখের বাজার। নবাববাড়ির ছাদের ওপর রমজান মাসের চাঁদ ওঠে। প্রতিরাতে চাঁদের আকার একটু একটু করে বদলে যায়। নবাববাড়ির প্রকাণ্ড লোহার গেটের পাশের দোকানের বৃদ্ধ দর্জি রোজা রাখেন। অর্ডারি পাঞ্জাবির গায়ে হুবহু চাঁদের প্রতিকৃতি চিকনের কাজে ফুটিয়ে তোলেন বৃদ্ধ।

হিজরি ক্যালেন্ডার চান্দ্র মাস অনুযায়ী চলে। বৈশাখ মাসের বেলায় সেরকম হয় না। বৃদ্ধ শুধু দিনের আকাশ আর রাতের আকাশ রংয়ের পাঞ্জাবির কাপড় কেটে সেলাই করতে থাকেন। সন্ধ্যা নামলে চিকন কাজের পাঞ্জাবির থেকে মুখ তুলে আকাশের চাঁদের দিকে তাকান, তাঁর ইফতার করার কথা মনে হয়। দেশের বাড়ির আকাশে তখন এই চাঁদটিই দেখা যায়… সেই বৃদ্ধ দর্জির পাঞ্জাবি সেলাইয়ের একটি সুতো যদি সৌর মাস হয়, আরেকটি অবশ্যই চান্দ্র মাস। একটি সুতোর নাম যদি রমজান মাস শেষে ইদ হয়, অন্য সুতোটি অবশ্যই ফাল্গুন পূর্ণিমার দোলযাত্রা!

তখন চেনা চাঁদ আকাশে দেওয়াল ক্যালেন্ডার হয়ে ঝুলে থাকে…

যেমন তিস্তা ব্রিজের ল্যাম্পপোস্টের নীচে কোজাগরি চাঁদ ঝুলে থাকে। কী রকম সেটা! দিন শেষে সন্ধ্যায় চাঁদ যখন আকাশে দেখা দেবে বলে ঠিক করে। ল্যাম্পপোস্টের ঠিক তলায় এসে চাঁদ একটু সময়ের জন্য যেন থেমে যায়। ব্রিজের অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে মনে হয় ইলেক্ট্রিক সভ্যতার সাদা এলইডি আলোর সারি সারি ল্যাম্পপোস্টের শেষ ল্যাম্পপোস্টটা যেন একটু আলাদা। সেখানে এলইডি আলোর বদলে কোজাগরি পূর্ণিমা চাঁদ ল্যাম্পপোস্ট থেকে ঝুলে আছে। এই চাঁদই আবার গৃহস্থের লেপাপোছা উঠোনে চালের গুঁড়ো দিয়ে আঁকা লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ আর রাত জাগা প্যাঁচার আলপনার গায়ে নরম আলো ফেলে… সেই দৃশ্য এই বাংলা যুগ যুগ ধরে বিস্ময় নয়নে দেখে…

একটা সময় ছিল যখন একেকটা সন্ধ্যা স্মৃতির মফসসল শহরে ম্যাজিক শো-এর স্টেজ হয়ে উঠত। লোডশেডিং হলে চাঁদ নেমে আসত পাড়ায় পাড়ায়। ঘণ্টাখানেকের জন্য চলত মায়াবী হলদে রংয়ের ইন্দ্রজাল। কারেন্ট চলে এলে যেন ম্যাজিক শোয়ের শেষে অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে কেউ আলো জ্বালিয়ে দেয়। চাঁদের ম্যাজিকের টান জোয়ার-ভাটার মতোই তীব্র। চাঁদ আর মানুষ কেউ কারও সঙ্গ ছাড়ল না— এই পারস্পরিক টান— আদিম, ম্যাজিকের মতোই মায়াসুতোয় বাঁধা।

পুরোনো দিল্লির নিজামুদ্দিনের দরগায় যাওয়ার সরু গলিপথের পাশে ফুল চাদর আতরের দোকান। সন্ধ্যা নামলে রবি, বৃহস্পতিবার কাওয়ালির আসর বসে মার্বেল-পাতা দরগার উঠোনে। একটা সস্তা হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করেন এক মলিন বেশ প্রৌঢ়, তাঁকে সংগত দেন তাঁরই মতো আরও কয়েকজন। ঘিঞ্জি পুরোনো দিল্লির দরগার গলিতে তখন চাঁদ দেখা দিয়েই বেমালুম বেপাত্তা। বছর গড়ালে নিজামুদ্দিনের মৃত্যুর দিনে উরসমেলা বসে এই দরগায়। যেখানে কাওয়ালি গাওয়া হয় রাতভর, সঙ্গে থাকে একটা পূর্ণ চাঁদনি রাত, আর বাতাসের গায়ে আতরের গন্ধ!

রাসপূর্ণিমার দিনকয়েক আগে যখন চাঁদটা একটু একটু করে গোল হতে শুরু করে, পাশের পাড়ায় কীর্তনের আসর বসে। এই কীর্তন আর কাওয়ালির সুর ভেসে বেড়ায়, চাঁদকে খুঁজে বেড়ায় যুগ-যুগান্তর ধরে। অষ্টপ্রহরের কীর্তন গ্রাম থেকে নগরবাসীর জীবনে রাসপূর্ণিমা নিয়ে আসে। কীর্তনের আসর থেকে মধ্যরাতের লীলায় হঠাৎ বাঁশির সুর ভেসে আসে… শ্রীচৈতন্য বাংলার আকাশে চাঁদ হয়ে ওঠেন!

সেই শেষ প্যাসেঞ্জার ট্রেনের জানলায় লেগে থাকা চাঁদ নির্জন তিস্তার দিগন্তছোঁয়া চর থেকে পুরোনো দিল্লির ঘিঞ্জি রাজপথে এসে পৌঁছায়। এ যেন সময়াতীত এক রাতের যাত্রাপথ। অন্ধকার যাত্রাপথ পেরোতে পেরোতে চাঁদ ভারতবর্ষের বুকে অকাতরে আলো বিলিয়ে যায়…

সেই আলোরই আরেক নাম কি প্রেম?

The publish …শশী হে! appeared first on Uttarbanga Sambad.



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *