দ্রুত লাইমলাইটে আসার এক সহজ পথ – Uttarbanga Sambad

দ্রুত লাইমলাইটে আসার এক সহজ পথ – Uttarbanga Sambad

শিক্ষা
Spread the love


  • শুভময় সরকার

সে বহুকাল আগের কথা, আবছা স্কুলবেলার দিন। সময়ের নিরন্তর স্রোতে পলি জমতে জমতে স্মৃতি হারিয়ে যায়, তবু কিছু ঘটনা কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একেবারে টাইম-টেস্টেড। তো তেমনই এক রাতের কথা। ট্রেনে ফিরছি বাবা-মায়ের সঙ্গে কলকাতা থেকে। যতদূর মনে পড়ে তখন স্টিম ইঞ্জিনের সময়। ‘বিশ্বায়ন’ নামক কোনও শব্দ আমাদের ভোকাবুলারিতে স্থান পায়নি। নেহাতই প্রাক-বিশ্বায়ন নয়, তার অনেক অনেক আগের কথা। উন্নয়নের এমন হড়পা ছিল না, এত আলোকোজ্জ্বল ভারতবর্ষও নয়। সাদামাঠা টিউবলাইটে রাতেরবেলা স্টেশনগুলো ম্যাড়মেড়ে। নিশুতি রাতে অন্ধকারের বুক চিরে আমাদের ট্রেন ছুটে চলেছে, দুলুনিতে মিডল বার্থে আধঘুমে আমি, ওপরে আর নীচের বার্থে বাবা-মা। মাঝরাতে এক অজানা স্টেশনে কোনও কারণে দাঁড়িয়ে ছিল আমাদের ট্রেন আর সেই আধোঘুমে শুনসান স্টেশনে অসংলগ্ন এক কণ্ঠে শুনেছিলাম এক অশ্লীল খিস্তি, রাতের নৈঃশব্দ্য ভেদ করে সেই অজানা মাতাল কণ্ঠেই আমার জীবনে সম্ভবত প্রথম শোনা কুকথা, অন্তত সেটাই আমার স্মৃতিতে প্রথম ডকুমেন্টেড কুকথা। সেই প্রথম শোনা কুকথার আগে এবং পরে বিস্তর কুকথার বন্যা বয়েছে, বয়ে যাচ্ছে এবং যাবে। আবহমান কুকথার নিরন্তর স্রোতে আমি এক রসিক শ্রোতা মাত্র।

কুকথার আভিধানিক অর্থ অশোভন কিংবা অশ্লীল কথা। আরেকটু সহজে বলা যায় কুরুচিপূর্ণ কথা। কিন্তু এখানেই বাধল গোল– কুরুচিপূর্ণ বা অশ্লীল বলে দেগে দেবার আগে কিঞ্চিৎ ভাবা প্র্যাকটিস জরুরি। আজ যা খারাপ, গতকাল তা ছিল ভালো। কিন্তু কী মুশকিল, এও তো ভারী গোলমেলে এক কথা। খারাপ তো খারাপই, ভালো চিরকালই ভালো…! কিন্তু তাই কি? এই উত্তরাধুনিক বা পোস্ট-ট্রুথের সময়ে দাঁড়িয়ে এত সরলীকরণ সম্ভব নয়, উচিতও নয় বোধহয়। আসলে এই কুকথার বা কুরুচিপূর্ণ কথার ইতিহাস ঘাঁটতে গেলে ভাষার বিবর্তনে এর ব্যবহার এবং সামাজিকভাবে এর বহুস্তরীয় প্রভাব সম্পর্কে কিঞ্চিৎ অবগত হওয়া জরুরি…! ইতিহাসের দিকে তাকালে সহজেই জানা যায়, কুকথার ব্যবহার সব সমাজেই কমবেশি ছিল। অতীতে ভাষার ব্যবহার যখন সীমিত, তখনও  ছিল কুকথা তবে সময়ের সঙ্গে, সামাজিক পরিবর্তন বা বিবর্তনের সঙ্গে, ‘ভাষার সমৃদ্ধি’র সঙ্গে কুকথার ধরন ও তার প্রয়োগের পরিবর্তন ঘটেছে অনিবার্যভাবেই। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বঙ্গজীবনের অশ্লীল শব্দ সম্পর্কীত ধারণা কিন্তু বিস্তর পরিবর্তিত হয় দু’ভাবে, অর্থাৎ একদা যা ছিল অতি সাধারণ, বহুল ব্যবহৃত শব্দ বা শব্দবন্ধ, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সেটাই হয়ে উঠল অশ্লীল শব্দ। ভদ্র, রুচিশীল সমাজে প্রত্যাখ্যাত হল সেসব শব্দ, উলটোটাও কিন্তু হয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর নব্যশিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থানে বেশ কিছু সামাজিক পরিবর্তন ঘটেছিল। ইংরেজি শিক্ষার প্রসার, ব্রাহ্মসমাজের প্রভাব, পাশ্চাত্য মূল্যবোধ এবং শালীনতার আদর্শে বিশেষ করে শহর কলকাতার মধ্যবিত্ত মহল নতুন ভাবনায় দীক্ষিত হয়ে নতুন করে ভাবতে শিখল। অন্তত এটুকু বলাই যায়, কুকথার ইতিহাস একটি ব্যাপক ও বহুমাত্রিক পরিসর, যা বহুলাংশেই ভাষার বিবর্তন, সামাজিক রীতিনীতি এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের ওপর নির্ভরশীল।

‘কুকথায় পঞ্চমুখ, কণ্ঠ ভরা বিষ।’ ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্যের সেই অমোঘ লাইন তো বহুব্যবহারে ক্লীশে। তবে আজও কিন্তু সেই ‘ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে’…! শুধু চলেছে নয়, ক্রমবর্ধমান খেউড়ে আমরা রীতিমতো বিধ্বস্ত। আক্রমণকারী এবং আক্রান্ত, শোষক এবং শোষিতের দ্বন্দ্ব, সব তত্ত্ব, ডায়ালেকটিকস ঘেঁটে যাচ্ছে কুকথার লাভাস্রোতে আর এই লাভাস্রোতের মাঝে দাঁড়িয়েই কিছু অনিবার্য প্রশ্ন কিন্তু এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। এই যে কুকথা, খিস্তিখেউড়, এর পেছনে কি অক্ষমের অসহায়তাও কাজ করে? হয়তো করে, কারণ এই মাঝবেলায় দাঁড়িয়ে ‘অতীতের তীর হতে’ বয়ে যাওয়া বহু দীর্ঘশ্বাসকে পরবর্তী সময়ে খিস্তির নির্গমনে শান্ত হতে দেখেছি। বহুকাল আগে আমার প্রয়াত পিতামহ মজা করে একটা কথা বলতেন, ‘মুণ্ডমালার দাঁত খামটি সার’,  সে বয়েসে আপাত অর্থ অনুধাবন করলেও এই চালু শব্দবন্ধের সোর্স জানতে চাইলে তিনি মুচকি হেসে বলতেন– কালীমূর্তির গলায় মুণ্ডমালার দিকে তাকাও, দেখবে কাটা মুণ্ডুগুলো দাঁত খিচোচ্ছে…! সময়ের সঙ্গে পিতামহের সেই অমোঘ প্রবাদটি বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রত্যক্ষ করেছি। কিঞ্চিৎ অতীতবিলাসী আমি, তাই ফের চোখের সামনে ভেসে উঠল এক দৃশ্য। সেও বহুকাল আগের এক অস্থির সময়ের কথা। আমার ফেলে আসা স্কুলবেলার শহরে যে ফ্ল্যাটবাড়িটিতে আমরা থাকতাম, ঠিক তার উলটোদিকেই ছিল ভারতীয় রেলের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ডিভিশনের সদর দপ্তর। আটের দশকের শুরুর দিকে এক অস্থির আন্দোলন চলছিল সেই অঞ্চলে, যার দীর্ঘসময়ের সাক্ষী আমি। সব আন্দোলনের মতো, সে আন্দোলনেও ছিল বনধ, পিকেটিং, রাস্তা অবরোধ, অগ্নিসংযোগ এবং হিংসাত্মক নানা ঘটনা। তো সেদিনও চলছিল রেলের সদর দপ্তরের চারটে গেটে আন্দোলনকারীদের পিকেটিং। কর্মীদের অফিসে ঢুকতে দেওয়া হবে না। টানা ক’দিনের অবরোধে কর্মীদের মধ্যে অস্থিরতা দানা বাঁধছিল, ধৈর্যের বাঁধও ভাঙছিল। যেদিনের কথা বলছি, সেদিনও সকাল থেকে চলছিল পিকেটিং, সকাল ১০টা নাগাদ বিভিন্ন রাস্তা দিয়ে পূর্বপরিকল্পনামতো রেলের কর্মচারীরা মিছিল করে অবরোধ ভেঙে অফিসে ঢোকার চেষ্টা করতেই শুরু হল ধুন্ধুমার। অবরোধকারী এবং কর্মচারীদের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ, আহত বহু। আন্দোলনকারীরা প্রায় সবাই ছাত্র-যুব, ফলত কর্মচারীদের একটা অংশ অবরোধ ভেঙে অফিসে ঢুকে যেতে পারলেও, বড় অংশই কিন্তু পিছু হটে যেতে বাধ্য হল। দোতলার জানলা দিয়ে ভয়ার্ত, আতঙ্কিত চোখে সেদিনের সদ্য কৈশোর পেরোনো আমি দেখেছিলাম রেলের কর্মচারীদের অসহায়ত্ব এবং সেই অসহায়ত্ব, অক্ষমতা থেকে খিস্তি এবং কুকথার পার্গেশন।

ওই যে বলছিলাম সময়ের সঙ্গে কুকথা সম্পর্কিত ধারণার পরিবর্তনের যোগ, তো সেই পরিবর্তনের স্রোতে আজও স্যোশাল মিডিয়া থেকে দূরদর্শনের নানান চ্যানেলের খেউড়-সন্ধে, পাড়ার অলিগলিপথ থেকে সুদূর ইংল্যান্ডের সংবাদমাধ্যম, কোথাও কোনও ছেদ নেই, অবিশ্রান্ত কুকথার কার্পেট বোম্বিংয়ে আমরা দিব্য উত্তরাধুনিক এক সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। কিছুকাল আগে একটি বৃটিশ ট্যাবলয়েডে সাংবাদিক জেরেমি ক্লার্কসন এক উত্তর সম্পাদকীয়তে চার্লস ও তাঁর প্রয়াত স্ত্রী ডায়ানার ছোট ছেলে হ্যারির অভিনেত্রী স্ত্রী মেগান সম্পর্কে অশ্রাব্য কথা লেখেন। সেই কুকথার বিরুদ্ধে নিন্দায় ফেটে পড়েছিল অভিজাত বৃটিশ পাঠককুল। বাধ্য হয়ে ট্যাবলয়েডটির তরফে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া হয়। তবে গল্প এখানেই শেষ নয়, এরপর ‘ডাচেস অব সাসেক্স’ মেগান বলেন, প্রথমে কুকথা বলে পরে ক্ষমা চাওয়া ওই ট্যাবলয়েডের এক পাঠক টানার কৌশল মাত্র। এদেশেও এসব কলাকৌশলে আমরাও খুব একটা পিছিয়ে নেই। দ্রুত লাইমলাইটে আসার এক সহজ পথ বিতর্কিত কথা বলা, যার অধিকাংশই কুকথা।

তবে এই খিস্তিখেউড়, তথাকথিত অশোভন শব্দচয়ন কখনো-কখনো অস্ত্র হয়েও ওঠে সৃজনের আঙিনায়। সেই অস্ত্র ব্যবহৃত হয় এত নিখুঁত, বুদ্ধিদীপ্তভাবে, যা শিল্পের ভিন্ন এক জগতের সন্ধান দেয়। সাহিত্য আন্দোলনের বিভিন্ন যুগে তথাকথিত অশ্লীল, অশোভন শব্দের ব্যবহার আমরা দেখেছি। একদা সাড়া জাগানো হাংরি আন্দোলনের লেখকরাও কিন্তু অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন। জীবনমুখী গায়ক যখন ‘শুয়োরের বাচ্চা’ শব্দটির তীব্র উচ্চারণে আমাদের ঝাঁকুনি দেন, আমরা অনুভব করি এক প্রতিবাদী সত্ত্বাকেই। আর যার কথা না বললে এ লেখা অসম্পূর্ণ রয়ে যায় তিনি এক এবং অদ্বিতীয় নবারুণ ভট্টাচার্য, থুড়ি ‘পুরন্দর ভাট’…! পুরন্দর ভাটের কলমে নবারুণ ভট্টাচার্যর ছোট ছোট কবিতা আসলে এক অদ্ভুত পরিসর তৈরি করেছে যেখানে আপাত অ-সংসদীয় বা তথাকথিত অশোভন কিংবা আরেকটু সরাসরি বললে খিস্তির আড়ালে কোথাও এক প্রতিবাদের কথাই শোনা যায়, ঠিক যে ভাবনায় ফ্যাঁৎ ফ্যাঁৎ সাঁই সাঁই করে ফ্যাঁতাড়ুদের আকাশে উড়িয়েছেন নবারুণ ভিন্ন এক নির্মাণে। কুকথার বহুস্তরীয় ব্যবহারের উল্লেখ করেছি, আসলে কুকথা কখনো-কখনো অস্ত্র হয়ে এক নান্দনিক অভিঘাত তোলে আমাদের মনে, আমরা অনুভব করি এক তীব্র যন্ত্রণা, আর এই যন্ত্রণাই জরুরি শুশ্রূষা হয়ে ওঠে দুঃসময়ে। মানুষ এগিয়ে চলে সুসময়ের সন্ধানে…



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *