দিল্লির দাপট বনাম দিদির দুর্গ : বাজি কার?

দিল্লির দাপট বনাম দিদির দুর্গ : বাজি কার?

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


সায়ন্তন চট্টোপাধ্যায়

শীতের সকালের কুয়াশা কাটতে না কাটতেই উত্তরবঙ্গের চা বাগান থেকে শুরু করে তরাই-ডুয়ার্সের জনপদ-সর্বত্রই এখন ধোঁয়া ওঠা চায়ের ভাঁড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ। অমিত শা গত সপ্তাহেই হুংকার ছেড়েছেন- ২১টি রাজ্যে পদ্ম ফুটলেও, বাংলা না পাওয়া পর্যন্ত মোদির মুখে নাকি আসল হাসি ফুটবে না। কথাতেই আছে, ‘দিল্লি বহুদূর’, কিন্তু বিজেপির জন্য কলকাতা যেন তার চেয়েও দুর্গম এক দুর্গ।

গত লোকসভা নির্বাচনে আশানুরূপ ফল না মেলায় গেরুয়া শিবিরের লক্ষ্য এখন ২০২৬-এর বিধানসভা। আর সেই ‘মহা-লড়াই’-এর সলতে পাকানো শুরু হয়ে গিয়েছে এখন থেকেই। কিন্তু প্রশ্ন হল, অমিত শা’র এই অশ্বমেধের ঘোড়া কি আদৌ বাংলার মাটিতে দৌড়াতে পারবে, নাকি ফের মুখ থুবড়ে পড়বে? সমীকরণটা খুব সহজ নয়। একদিকে মমতার পরীক্ষিত ‘ডাবল এম’ (মহিলা ও মুসলিম) সমীকরণ, আর অন্যদিকে বিজেপির তূণে ‘হিন্দুত্ব ও দুর্নীতি’র জোড়া ফলা। কার পাল্লা ভারী, তা মাপতে গেলে আবেগের চশমা খুলে বাস্তবের মাটিতে নামতে হবে।

মমতার ‘মাস্টারস্ট্রোক’ ও পলিটিকাল থিয়েটার

রাজনীতিতে ‘পারসেপশন’ বা ধারণা তৈরি করাটাই আসল খেলা, আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই খেলার ওস্তাদ জাদুকর। গত এক-দেড় বছরে সন্দেশখালির আগুন বা আরজি কর হাসপাতালের নারকীয় ঘটনা তৃণমূল কংগ্রেসের সাদা কাপড়ে কম দাগ লাগায়নি। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতিতে হেভিওয়েট নেতারা জেলে, ইডি-সিবিআইয়ের নিত্য আনাগোনা- সব মিলিয়ে শাসকদলের ভাবমূর্তি যখন কিছুটা কোণঠাসা, ঠিক তখনই মমতা খেললেন তাঁর তুরুপের তাস।

সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে সশরীরে হাজির হওয়া- এ কেবল আইনি লড়াই ছিল না, ছিল এক নিখুঁত ‘পলিটিকাল থিয়েটার’। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী নিয়ে তিনি আইনজীবীদের ভরসায় না থেকে সোজা প্রধান বিচারপতির এজলাসে। ফল? গোটা দেশের মিডিয়া দেখল, একজন মুখ্যমন্ত্রী নিজের রাজ্যের মানুষের ভোটাধিকার রক্ষায় কতটা মরিয়া। মুহূর্তে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ল ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগ্রেস’-এর ছবি। বিরোধীরা একে ‘গিমিক’ বা নাটক বলে উড়িয়ে দিতে পারেন, কিন্তু মমতার এই ‘স্ট্রিট ফাইটার’ ইমেজই তাঁকে বারবার অক্সিজেন জুগিয়েছে। ২০১৬-তে সারদা-নারদ কেলেঙ্কারি হোক বা ২০২১-এ ভাঙা পা নিয়ে হুইলচেয়ারে প্রচার- মমতা জানেন কীভাবে নিজেকে ‘আক্রান্ত’ এবং ‘বাংলার মেয়ে’ হিসেবে তুলে ধরে নেতিবাচক হাওয়া ঘুরিয়ে দিতে হয়।

লক্ষ্মীর ভাণ্ডার : অর্থনীতির ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ নাকি নির্বাচনি ঘুষ?

মমতার দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রটি হল- অর্থনীতি। না, কোনও ভারী শিল্প বা বড় চাকরির প্রতিশ্রুতি নয়, তাঁর বাজি ‘ডিরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার’ বা সরাসরি নগদ হস্তান্তরের রাজনীতি। মধ্যপ্রদেশে বিজেপির ‘লাডলি বহনা’ বা মহারাষ্ট্রে ‘মাঝি লড়কি বহিন’ যোজনা যদি গেমচেঞ্জার হতে পারে, তবে বাংলায় ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ কেন নয়? সাম্প্রতিক অন্তর্বর্তী বাজেটে রাজ্য সরকার লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের অনুদান বাড়িয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় ২.২ কোটি মহিলা এই প্রকল্পের সুবিধা পান। এর মধ্যে ২৯ লক্ষ তপশিলি জাতি এবং প্রায় ৫ লক্ষ আদিবাসী মহিলা। উত্তরবঙ্গের চা বলয় বা জঙ্গলমহলের আদিবাসী ভোটব্যাংক ধরে রাখতে এর চেয়ে বড় দাওয়াই আর কী হতে পারে? সঙ্গে যোগ হয়েছে বেকার তরুণদের জন্য ভাতার ঘোষণা।

কিন্তু মুদ্রার উলটো পিঠটাও দেখা দরকার। অর্থনীতিবিদরা প্রশ্ন তুলছেন, এই ‘দান-ছত্র’ রাজনীতির টাকা আসবে কোথা থেকে? মিড-ডে মিল, স্কুলের পরিকাঠামো বা পাড়ার রাস্তা সারাইয়ের টাকা কি তবে কমবে? ডিএ বা মহার্ঘ ভাতা নিয়ে সরকারি কর্মীদের ক্ষোভ এবং ঠিকাদারদের বকেয়া বিলের পাহাড়- এগুলো কি শেষমেশ বুমেরাং হবে না? বিরোধীরা বলছেন, এটা ‘নির্বাচনি ঘুষ’। কিন্তু অভাবের সংসারে মাস গেলে হাতে নগদ হাজার দেড়েক টাকা আসাটা গ্রামের গৃহবধূর কাছে গণতন্ত্রের থিওরির চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব। পেটের খিদে মিটলে তবেই তো মানুষ রাস্তার গর্ত দেখবে!

বিজেপির সংকট : সেনাপতি ছাড়া যুদ্ধ?

এবার আসা যাক বিরোধী শিবিরের কথায়। দিল্লি বা বিহার জয়ের টাটকা অক্সিজেন নিয়ে বিজেপি টগবগ করছে ঠিকই, কিন্তু বাংলার মাটি বড়ই পিচ্ছিল। বিজেপির সবথেকে বড় সমস্যা- মমতার বিপরীতে মুখ কে? শুভেন্দু অধিকারী নিঃসন্দেহে দাপুটে নেতা, বিধানসভায় মমতাকে চোখে চোখ রেখে কথা বলেন। কিন্তু দলের অন্দরের ছবিটা কি ততটা স্বচ্ছ? আদি বিজেপি বনাম নব্য বিজেপির (তৃণমূল থেকে আগত) ছাইচাপা আগুন কি নিভেছে? দিলীপ ঘোষের মতো লড়াকু পুরোনো কান্ডারিদের সঙ্গে শুভেন্দুর রসায়ন কি মসৃণ? রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার বা শমীক ভট্টাচার্যরা কি সেই ‘মাস লিডার’ বা জননেতা হয়ে উঠতে পেরেছেন, যা মমতাকে টেক্কা দিতে পারে? সেনাপতি ছাড়া যুদ্ধজয়ের স্বপ্ন দেখা আর দিবাস্বপ্ন- দুটো প্রায় একই।

বিজেপির বাজি মূলত তিনটি : ১) হিন্দু ভোট একজোট করা, ২) দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ, এবং ৩) বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের প্রতিক্রিয়া।

উত্তরবঙ্গ এবং সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ‘ডেমোগ্রাফিক ইমব্যালেন্স’ বা জনবিন্যাসের পরিবর্তন নিয়ে বিজেপির প্রচার বেশ জোরালো। কিন্তু মতুয়া ভোটব্যাংক, যা ২০১৯-এ বিজেপিকে ১৮টি আসন জেতাতে সাহায্য করেছিল, তা এখন দোলাচলে। সিএএ নিয়ে ধোঁয়াশা এবং শান্তনু ঠাকুরের পারিবারিক বিবাদ মতুয়াদের মধ্যে ফাটল ধরিয়েছে। তাছাড়া, ভোটার তালিকা সংশোধন করে বিজেপি যে ফায়দা তোলার আশা করছিল, মমতা সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে সেই চালে আগেই জল ঢেলে দিয়েছেন। নিজেকে সংখ্যালঘুদের একমাত্র রক্ষাকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন। রাজ্যের ৩০ শতাংশেরও বেশি মুসলিম ভোট তৃণমূলের পকেটে থাকাটা প্রায় নিশ্চিত, বিশেষ করে কংগ্রেস ও বামেদের সাইনবোর্ড-সর্বস্ব অবস্থায়। আইএসএফ বা হুমায়ুন কবীরের মতো নেতারা হয়তো মুর্শিদাবাদে কিছুটা ঢেউ তুলবেন, কিন্তু মমতার নৌকা ডোবানোর ক্ষমতা তাঁদের নেই।

উত্তরবঙ্গ বরাবরই বিজেপির শক্ত ঘাঁটি। কিন্তু অনন্ত মহারাজের মতো নেতাদের নিয়ে ধোঁয়াশা এবং চা বাগানের শ্রমিকদের পিএফ বা মজুরি নিয়ে ক্ষোভ বিজেপির পথের কাঁটা হতে পারে। অন্যদিকে, তৃণমূলের ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ উত্তরের আদিবাসী ও রাজবংশী মহিলাদের মধ্যেও জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২১-এ বিজেপি ৭৭টি আসন পেয়েছিল। সেখান থেকে সরকার গড়ার ম্যাজিক ফিগারে পৌঁছাতে গেলে তাদের প্রায় অসম্ভবকে সম্ভব করতে হবে। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা বা ‘অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি’ অবশ্যই আছে, কিন্তু মমতার বিরুদ্ধে ‘বিকল্প কে?’- এই প্রশ্নের উত্তর সাধারণ মানুষ এখনও স্পষ্টভাবে পাচ্ছে না।

আবেগের বাংলা, নাকি হিসাবি ভোটার?

শেষমেশ লড়াইটা দাঁড়াচ্ছে- মমতার ‘ক্যারিশমা ও ক্যাশ ট্রান্সফার’ বনাম মোদি-শা’র ‘হিন্দুত্ব ও জাতীয়তাবাদ’। বাঙালি কি ‘বহিরাগত’ তত্ত্বে বিশ্বাস করে দিদির পাশেই থাকবে, নাকি দুর্নীতির দাগ মুছে ফেলতে পদ্মফুলে বোতাম টিপবে?

পাড়ার ঠেকের আড্ডায় তর্ক চলতে থাকুক, তবে একটা কথা নিশ্চিত- অমিত শা যতই বলুন মোদির মুখে হাসি ফোটাতে বাংলা চাই, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু তাঁর দুর্গের প্রতিটি ইট কামড়ে পড়ে আছেন। ছাব্বিশের এই মহাযুদ্ধ শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার নয়, এটি বাংলার মনস্তত্ত্ব দখলের লড়াই। আর সেই লড়াইয়ে কে জিতবে, তা একমাত্র ‘জনতার আদালত’-ই বলতে পারে।

(লেখক সাংবাদিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *