দুই বাংলার পুজোয় এ কেমন উলটপুরাণ

ব্লগ/BLOG
Spread the love


কলকাতার পুজোয় বিষাদের সুর, নিষেধাজ্ঞার পর নিষেধাজ্ঞায় বিভ্রান্ত জনতা। পদ্মার ওপারে উচ্ছ্বাস ও সম্প্রীতির ঢেউ!

রূপায়ণ ভট্টাচার্য

তিন সপ্তাহ বাকি তখন পুজো আসতে। কলকাতার এক রেস্তোরাঁর মালিকের গলায় তখনই লেখা ছিল হতাশা, ‘এবার পুজো পুজো গন্ধটাই নেই।’ শুনে প্রথমে পাত্তা দিইনি। তবে পরের ক’দিনে অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতা হতে থাকল। উবরচালক বললেন একই কথা। বাজারের মাছওয়ালা, ফুলওয়ালা, শপিং মলের নিরাপত্তারক্ষী, দোকানদার- সবার মুখে একই আক্ষেপ। পুজো আসছে, পুজো আসছে ব্যাপারটাই নাকি মনে হচ্ছে না!

যেন অদৃশ্য কেউ কলকাতার বুক থেকে পুজোর আগমনী সুর মুছে দিয়েছে। অথচ এই লোকগুলো কেউ পরস্পরকে চেনেন না। একে অন্যের কথা শোনেননি। তাহলে এত মানুষের অনুভূতি হুবহু এক হয় কী করে?

পুজোর সাতদিন আগেও শুনলাম সেই এক কথা। পঞ্চমীর দিনেও। বিস্ময়ের সঙ্গে ভাবছিলাম, কলকাতার হলটা কী? যে শহরে মহালয়ার অনেক আগে বাতাসে আলোর বেণুর শব্দ শুনতে পাওয়া যেত, সেখানে পঞ্চমীতেও মানুষ কেন বলছেন, পুজো পুজো ভাবের অভাব? কে কেড়ে নিল পুজোর সেই চেনা ছন্দ?

তারপর সপ্তমী এল। জোড়া সপ্তমী পেরিয়ে অষ্টমী, নবমী, দশমীও চলে গেল। কলকাতার রাজপথে ঘুরতে ঘুরতে মন বলে, এ কি সেই শহর? উবর, ওলা, যাত্রীসাথী শাঁ শাঁ ছুটছে। পথে প্রেমিক-প্রেমিকার ভিড়, বাবা-মা-সন্তানদের হন্টন আগের মতো নেই। চালকদের মুখে উৎসবের বাড়তি রোজগারের গল্পের বদলে হতাশার হিসাব। পুজোয় ট্রাফিক জ্যামেও থাকে অন্য আনন্দ। একজন বললেন, ‘গতবারের অর্ধেকও রোজগার হয়নি।’ আর একজনের আক্ষেপ, ‘এমন খারাপ পুজো আগে দেখিনি।’

অনেকের মুখেই এই সুর। যে উৎসবের অপেক্ষায় ছোট ব্যবসায়ীরা সারাবছর থাকেন, সেই উৎসবই এবার তাঁদের কাছে বিরাট হতাশার নাম। দুর্গাপুজো তো শুধু পুজো নয়, উৎসব। বাঙালির অর্থনীতি চাঙ্গা করার এক মহৌষধ। সেই ওষুধ এবার কাজ করল না। সরকার বদলের পর থেকেই কোন কারণে জানি না, রাত সাড়ে দশটার পর থেকে কলকাতার রাস্তা ঝিমোচ্ছে। পুলিশ প্রথম দিকে বলেছিল, রাত এগারোটার পর দোকান না খুলতে। সেই পর্ব চলছেই।

বিজয়ার বিকেলে এসব ভাবছি, আর ঠিক তখনই পদ্মার ওপারের খবরে চোখ রেখে চমকে উঠতে হল। ময়মনসিংহের রাস্তায় লাল পাড় সাদা শাড়ি পরে মহিলারা উচ্ছ্বাসে নাচছেন। ঢাকার মন্দিরে সিঁদুরখেলা, হাসি, আনন্দ। অভিনেত্রী শাওনের নাচের ছবিও চোখে পড়ল। যে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে বারবার উদ্বেগের খবর আসে, সেখানে এমন উজ্জ্বল ছবি! আর দুর্গাপুজোকে বিশ্বের দরবারে নিজের শ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক পরিচয় বলে তুলে ধরা কলকাতায় এত দীর্ঘশ্বাস!

বাংলাদেশের স্বল্পভাষী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তার আগে দেখা গিয়েছে রংপুর, রাজশাহির মন্দিরে। হিন্দুদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে, যাত্রা দেখতে। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলও ঢাকার মন্দিরে। বক্তব্যেও দুর্গা মাহাত্ম্য, সম্প্রীতির বার্তা।

সম্প্রীতি নিয়ে সবচেয়ে সোচ্চার সাংসদ ফজলুর রহমান আগেই বলে দিয়েছেন, ‘আমি বেঁচে থাকতে হিন্দুদের গায়ে হাত দিতে পারবে না। ইদের সময় পুলিশ না লাগলে দুর্গাপুজোর সময় পুলিশ লাগবে কেন!’ অন্য সাংসদ রুমিন ফারহানা উচ্ছ্বাসের সঙ্গে সাংবাদিকদের বলেছেন, পুজোর চারদিন তিনি কী কী নতুন শাড়ি পরবেন। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উদ্বেগ, মন্দির ও প্রতিমার ওপর হামলার অভিযোগও রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি পড়েছে ক’দিন আগেই। সব সমস্যা মিটে গিয়েছে, এমন দাবি করা যাবে না। তবু দুর্গাপুজোয় সরকারের অসাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তি অনেকটা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে শাসক।

কলকাতা যা পারেনি। এ শহর যেন পুজোর আগে থেকেই এক আশ্চর্য নিষেধাজ্ঞার শহর। পুজোর আগে ভিনরাজ্যের এক মডার্ন সাধুবাবা এসে বাঙালিকে আমিষ খাওয়া নিয়ে অনেক জ্ঞান দিয়ে গিয়েছিলেন। পুজো যত এগোল, শুরু হল মন্ত্রীদের জ্ঞান। অনেক কিছুতেই ‘না’। কোন থিম চলবে, কোনটা চলবে না। শারদোৎসব বলা চলবে না। রবীন্দ্রনাথ লিখে গিয়েছেন শারদোৎসব, সেই শব্দে পর্যন্ত আপত্তি। কোথায় কত জোরে গান বাজবে, কোথায় কী করা যাবে না। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ডিজে মালিকদের ক্ষোভ সেসময় ভাইরাল।

প্রশাসনিক বিধিনিষেধের কিছু অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু নির্দেশের পর নির্দেশ যখন উৎসবের স্বতঃস্ফূর্ততাকেই আড়াল করে দেয়, তখন পুজো কি আর মানুষের নিজস্ব পুজো থাকে? বিসর্জনের পর লোকে সম্প্রীতির কোলাকুলি করে, আর এবার বিসর্জনের আগে শেখানো হল সাম্প্রদায়িকতার হিপ হিপ হুররে! বাঙালি অবাক হয়ে দেখল, বাইরে থেকে এসে কেউ কেউ তাকে তার নিজের উৎসবের চরিত্র বোঝানোর চেষ্টা করছে। এ কোন কলকাতা?

সবচেয়ে মর্মান্তিক চোরবাগানের দৃশ্য। ঠাকুর দেখতে গিয়ে ১৯ জন মানুষের মৃত্যু। সরু রাস্তা, ভিড় নিয়ন্ত্রণের অভাব, নিরাপত্তার গাফিলতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে কিন্তু এত বড় দুর্ঘটনার পর শুধু তদন্তের আশ্বাস কি যথেষ্ট? রাতের দিকে ভিড় কমার পিছনে চোরবাগানও একটা কারণ। প্রধান কারণ নয়।

বই বিক্রি ঘিরে যাদবপুর থেকে বারাসতে যে সংঘাত হল, তা একইসঙ্গে মর্মান্তিক ও অবিশ্বাস্য। কোথাও বইয়ের দোকান সরাতে এল বুলডোজার, পুলিশ, কেন্দ্রীয় বাহিনী, পুরসভার গাড়ি। কোথাও বই ছিঁড়ে পাতা উড়িয়ে দেওয়া দেখতে হল বিজেপি ভক্তদের দৌলতে। সেখানে মুখ্যমন্ত্রী এক ধরনের কথা বললেন, তাঁর সভাপতি ও অর্থমন্ত্রী বললেন আলাদা কথা। বই বিক্রি নিয়েও শাসকের দু’রকম মন্তব্য। মণ্ডপের পাশে বই বিক্রি তো কলকাতার বহু পুরোনো ঐতিহ্য। মতাদর্শের লড়াইয়ে বইকেই কেন বারবার আক্রমণের লক্ষ্য হতে হবে?

ছোট থেকে দেখা, মফসসল বা গ্রামে একসঙ্গে সব প্রতিমা এনে বিসর্জনের শোভাযাত্রা হত। সেই স্টাইলেই কলকাতায় শুরু হয়েছিল কার্নিভাল। এই সরকার তো আগের সরকারের সব উদ্যোগ বাতিল করতেই উৎসাহী। তাই এবার কার্নিভাল হল না। অথচ মহালয়ায় বিপুল অর্থের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হল। অভিনেত্রীর বিসর্জনের গানের সঙ্গে নাচে বিসর্জনের আবহও তৈরি হয়ে গেল পুজো শুরুর আগেই। কী অদ্ভুত বৈপরীত্য! একদিকে উৎসবের স্বাভাবিক সমাপ্তির আয়োজন বন্ধ, অন্যদিকে উৎসব শুরুর আগেই জাঁকজমক। সরকার চোরবাগানের পর জাঁকজমক বন্ধের অনুরোধ করল, ওদিকে পার্ক স্ট্রিটে অভিনেত্রীদের এনে সিঁদুরখেলা-নাচের আয়োজন হল বিজেপি নেতার নতুন পুজোয়।

আরও যন্ত্রণার, বাঙালির দুর্গোৎসবের চেয়ে নবরাত্রি ও দশেরার গুরুত্ব বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠল। অন্য সংস্কৃতির উৎসব নিয়ে আপত্তি নেই। কিন্তু নিজের উৎসবের স্বকীয়তা যদি ক্রমশ চাপা পড়ে, উদ্বেগ হতে বাধ্য। বিজয়ার আগের দিনই এখানে জমজমাট দশেরা উৎসব সেরে ফেলা হল মন্ত্রী, আমলাদের উপস্থিতিতে। বহু জায়গাতেই বাঙালিয়ানার বিসর্জন দেখা গেল। উত্তরবঙ্গে বিসর্জনের দৃশ্যে লেগে থাকল মন খারাপের বার্তা। এভাবে প্রতিমা বিসর্জন করা যায়! এ তো মাকে ছুড়ে ছুড়ে ফেলা। সরকার বুঝল না, কলকাতায় ভরা গঙ্গায় যা হয়, অন্য শহরে সেই নিয়ম চলবে না।

কলকাতার দুর্গাপুজো কোনও সরকারের সম্পত্তি নয়। কোনও রাজনৈতিক দলেরও নয়। এই উৎসব গড়ে উঠেছে মানুষের আবেগ, শ্রম, স্মৃতি আর ভালোবাসায়। এখানে ঢাকির সঙ্গে মৃৎশিল্পীর, ফুলওয়ালার সঙ্গে রিকশাচালকের, পাড়ার ক্লাবের সঙ্গে ছোট দোকানদারের জীবন জড়িয়ে। পুজোর বাজার খারাপ হলে শুধু ব্যবসার ক্ষতি হয় না, বহু সংসারের স্বপ্নেও টান পড়ে।

এখানেই প্রশ্ন, পুজোর আনন্দ কি সরকারি নির্দেশে তৈরি করা যায়? কোটি কোটি টাকা খরচ করে অনুষ্ঠান হতে পারে, মঞ্চ হতে পারে, প্রচার হতে পারে। মানুষের মনে উৎসবের সেই অদ্ভুত শিহরন জাগানো যায় না। তার জন্য প্রয়োজন স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, নিশ্চিন্তে আনন্দ করার পরিবেশ।

পদ্মাপারের ছবিগুলো তাই এবার অন্য প্রশ্ন তুলল। সেখানকার উৎসব, উচ্ছ্বাসের কিছু ছবি যখন আমাদের আকর্ষণ করল, তখন নিজেদের শহরের হতাশার কারণগুলো খোঁজা জরুরি।

বিজয়ার পরে পিছনে ফিরে মনে হচ্ছে, দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড় বিপদ শুধু অর্থনৈতিক মন্দা নয়। বড় বিপদ, উৎসবের ওপর সাধারণের অধিকার ক্রমশ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা। যে পুজো একদিন ছিল বাঙালির মুক্ত আনন্দের ঠিকানা, সেখানে যদি রাজনীতি, নির্দেশ আর ক্ষমতার প্রদর্শনই প্রধান হয়, তা হলে উৎসবের প্রাণ বাঁচবে কী করে?

দুই বাংলার পুজো রেখে গেল এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন। পদ্মার ওপারে নতুন আনন্দের ছবি তৈরি হচ্ছে, এপারে আমরা কি ক্রমশ ভুলে যাচ্ছি, দুর্গাপুজো আসলে কার?

একটা কথা ভুলে গেলে মুশকিল। মণ্ডপ যত বড়ই হোক, আলো যত ঝলমল করুক, গেট সরু করে যত ভিড় দেখানো হোক, মানুষের মন থেকে পুজো হারিয়ে গেলে কোনও সরকারের সাধ্য নেই সেই উৎসব ফিরিয়ে দেওয়ার।

(লেখক সাংবাদিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *