সুস্মিতা গঙ্গোপাধ্যায়, নিউ জার্সি: তেরো বছরের এক লাজুক কিশোর (Lionel Messi)। শরীরে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি, উচ্চতা সমবয়সিদের চেয়ে বেশ খানিকটা কম। আটলান্টিক পেরিয়ে যেদিন সে স্পেনের বার্সেলোনায় পা রেখেছিল, কে জানত এই ছেলেটাই একদিন গোটা ফুটবল বিশ্বকে নিজের খেয়ালে শাসন করবে! লা মাসিয়ার মাঠে তার বাঁ পায়ের জাদুতে ততদিনে রীতিমতো মন্ত্রমুগ্ধ স্প্যানিশ ফুটবল কর্তারা। জাভি হার্নান্ডেজ, ইনিয়েস্তা, সেস ফ্যাব্রেগাসদের নিয়ে গড়া স্পেনের সোনালি প্রজন্মের সঙ্গে ওই খুদে জাদুকরকে জুড়ে দিতে মরিয়া ছিল তারা। স্প্যানিশ কোচ ভিসেন্তে ডেল বস্কি তো প্রকাশ্যে স্বীকারই করেছিলেন, ছেলেটাকে স্পেনের জার্সি পরাতে চেষ্টার কোনও ত্রুটি রাখেননি তাঁরা।
স্পেনের যে তাকে খুব প্রয়োজন ছিল, তা কিন্তু নয়। তাদের দল এমনিতেই তারকায় ঠাসা। স্পেনের কাছে সে ছিল আভিজাত্য বাড়ানোর এক শৌখিন রত্ন। কিন্তু হাজারো প্রস্তাব, প্রলোভন আর নিশ্চিন্ত ভবিষ্যতের হাতছানি হেলায় ফিরিয়ে দিয়েছিল রোজারিওর সেই কিশোর। স্প্যানিশ ফুটবলের নিখুঁত ব্যাকরণে বড় হয়ে উঠলেও, তার রক্তে মিশে ছিল শুধুই নীল-সাদা আবেগ। স্পেন তাকে একটা মসৃণ পথ দিতে পারত। বিনা পরিশ্রমে হয়তো আন্তর্জাতিক ট্রফির ক্যাবিনেট অনেক আগেই ভরে যেত। কিন্তু সে বেছে নিয়েছিল এক অদ্ভুত যন্ত্রণার পথ, কাঁটা বিছানো এক রাস্তা। কারণ সে জানত, স্পেনের তাকে স্রেফ ‘ইচ্ছে’ হয়েছিল। আর ট্রফি খরায় ধুঁকতে থাকা আর্জেন্টিনার তাকে বাঁচার জন্য ভীষণ ‘প্রয়োজন’ ছিল।
স্পেনের সেই লোভনীয় প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার পর, রাতের ঘুম উড়েছিল আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের। ফিফার নিয়ম মেনে তাকে দ্রুত নিজেদের করে নিতে তড়িঘড়ি প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে অনূর্ধ্ব-২০ দলের একটা প্রীতি ম্যাচের আয়োজন করা হয়। কতটা দায়সারা ছিল সেই আয়োজন, ভাবলে আজ হাসি পায়! দলের ফ্যাক্সে পাঠানো নথিতে তার নাম লেখা হয়েছিল ‘লিওনেল মেচ্চি’! নিজের দেশ তাকে তখন ঠিকমতো চিনতও না। তবুও সেই কিশোরের জেদ ছিল অবিচল।
এরপরের গল্পটা শুধুই রোলার কোস্টারের মতো। কতবার চোখের জলে মাঠ ছেড়েছেন তিনি। হৃদয় ভাঙার যন্ত্রণায় একসময় অভিমানে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকেই সরে দাঁড়িয়েছিলেন। স্প্যানিশ সমর্থকরা বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘আমাদের হয়ে খেললে তোমার এতদিনে বিশ্বকাপ জেতা হয়ে যেত।’
কিন্তু আজ, ৩৯ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে সেই মানুষটা আরও একটা বিশ্বকাপের ফাইনালে। রবিবারের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে প্রতিপক্ষ সেই স্পেন, যে দেশ তাঁকে ফুটবলের ‘অ আ ক খ’ শিখিয়েছে। চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়ে তাঁকে আজকের মহাতারকা হওয়ার ভিত গড়ে দিয়েছে। এটা এক অদ্ভুত চক্রের পূর্ণতা। যে দেশ তাঁকে সব দিয়ে আপন করতে চেয়েছিল, আজ তাদের বিরুদ্ধেই দেশের সম্মান রক্ষার লড়াই। স্পেনের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার সেই জেদটা যে ভুল ছিল না, সেটা তিনি আগেই প্রমাণ করেছেন। আর রবিবার কাপটা হাতে উঠলে গোটা বিশ্ব আরও একবার মেনে নিতে বাধ্য হবে- স্পেনের তাঁকে স্রেফ ‘ইচ্ছে’ হয়েছিল, কিন্তু আর্জেন্টিনার তাঁকে ভীষণ ‘প্রয়োজন’ ছিল।

