আবীর লাল মণ্ডল
১
ফাল্গুনের শেষ সপ্তাহ। বাতাসে বসন্তের হালকা রং আছে বটে, কিন্তু তাতে ফুলের উচ্ছ্বাস একটুও নেই। ছঘরিয়ার দক্ষিণপাড়ায় বিকেলের রোদ পড়ে আছে ধুলোর ওপর। নীরবে মরহুম আবদুল শেখের বাড়ির ভেতর বসে আছে তাঁর ছেলের বৌ, নাফিসন। প্রায় এক বছর হল এ বাড়িতে তার বিয়ে হয়েছে। সোনাতলার আদু মণ্ডলের বড় মেয়ে সে। বাবা দিনমজুর। ভোরে বেরোয়, সন্ধ্যায় ফেরে; কাঁধে মাটি, কপালে ঘাম, হাতে মজুরি। তারা তিন বোন, এক ভাই। ঘরে অভাবের বাতাস। মেয়েরা বড় হতে হতেই বুঝে যায়- তারা সবাই সংসারের বোঝা।
নাফিসনের তাই পনেরো বছরের বড় ছেলের সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব এলে বাবা-মা সাতপাঁচ ভাবেননি। বিয়েতে এক লক্ষ নগদ, মোটর সাইকেল, খাট, আলমারি, ড্রেসিং টেবিল- কত কিছু দাবি করা হল! নাফিসন জানত, এত কিছু হুট করে জোগাড় করা তার বাবার পক্ষে কতটা অসম্ভব ছিল। তবু বিয়ের দিন সে দেখেছিল বাবার চোখে নদী শুকিয়ে গেলেও তলায় একটু জল থাকে সেই রকম দৃঢ়তা। আত্মীয়স্বজনের কাছে মাথা নত করে, সুদে টাকা ধার কোনও রকমে আশি হাজার টাকা আর আসবাব জোগাড় হয়েছিল। বাকি কুড়ি হাজার টাকার ওজন এখনও নাফিসনের বুকের ওপর চাপা পড়ে আছে।
বিয়ের পর নাফিসনের জীবনে শুরু হল অন্য লড়াই। ভেবেছিল, বাবার বাড়ির অভাবের পর শ্বশুরবাড়িতে একটু নিশ্চিন্তে শ্বাস নেবে, হাত-পা ছড়িয়ে বসবে। কিন্তু বাস্তবে তা হল না। শাশুড়ির কথার খোঁচা প্রতিদিনের ভাতের মতো নিয়মিত। তরকারিতে নুন বেশি হলে, ভাত একটু নরম হলে কিংবা কাজে সামান্য দেরি হলে-
মুখপুড়ি! ভিখিরির ঘরের মেয়ে! বাপ-মা কাজ শেখায় নাই নাকি?
শব্দগুলো ছুরি না হলেও, কিন্তু প্রতিদিনের ছোট-ছোট খোঁচায় অদৃশ্য, নিঃশব্দ রক্ত ঝরায়। নাফিসন জবাব দেয় না। এতদিনে সে বুঝে গেছে কথা বললেই অশান্তি বাড়বে। আর সে কথা যদি খোদনের কানে পৌঁছায়, তবে মার একটাও মাটিতে পড়বে না, সবই পড়বে তার পিঠে।
খোদন নাফিসনের স্বামী। লোকের জমিতে লাঙল দেয়। দুটো গোরু আছে। নাফিসন মাঝে মাঝে মাঠে যায়, কাস্তে দিয়ে ঘাস কাটে, মাথায় করে নিয়ে আসে। বিয়ের মাস ঘুরতেই শাশুড়ির কণ্ঠে আরেক সুর, ‘ওরে আদুরী, তোর বাপ কইছিল বাকি টাকা দিবে। কবে দিবে? আমি মরলে দিবে নাকি? ক’দিন পর আমার খোদনের ছেলে হবে। নাতির মুখ দেখব। টাকা লাগবে না?’
এই ‘নাতির মুখ’ কথাটার ভেতরে কত প্রত্যাশা, কত চাপ! নাফিসন চুপ করে থাকে। তার শরীর কি সংসারের জমি? যেখানে ফসল ফলবে কি না, তা নিয়ে সবার ভাবনা।
একদিন পাড়ার কলে জল আনতে গিয়ে সে শুনেছিল দুই বৌ ফিশফিশ করছে ঃ খোদনের তো সমস্যা আছে। আগের বৌয়ের ছেলেপুলে হয় নাই। শেষে গলায় দড়ি দিয়া মরল।
কথাগুলো বাতাসে ভেসে এসে নাফিসনের কানে বিঁধেছিল। আগে শুনেছিল খোদনের আগের স্ত্রী মারা গেছে, কিন্তু কারণ জানত না।
সন্ধে নেমেছে ধীরে ধীরে, মনে হচ্ছে আকাশের রং বদলে যাওয়ার ভেতর দিয়ে এক অদৃশ্য দীর্ঘশ্বাস ভেসে উঠছে, আর সেই দীর্ঘশ্বাসে গ্রামজীবনের ক্লান্তি মিশে আছে নিবিড়ভাবে। বাড়ির দাওয়ায় বসে বিড়ি ফুঁকছে খোদন, তার মুখের সামনে ধোঁয়ার সরু রেখা মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে। তার মাথার ভেতর সংসারের চিন্তা, ভাতের চিন্তা, অস্তিত্ব রক্ষার চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।
খোদন হালচাষি। চাষবাস তার গর্ব। কিন্তু সেই গর্বে এখন ফাটল ধরেছে। মাঠের পর মাঠ দখল করে নিয়েছে যন্ত্রদানব- ট্র্যাক্টর। এক ঘণ্টায় বিঘের পর বিঘে জমি চষে ফেলছে, আর মানুষের ঘামের মূল্যকে ঠেলে দিচ্ছে প্রান্তিকতায়। কিছু মানুষ পুরোনো বিশ্বাস আঁকড়ে লাঙলেই চাষ করছে, কিন্তু আর কতদিন?
ধান-পাট বয়ে আনার কাজটুকুও আর নেই, ট্র্যাক্টরের ট্রলিতে অল্প সময়ে দ্বিগুণ বোঝা পৌঁছে যাচ্ছে, সেখানে সে বাঁশের গাড়ি নিয়ে কীভাবে লড়াই চালিয়ে যাবে?
অনেক ভাবনাচিন্তার পর খোদন সিদ্ধান্ত নিল, গোরু দুটো বিক্রি করে দেবে। কারণ সভ্যতার কালচক্রে বেঁচে থাকার তাগিদে মানুষকে বদলাতে হয়, নয়তো অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে হয়।
খোদন ভাবল, সে একটা টোটো কিনবে। কিন্তু সেই স্বপ্নের দাম প্রায় লক্ষ টাকার কাছাকাছি। গোরু বিক্রি করে হয়তো পঞ্চাশ হাজার পাওয়া যাবে, কিন্তু বাকি টাকা কোথা থেকে আসবে, এই প্রশ্ন খোদনকে গ্রাস করে আছে গভীরভাবে।
ঠিক তখন নাফিসন এসে দাঁড়াল তার পাশে। সন্ধ্যার ম্লান আলোয় নাফিসনের মুখেও চিন্তার ছায়া স্পষ্ট।
এক অজানা আশঙ্কা সত্ত্বেও মমতামাখা কণ্ঠে সে ধীরে বলে, ‘কী গো, কী আকাশপাতাল ভাবছ, বলো দিনি?’
খোদন তাকায়, কোনও উত্তর দেয় না। বিড়িটা শেষ করে পায়ের নীচে আগুন নিভিয়ে সে বলে ওঠে, ‘ভাবছি একটা টোটো কিনব, কিন্তু…’
কথা শেষ হওয়ার আগেই নাফিসন বলে ওঠে, ‘টোটো কেন? চাষ করবা না আর?’
খোদন বিরক্ত হয়ে বলে, ‘কথা তো শেষ করতি দে, মুখে-মুখে অত কথা ধরিস কেন?’ সে বলে চলে, ‘ট্র্যাক্টরে মাঠ ছেয়ে গেছে, জমি চষে আর কাজ নেই।’
‘কিন্তু অত টাকা পাবা কই?’ নাফিসনের গলা ভারী হয়ে আসে।
হঠাৎ খোদন নাফিসনের দিকে তাকায়, অবলীলায় ঝাঁঝিয়ে ওঠে, ‘তোর বাপের কাছে কুড়ি হাজার টাকা পেতাম, সেইডা কবে দিবে রে?’
নাফিসন কেঁপে ওঠে। এই টাকার কথা সে জানে, সাথে ভালো করেই জানে এই টাকা আর কখনও আসবে না।
সে আমতা-আমতা করে বলে, ‘না মানে…’
খোদন গর্জে ওঠে, ‘মানে আবার কী? টাকা পাই, টাকা এনে দিবি।’
নাফিসন শেষমেশ বলে ওঠে, ‘ও টাকা আমি আনতে পারব নে।’
জীবিকার সংকটে দিশেহারা খোদন এই ‘না’ শব্দে পৌরুষে আঘাত অনুভব করল। আর সেই আঘাত তাকে অন্ধ করে দিল। খোদন নাফিসনের চুলের মুঠি ধরে টেনে বলে, ‘টাকা যখন আনতে পারবি নে, তোর মতো বাজা মেয়েকে নিয়ে আমার সংসার করে কী লাভ? মাগনা পুষব তোকে?’ পাঁচন দিয়ে সে নাফিসনের পিঠে আঘাত করতে থাকে। সপ…সপ…সপ…
নাফিসন কাঁদতে থাকে। খোদনের পায়ে পড়ে। কিন্তু নাফিসনের কান্না খোদনের কানে পৌঁছায় না। যেন সে শ্রবণশক্তি হারিয়েছে। খোদন চিৎকার করে, ‘কবে থেকে তোকে বলা হইছে টাকা আন, টাকা আন… কিন্তু সাহেবের বেটি সে কথা শুনবি ক্যানে… দরকার নেই তোর মতো বৌ আমার… বেরিয়ে যা আমার বাড়ি থেকে… দূর হ… মাগি তোকে দিলাম তালাক, তালাক, তালাক…’
চিৎকার শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে খোদনের মা। হঠাৎ ছেলের মুখে শেষের তিনটে শব্দ শুনে তাঁর মুখে বিস্ময় ও আতঙ্কের রেখা ফুটে ওঠে।
২
রাতের গভীরতা বেড়েছে। আকাশের নক্ষত্রমণ্ডল নির্বিকার চোখে তাকিয়ে আছে মাটির ক্ষুদ্র অস্থিরতার দিকে। উঠোনে নেমে এসেছে এমন এক নীরবতা, যার ভেতর চাপা পড়ে আছে মানুষের গোপন ভয়।
খোদনের কাঁচা ঘরের ভেতর ল্যাম্পের মৃদু আলো জ্বলছে, সেই হলুদ আলোয় বাড়ির মানুষগুলোর ছায়া লম্বা হয়ে দেওয়ালে কেঁপে উঠছে, মনে হচ্ছে প্রত্যেকটি ছায়া আজ সাক্ষী হতে এসেছে এক অনিবার্য বিচারের। খোদনের সামনে পাটি পেতে বসে আছেন গ্রামের মসজিদের পেশ ইমাম, তাঁর পরনে সাদা পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি, দাড়িতে হালকা পাক ধরা।
ঘরের এককোণে মুখে ঘোমটা টেনে বসে আছে নাফিসন; কাঁধ কাঁপছে নিঃশব্দ কান্নায়। পাশে বসে আছে তাঁর শাশুড়ি, যার মুখে কঠোরতার সঙ্গে হিসেবনিকেশের একটা ভয় বিদ্যমান।
রাগের মাথায় তিনবার ‘তালাক’ বলার পাঁচ মিনিট পর থেকে খোদনের রাগের আগুন নিভতে শুরু করেছিল, আর ছাইয়ের নীচে লুকিয়ে থাকা অনুতাপ তখন ধীরে ধীরে মাথা তুলছিল।
নাফিসনের কাছে গিয়ে মিনমিন করে সে বলেছিল, ‘রাগের মাথায় বলি ফেলিচি, কিছুই হবে না। শুধু তুমি, আমি আর মা জানি। আমি এসব অত বুঝি না, মানিও না।’
কিন্তু বাদ সেধে বসে খোদনের মা। তিনি বলেন, ‘তুই কি আল্লার উপর দিই যাবি নাকি বাপ? আল্লার বিধান হইল তালাক দিলি আর সংসার করা যায় না।’
খোদন আল্লার নাম শুনে চমকে উঠল। সে আমতা-আমতা করে বলল, ‘আমি তো ইচ্ছে করে দিই নাই। রাগের মাথায় বলি ফেলিচি।’
-আমি যা জানি, তাতে তোদের তালাক হই গেছে। তুরা আর একসাথে থাকতে পারবি নে।
খোদন চিন্তিত মুখে বলল, ‘তাহলে উপায় কী?’ তার চোখে-মুখে অসহায়ত্ব স্পষ্ট।
মা বললেন, ‘ইমাম সাহেবকে খবর দে। তিনি ঠিক একটা বিহিত করবেন।’
নিরুপায় খোদন মাথা নাড়ল। নাফিসন তখনও নীরবে কেঁদে চলছে।
ইমাম সাহেব এসে দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘তুমি কি তিনবার তালাক বলেছ?’
খোদন শুকনো মুখে মাথা নাড়ল।
ইমামের দাড়ির আড়ালে হালকা হাসি খেলে গেল। কেউ লক্ষ করল না। সেই হাসির ভিতর অন্যকিছুর হিসেব চলছিল।
তিন বছর আগে তাঁর বিবি ইন্তেকাল করেছে। বয়স পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই। একাকিত্বের দীর্ঘ রাত। তাঁর মনে সুপ্ত বাসনা জেগে ওঠে।
তিনি ভালো করেই জানতেন, রাগের মাথায় উচ্চারিত তিন তালাক এক তালাক হিসেবে গণ্য হয়। আর তাৎক্ষণিক অনুশোচনায় তা বাতিল হতে পারে। কিন্তু সেই সত্য জ্ঞান আজ তাঁর বাসনার কাছে হেরে গেল।
নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তিনি বললেন, ‘এখন আর উপায় নাই, তালাক হয়ে গেছে। তোমার বিবি এখন তোমার কাছে হারাম। যদি তুমি আবার সংসার করতে চাও, তবে হালালা বিয়ে দিতে হবে।’
খোদন চিৎকার করে উঠল, ‘না, আমি মানি না, রাগের মাথায় বললি কেমনে তালাক হয়?’
ইমাম কঠোর গলায় বললেন, ‘এটা আমার কথা না। এটা আল্লার বিধান। আমরা সামান্য বান্দা। আল্লার বিধান সমান।’
খোদনের মা বললেন, ‘ঠান্ডা হ বাপ, ইমাম সাহেব কি মিথথি কথা বলতি পারেন?’
খোদন রাগে ফেটে পড়ল, ‘যে বিধানে রাগের মাথায় বললে তালাক হয় লিখা আছে, সেই বিধান আমি মানি না।’
‘এত বড় কথা! আল্লার বিধান অমান্য?’ ইমাম গর্জে উঠলেন। যদিও রাগে ব্যক্তিগত স্বার্থের আঁচ গোপনই থাকল।
একটু ধাতস্থ হয়ে তিনি ঠান্ডা মাথায় বললেন, ‘কাল সালিশি সভা বসানো হবে। সেখানেই বিচার হবে। আল্লার বিধানের বিরুদ্ধে কথা বলো। সাহস কত?’
৩
বিকেলের আলো যখন ক্রমে নরম হয়ে এল, তখন খোদনের বাড়ির পিছনের সেই পুরোনো বট গাছটার নীচে ধীরে ধীরে জড়ো হতে শুরু করল গ্রামবাসী। বটতলার মাটি গোল করে পরিষ্কার করা হয়েছে। পেতে দেওয়া হয়েছে কয়েকটা চেয়ার। সেখানে বসেছেন গ্রামের ইমাম, দু’-একজন আলেম, মাটিতে পাতা চটে বসেছে দুই পক্ষের মানুষ।
একদিকে নাফিসনের বাবা। মুখ শুকনো, চোখ দুটো ভিতরে ঢুকে গেছে। সঙ্গে কয়েকজন আত্মীয়। অন্যদিকে, খোদনের পক্ষের লোকজন। সবাই মাথা নীচু করে বসে আছে। চারপাশে ভিড় প্রতিবেশীদের। কৌতূহল বাড়ছে। খোদন একটু দূরে বসে আছে। তারও মাথা নীচু। চোখ লাল। মুখে অপরাধবোধ আর অসহায়তার ছাপ। নাফিসন বসে আছে আরও দূরে। মাথায় ঘোমটা। পাশে তার দুই ছোট বোন।
একসময় ইমাম সাহেব গলা খাঁকারি দিলেন। গুঞ্জন থেমে গেল।
তিনি বললেন, ‘সমবেত জনতা, আপনারা সকলে জানেন, কাল রাতে খোদন তার বিবিকে তিন তালাক দিয়েছে। কিন্তু তালাক দেওয়ার পরেও সে আবার তার বিবির সঙ্গে সংসার করতে চায়।’
উপস্থিত সকলে হায় হায় করে উঠল। এক বয়স্ক ব্যক্তি বলে উঠল, ‘তালাক দিলি তো সব শেষ!’
ইমাম আবার বললেন, ‘আমি তাদের বলেছি, আল্লার বিধান অনুযায়ী হালালা বিয়ে ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। তখন সে আল্লার তরিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে গালিগালাজ করেছে। আপনারা বলুন এটা কি ঠিক?’
জনতার মধ্যে যেন হঠাৎ আগুন জ্বলে উঠল। চারদিক থেকে ভেসে এল- কত্ত বড় বুকের পাটা আল্লার বিধান তুলে কথা? যত বড় মুখ নয়, তত বড় কথা…
এক বয়স্ক আলেম হাত তুলে বললেন, ‘চুপ করেন সবাই।’ তিনি খোদনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমার কিছু বলার আছে?’
খোদন মাথা নীচু করে বলল, ‘হুজুর, রাগের মাথায় বলি ফেলিচি। পরে তওবা করিচি। আমি আমার বৌরে ছাড়তে চাইনে। আমার বৌরে হালালা বিয়ে দিতে কইবেন না হুজুর। আমি মইরা যামু তা-ও এইডা পারুম না।’
কিন্তু ইমাম তখন হেসে বললেন, ‘দেখছেন হাজী সাহেব, কত বড় বড় কথা বলে!’
আলেম তখন গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘আল্লার বিধানের বিরুদ্ধে কেউ যেতে পারে না।’
তারপর তিনি নাফিসনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মা, তোমার কিছু বলার আছে?’
নাফিসন ঘোমটার আড়াল থেকে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘আমি আমার সোয়ামিরে ভালোবাসি। সে বেঁচে থাকতে আমি আর কুনোদিন অন্য কোথাও বিয়া করতে পারুম না।’
চারপাশে এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এল। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতা বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না।
আলেম হঠাৎ রেগে উঠে বললেন, ‘কি! তোমরা আল্লার বিধান মানবে না? জানো এর শাস্তি কী? দুনিয়ায় কষ্ট তো আছেই, সঙ্গে আজীবন জাহান্নামের আগুনে পুড়ে মরতে হবে।’
শেষবার তিনি বললেন, ‘বলো, আমাদের কথা তোমরা মানবে কি না?’
নাফিসন ধীরে ধীরে মাথা তুলে বলল, ‘না, হুজুর। আমাকে মেরি ফেলুন। তা-ও আমি পারুম না।’
আলেম তখন দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন, ‘আজ থেকে এদের পরিবারকে সমাজ থেকে বের করে দেওয়া হল। এদের সঙ্গে কেউ মিশবে না। লেনদেন করবে না। যদি কেউ এর অন্যথা করে, তাদেরও সমাজ থেকে বের করে দেওয়া হবে।’
মানুষের মধ্যে ফিশফাশ বাড়তে লাগল। আলেম গর্জে উঠলেন, ‘আল্লার বিধানকে অপমান করার জন্য খোদন আর তার বৌকে একশো ঘা করে বেতের বাড়ি মারা হবে।’
কয়েকজন লোক এগিয়ে এল।
খোদন আর নাফিসনকে টেনে নিয়ে যেতে থাকল বট গাছের দিকে।
ঠিক সেই মুহূর্তে নাফিসনের চোখের সামনে এক অদ্ভুত দৃশ্য ভেসে উঠল। আবছা আলোয় সে দেখল, বট গাছের শিকড়ের কাছে হাজার হাজার নারী বাঁধা। সকলের মাথা নীচু। চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। তারা সবাই হাত তুলে তাকে ডাকছে।
The submit তালাকনামা appeared first on Uttarbanga Sambad.
