প্রায় বছর ২০ পর কলকাতায় ফিরছেন তসলিমা নাসরিন (Taslima Nasrin)। এই ফেরা, নিশ্চিতভাবেই তসলিমার জীবনে, বাংলার সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
১৯৯২। বাবরি মসজিদ। ধ্বংস। জন্ম নিল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা– ভারতেই তা সীমাবদ্ধ রইল না। ছড়িয়ে পড়ল বাংলাদেশেও। ধর্মীয় মৌলবাদের শিকার হল বাংলাদেশের এমন হিন্দুরাও, যারা ধর্ম নিয়ে তেমন মাথা ঘামায়নি এর আগে পর্যন্ত। এমন এক হিন্দু পরিবারের গল্প, সাম্প্রদায়িক হিংসার জেরে জেরবার– তার কথা সরাসরি উঠে আসছে যে বইতে, সে বইয়ের প্রকাশসাল ১৯৯৩। লিখছেন মাত্র বছর তিরিশের এক নারী। যিনি ধর্মীয় পরিচয়ে বাংলাদেশি মুসলিম, লিঙ্গগত পরিচয়ে তথাকথিত ‘দুর্বল’– এক নারী।
আরও পড়ুন:

তসলিমা নাসরিন। ১৯৮৬ সালে ‘শিকড়ে বিপুল ক্ষুধা’– এই কবিতার বই দিয়েই তাঁর আত্মপ্রকাশ। একের পর লিখে গিয়েছেন ‘নির্বাসিতে বাহিরে অন্তরে’, ‘আমার কিছু যায় আসে না’, ‘অতল অন্তরীণ’, ‘বালিকার গোল্লাছুট’-এর মতো কাব্যগ্রন্থ।
তিনি যখন ‘আমার মেয়েবেলা’য় তাঁর শৈশবের নানা ঘটনা, গল্প বলছেন, তুলে ধরছেন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, ততদিনে নারীর এমন রাখঢাকহীন আত্মকথন নেওয়ার মতো পরিণত মানসিকতা কিছুটা হলেও কি হয়েছিল বাঙালি পাঠকের? যদিও বহু আগেই রাসসুন্দরী দেবী লিখেছেন ‘আমার কথা’, বাংলায় প্রথম আত্মজীবনী। এক নারীর। তবুও কি তসলিমার কালো অক্ষর বাঙালি পাঠককে বিরক্ত করেনি?
তসলিমার লেখার পরতে পরতে যেন খোলস ছাড়ে শৈশবের সারল্য। এক পোঁচ, দু’পোঁচ করে তাতে মেশে সমাজের ঘুণধরা ছবি, মৌলবাদ, লিঙ্গবৈষম্য, যৌনতার কথা। প্রত্যেক বইয়ের প্রকাশের আগেই তো তিনি জানতেন, ধর্মীয় গোঁড়াদের সামনে একটু একটু করে বেআব্রু হচ্ছেন, ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে ওঁর স্বাধীনভাবে বাঁচার পরিসর।
কিন্তু তবু লেখা থামিয়ে দেননি তসলিমা। ‘আমার মেয়েবেলা’-র পর যা-কিছুই লিখেছেন, ‘নষ্ট মেয়ের নষ্ট গদ্য’, ‘নির্বাচিত কলাম’, ‘নারীর কোনও দেশ নেই’, অথবা ‘নির্বাসিত নারীর কবিতা’, ‘খালি খালি লাগে’, ‘আমার কিছু যায় আসে না’-র মতো কবিতার বই— সবই কোনও না কোনওভাবে হয়ে উঠেছে তাঁর আত্মজীবনীর অংশ। বাংলাদেশে বেড়ে ওঠা এক মুসলিম নারীর আত্মজীবনী। ওঁর মেয়েবেলা সারাক্ষণ রয়েছে ওঁর কলমে। মেয়েবেলার স্মৃতিই মানুষ তসলিমাকে তৈরি করছে। তাঁর বেঁচে থাকা, তাঁর যৌনতা, তাঁর ভুলভ্রান্তি— অন্যকে সমালোচনার পাশাপাশি তসলিমা বিদ্ধ করেছেন নিজেকেও। আত্মসমালোচনায় ভয় পাননি।
লিখেছেন ‘শোধ’, ‘ফরাসি প্রেমিক’-এর মতো উপন্যাস। ‘আমার মেয়েবেলা’-র পর জুড়েছে আত্মজীবনীর পরবর্তী পর্যায়— ‘উতল হাওয়া’, ‘দ্বিখণ্ডিত’, ‘সেই সব অন্ধকার’, ‘আমি ভালো নেই, তুমি ভালো থেকো প্রিয় দেশ’। ‘লজ্জা’ নিয়ে বিতর্কের জেরে বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন, এক সময় নির্বাসিত হলেন পশ্চিমবঙ্গ থেকেও। কিন্তু এর আগে, অনেকখানি আগেই যখন ওঁর বইয়ের বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, ‘নিষিদ্ধ’ ঘোষণা হচ্ছে, তখনই কি তসলিমা লেখকের ভূমি থেকে প্রতারিত হননি? বারেবারেই যে ওঁর লেখার পরিসরকে খর্ব করা হয়েছে।
তবু লিখে গিয়েছেন তসলিমা। কলমের খাপ তিনি হারাননি, স্বেচ্ছায় ফেলে দিয়েছেন। খাপখোলা কলমই তাঁর কাছে বেঁচে থাকার অস্ত্র। নির্বাসিত ধূসর সময়কাল থেকে কলকাতায় এই ফেরা, শুভ হোক তসলিমার। তিনি লেখায় আরও গুঢ়ভাবে ফিরুন, পাঠক নিশ্চয়ই তাঁর কলমের দিকে আবারও তাকিয়ে থাকবে।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
