প্রযুক্তির যুগেও সমান প্রাসঙ্গিক সংস্কৃত

ব্লগ/BLOG
Spread the love


প্রাচীন ঐতিহ্য ও আধুনিক বিজ্ঞানের মেলবন্ধনে ভারতের এই ভাষা আজ বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত।

শ্রেতা দে

ইদানীং সংস্কৃতকে প্রায়ই ‘মৃত ভাষা’ বলে ভুল করা হয়। ভাষাবিজ্ঞান মতে, নতুন প্রজন্ম যে ভাষা শেখে না বা দৈনন্দিন বলে না, তা-ই মৃত; যেমন ল্যাটিন। তবে ইজরায়েল হিব্রুকে পুনরুজ্জীবিত করেছে; ভারতের ২০১১ সালের জনগণনাও দেখাচ্ছে সংস্কৃতভাষী বেড়ে হয়েছে ২৪,৮২১ জন, যা ২০০১-এ ছিল ১৪,১৩৫ এবং ১৯৯১-এ ছিল ৪৯,৭৩৬। সংস্কৃত আজ গণমাধ্যমেও সক্রিয়। ১৯৭০ সাল থেকে মাইসুরু থেকে বেরোচ্ছে দৈনিক ‘সুধর্মা’। আকাশবাণীতে রোজ সকাল ৬:৫৫-তে ‘সংস্কৃত বার্তা’ এবং দূরদর্শনে সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন শো ‘বার্তাবলী’ সম্প্রচারিত হয়, যা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দ্বারা প্রশংসিত।

ডিজিটাল দুনিয়া ও আন্তর্জাতিক শিক্ষাঙ্গনেও এই ভাষার উপস্থিতি স্পষ্ট। সংস্কৃত ভাষায় একটি সক্রিয় উইকিপিডিয়া সংস্করণ রয়েছে। ২০২২ সালের মে মাস থেকে দেবনাগরী লিপিতে গুগল ট্রান্সলেটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে সংস্কৃত। কথ্য ভাষা শেখার অ্যাপ ‘লিটল গুরু’-র ডাউনলোড এক লক্ষ ছাড়িয়েছে এবং ইউটিউবে ‘সংস্কৃত ভারতী’ চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার প্রায় সাড়ে চার লক্ষ। দেশে মোট ১৮টি সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। বিশ্বজুড়ে জার্মানির বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং আমেরিকার হার্ভার্ড, ইয়েল ও কলম্বিয়া সহ ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত বিভাগ আছে। এমনকি ১৮৩২ সাল থেকে অক্সফোর্ডে ‘বোডেন চেয়ার অফ সংস্কৃত’ সচল রয়েছে।

আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ক্ষেত্রে সংস্কৃতের উপযোগিতা নিয়ে চর্চা চলছে। ১৯৮৫ সালে নাসা’র বিজ্ঞানী রিক ব্রিগস তাঁর একটি গবেষণাপত্রে সংস্কৃতের সুসংবদ্ধ ব্যাকরণিক কাঠামোকে কম্পিউটারভিত্তিক জ্ঞান-প্রতিনিধিত্বের (নলেজ রিপ্রেজেন্টেশন) ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় বলে উল্লেখ করেছিলেন। পাণিনির ‘অষ্টাধ্যায়ী’র প্রায় ৪,০০০ সূত্র আসলে এক একটি নিখুঁত অ্যালগরিদমের মতো, যা সম্পূর্ণ দ্ব্যর্থহীন। ইংরেজিতে ‘ব্যাংক’ শব্দের একাধিক অর্থ থাকলেও সংস্কৃতে ‘তট’ ও ‘বিত্তকোষ’ সম্পূর্ণ আলাদা, যা কম্পিউটারকে ভাষাগত বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত রাখতে সাহায্য করে। এই কাঠামোগত নির্ভুলতার কারণে আধুনিক প্রাকৃতিক ভাষা প্রক্রিয়াকরণে (এনএলপি) সংস্কৃতের গুরুত্ব বাড়ছে।

ভারতীয় সংবিধানের অষ্টম তফশিলের ২২টি সরকারি ভাষার অন্যতম সংস্কৃত উত্তরাখণ্ড ও হিমাচলপ্রদেশের দ্বিতীয় সরকারি ভাষা। ২০২০ সালের কেন্দ্রীয় আইনবলে দেশের তিনটি প্রধান সংস্কৃত প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় নবনির্বাচিত বিধায়কদের সংস্কৃতে শপথগ্রহণ জনমানসে এই ভাষার প্রতি নতুন আগ্রহ ও সম্মান বাড়িয়েছে। কর্ণাটকের মাত্তুর ও হোসহাল্লি এবং মধ্যপ্রদেশের ঝিরি গ্রামের বাসিন্দারা দৈনন্দিন জীবনে এই ভাষায় কথা বলেন। ‘সংস্কৃত ভারতী’ নামক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ১০ দিনের নিখরচায় ‘সম্ভাষণ শিবির’, সহজ পাঠ্যপুস্তক, নাটক ও গানের মাধ্যমে একে জনপ্রিয় করছে। আসলে সংকট ভাষার নয়, সংকট আমাদের প্রাচীন শিক্ষাপদ্ধতির। ক্লাসে শুধু ‘ঘটঃ ঘটৌ ঘটাঃ’ মুখস্থ করালেও বোঝানো হয় না যে এই ‘ঘট’ শব্দ থেকেই ‘ঘটনা’ বা ‘সংঘটন’-এর উৎপত্তি।

আমাদের পাঠ্যবইয়ে সংস্কৃত ভাষার প্রকৃত অবদান যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয় না। গীতার ‘কর্মণ্যেবাধিকারস্তে’ শ্লোকটি মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের সূত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়; কালিদাসের ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম’ কেবল প্রেমকাব্য নয়, নারীর আত্মমর্যাদার লড়াই ও দুষ্যন্তের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার সমালোচনা; আবার সুশ্রুতসংহিতায় প্লাস্টিক সার্জারি ও আর্যভট্টের শূন্যের ধারণার প্রাথমিক উল্লেখ পাওয়া যায়। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ (এনইপি) তাই সংস্কৃতকে কেবল ‘বিষয়’ না রেখে একটি প্রায়োগিক দক্ষতা ও ত্রি-ভাষা সূত্রের অধীনে ঐচ্ছিক ভাষা হিসেবে আধুনিক শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। মনে রাখা প্রয়োজন, সংস্কৃত কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের নয়, এটি জ্ঞানের ভাষা। একে শ্রেণিকক্ষের বাইরে এনে দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করার দায়িত্ব আমাদেরই; অন্যথায় আগামী প্রজন্ম হয়তো পাণিনির পরিচয়ই ভুলে যাবে।

(লেখক ত্রিপুরা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, ময়নাগুড়ির ভূমিকন্যা।)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *