- শান্তনু চক্রবর্তী
মুডুমখোলা, ছোট্ট এক পাহাড়ি নদী। নামটা অনায়াসে মন ছুঁয়ে যায়। তিরতির করে দুই পাহাড়ের বুক চিরে উদ্বেগহীন গতি। রাজস্থানের মেয়েদের হাতভর্তি চুড়ির সেই সুরেলা টুংটাং ছন্দ যেন আপ্ত করেছে এই নদীও। এমনিতে শান্ত ধীরস্থির। গতিপথে কোনও বড় পাথর অবরোধ করলে সফেদ ফেনা তোলা জলে তীব্র ঘূর্ণি তুলে জানান দেয় তার অসন্তোষের কথা। এখনও মানুষের লোভাতুর দৃষ্টির আড়ালে রাখতে পেরেছে নিজেকে। তবু কোথায় যেন শঙ্কা থেকেই যায়।
এই নদীর ওপর ছোটখাটো এক লোহার সেতু পেরিয়ে যাব কাগে। এর আগে পেডংয়ের উঁচু পাহাড়ের পাকদণ্ডি দিয়ে গড়াতে গড়াতে এই মুডুমখোলার মুখোমুখি হলাম। ছুঁয়ে গেলাম অনেক ছোট ছোট পাহাড়ি গ্রাম। চোখে পড়ল পাহাড়ের বুকের ওপর দিয়ে তৈরি হওয়া নতুন রাস্তা যা পূর্ব সিকিমের নাথু লাকে যুক্ত করবে।
আবার চড়াই ভেঙে পথ চলা, মাঝে মাঝে ধাপ চাষে ভুট্টার গর্বিত অবস্থান। অবশেষে অভীষ্ট গন্তব্যে। এই কাগে জায়গার নামটা সেরকমভাবে শোনা ছিল না। পৌঁছে বুঝলাম ছিমছাম পরিচ্ছন্ন এই গ্রাম একদম নতুন কিছু নয়। আছে বেশ কয়েকঘর মানুষজন। বেশ পুরোনো একটা স্কুল, যা গ্রামের প্রাচীনতার সাক্ষ্য বহন করে। এখানে বাস করে লিম্বু, লেপচা গোষ্ঠীর জনজাতি।
সেই কবে ১৮৮৩ সালে রেভারেন্ড ফাদার এম হার্ভাগল্ট সুদূর ফ্রান্স থেকে এসেছিলেন পেডংয়ে। তারপর কাগের এই পাহাড়ের মাথায় স্থাপনা করেন মারিয়া বস্তি। এখানে আছে ১৮৯১ সালে তৈরি হওয়া একটা চার্চ। আছে একটা স্কুল আর খেলার মাঠ। কাগের ছোট্ট একটা বাজারের মধ্য দিয়ে পথ চলা চার্চের উদ্দেশে প্রচণ্ড খাড়া রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে মনে হচ্ছিল এই পথের বোধহয় শেষ আর দেখা হবে না। তবু পৌঁছে যাই, অনুভবে অন্তরঙ্গ হয় এই কষ্টের সার্থকতা। এক অসাধারণ নৈসর্গিক দৃশ্য। প্রকৃতি যেন শীতলপাটি বিছিয়ে রেখেছে আমাদেরই প্রতীক্ষায়। বেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে নীরবতার সঙ্গে নিভৃত যাপন। আকাশের কালো মেঘ, টিপটিপ ঝরে পড়া বৃষ্টি, পাখিদের বাড়ি ফেরা, মনে করায় ফেরার কথা।
সন্ধ্যা নামে পাহাড়ের বুকে। চারদিকে নিরন্তর সবুজ বনরাশি। পতঙ্গের দল মুখর তাদের নানান শব্দের লহরী তুলে। এখানে শহুরে আলোর দাপট নেই, ভেবেছিলাম রাতের আকাশের তারাদের সঙ্গে সখ্য হবে, দেখব ছায়াপথ, আকাশগঙ্গা। কিন্তু বিধি বাম, আকাশ ছেয়েছে কালো মেঘে। হোমস্টের ব্যালকনিতে দাঁড়াতেই মনে হল, রাতের সব তারাই বোধহয় আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে সামনের পেডং–এর পাহাড়ের আনাচে-কানাচে।
সময়ের দিনলিপি মেনে আরেকটা সকাল আসে। ঘুম ভাঙে অনভ্যস্ত পাখির কুজনে। ঘরের কাচের জানলায় লেগে আছে বৃষ্টির জলছাপ। খুলে দিই জানলা, এক ঝাঁক মেঘ হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ে ঘরে। সকালের কাগের স্পর্শ নিতে বেরিয়ে পড়ি ঘর থেকে, সঙ্গী হয় পাহাড়ি সাদা কুকুর। আকাশে সাদা-কালো দুই মেঘেরই সহাবস্থান। তবু তাদের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসে সূর্যের মোলায়েম রশ্মি। পাহাড়ের মাথাগুলো মেখে নেয় রোদের দীপ্ত আভা, সরিয়ে দেয় পাহাড়ের গায়ে লেপ্টে থাকা মলিন মেঘের আবরণ। এইসব দেখতে দেখতে সময় গড়িয়ে যায়, বেলা বাড়ে, ফিরতে হবে আবার শহরে। কী ছিল কাগের মায়াবী স্পর্শে!!! এক রাতে এত মন খারাপের বেদনা। কথা দিই আবার আসব বলে, তখনও তুমি এমনই থাকবে তো? তোমাকে পাব তো এমন নিবিড় করে, ‘উন্নয়ন’ এর কাছে দাসখত লিখে দেবে না তো? সব উত্তর তো নিহিত থাকে কালের গর্ভে। এটাও তোলা থাকল সেইভাবেই ….
নীচের অংশটি আলাদাভাবে বসানো যেতে পারে। প্রয়োজনে বক্স করে।
যাওয়ার উপায় : দুইভাবে পৌঁছোনো যেতে পারে ১. শিলিগুড়ি থেকে লাভা রিশপ হয়ে ২. শিলিগুড়ি থেকে কালিম্পং পেডং হয়ে।
দূরত্ব : ৯০ কিমি (আনুমানিক)
সময় : দুই ক্ষেত্রেই সাড়ে চার ঘণ্টা থেকে পাঁচ ঘণ্টা (যদি সরাসরি যাওয়া হয়)
খরচ : যদি শিলিগুড়ি থেকে কাগে সরাসরি যাওয়া হয় তাহলে ৫০০০ থেকে ৫৫০০ টাকা (আনুমানিক হিসাব আর কী ধরনের গাড়ি নেওয়া হচ্ছে তার উপর নির্ভরশীল)
সাশ্রয়ী ভ্রমণ : শিলিগুড়ির তেনজিং নোরগে বাস টার্মিনাল অথবা পানিট্যাঙ্কি মোড় থেকে বাসে কালিম্পং, কালিম্পং থেকে শেয়ার গাড়িতে পেডং তারপর পেডং থেকে শেয়ার গাড়িতে কাগে।
আদর্শ সময় : অক্টোবর থেকে মার্চ, যাঁরা বর্ষার পাহাড় উপভোগ করতে চান জুলাই-অগাস্ট যেতে পারেন অবশ্যই রাস্তার অবস্থা মাথায় রেখে।
উচ্চতা : ৪০০০ ফুট (প্রায়)
থাকার ব্যবস্থাপনা : একাধিক হোমস্টে আছে।
