পরিকাঠামো এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে শিক্ষকের অভাবে শিক্ষাক্ষেত্রে চূড়ান্ত অব্যবস্থার বিরুদ্ধে যখন দেশজুড়ে স্কুল পড়ুয়ারা পর্যন্ত আন্দোলনের পথে যাচ্ছে, তখন প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব তহবিল- পিএম কেয়ার ফান্ডে প্রায় সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এই বিশাল পরিমাণ অর্থের সিংহভাগ জমা হয়েছিল কোভিড সংক্রমণের সময়কালে।
বহু শিল্পসংস্থা প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে এই তহবিল গড়ার কাজে এগিয়ে এসেছিল। দেশবাসীর স্বার্থে কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরিজীবীরা নিজেদের একদিনের বেতনের অর্থ জমা করেছিলেন এই তহবিলে। দেশের বহু মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেদের সুবিধামতো এই তহবিলে দান করেছিলেন। সেই তহবিলের সঞ্চিত অর্থ কয়েক বছর ধরে পুষ্ট হয়েছে বটে, কিন্তু দেশবাসীর স্বার্থে তা ব্যবহার করা হয়নি।
সমাজকর্মী অঞ্জলি ভরদ্বাজ সর্বপ্রথম পিএম কেয়ার ফান্ডে সঞ্চিত অর্থ এভাবে অব্যবহৃত রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ২০২৪-’২৫ অর্থবর্ষে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত সুদ এবং অনুদানের অর্থে এই তহবিলে জমা পড়েছে প্রায় ১২৮০ কোটি টাকা। সে টাকার কিয়দংশ, মাত্র সাতাশি লক্ষের কিছু বেশি ব্যয় করা হয়েছে। বাকি সমস্ত টাকা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।
২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত এই তহবিলের জমা অর্থের এক পঞ্চামংশেরও কম খরচ করা হয়েছে দেশবাসীর স্বার্থে। তহবিলের অর্থ এভাবে পড়ে থাকা নিয়ে শুধু প্রশ্ন ওঠেনি, আরও বহুবিধ অভিযোগ উঠেছে এই তহবিলকে কেন্দ্র করে। এই তহবিলে বিদেশি যেসব অনুদান এসেছে, তার নির্দিষ্ট খতিয়ান মেলেনি। তথ্য প্রকাশে গোপনীয়তা বজায় রাখা নিয়েও তাই প্রশ্ন উঠেছে।
যদিও কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়ে দিয়েছে, এটি সরকারি তহবিল নয়। সুতরাং তহবিলের তথ্য প্রকাশে সরকারের কোনও দায়বদ্ধতা নেই। কিন্তু এই তহবিলে যেহেতু বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থার সামাজিক উন্নয়ন তহবিলের অর্থ এবং সরকারি কর্মীদের অনুদান জমা হয়েছে, সুতরাং সরকারের দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি অত সহজে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই তহবিলের অব্যবহৃত অর্থ প্রসঙ্গে ককরোচ জনতা পার্টির আহ্বায়ক অভিজিৎ দীপকে যে দাবিটি তুলেছেন, তা যথার্থ এবং যৌক্তিক। দেশের বিভিন্ন জনপদে শিক্ষার যে হাল সরকারি সমীক্ষায় প্রকাশিত হয়েছে, তা অতীব দুঃখের। অবস্থা এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, বিভিন্ন মফসসল এবং গ্রামের স্কুল পড়ুয়ারা পর্যন্ত বিক্ষোভে শামিল হয়েছে। বহু সরকারি স্কুলে পানীয় জলের বিন্দুমাত্র ব্যবস্থা নেই, প্রধানমন্ত্রী ঘটা করে স্বচ্ছ ভারত অভিযানের স্লোগান দিলেও বহু স্কুলে শৌচাগারের চিহ্নমাত্র নেই।
অভিজিৎ দীপকে একটি পরিসংখ্যান দিয়ে দাবি করেছেন, আজকের দিনে একটি অত্যাধুনিক স্কুল গড়ে তুলতে প্রায় সাড়ে আট কোটি টাকা খরচ হতে পারে। উক্ত তহবিলে সঞ্চিত অর্থ থেকে সারা দেশে প্রায় সাড়ে আট হাজার অত্যাধুনিক স্কুল গড়ে তোলা সম্ভব। নতুন স্কুল স্থাপনের প্রস্তাবে সরকারের অনাগ্রহ থাকলে সরকার অন্তত বর্তমান স্কুলগুলির হাল ফেরাতে এই তহবিলের অর্থের সদ্ব্যবহার করতে পারে।
যেসব স্কুলে এখনও পর্যন্ত শিশুদের মাথার ওপর ছাদ নেই, বসার বেঞ্চ নেই, স্কুলে যাওয়ার যানবাহন নেই, প্রয়োজনীয় শিক্ষক নেই, সেইসব স্কুলের অসুবিধা সরকার দূর করতে পারে। সমস্যা হল, সরকারের কাছে অর্থ থাকলেও তা পরিকল্পিতভাবে খরচ করার মানসিকতা অথবা দূরদৃষ্টি নেই। ক্ষমতা দখল করলেই হয় না, ক্ষমতার উপযুক্ত ব্যবহারের ওপরে নির্ভর করে সরকারের সাফল্য।
কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত, অবিলম্বে শিক্ষা ব্যবস্থার পরিকাঠামো সংস্কার করা। মনে রাখা দরকার, এখনও দেশের দরিদ্র, নিম্নবিত্ত এবং প্রান্তিক শ্রেণির পরিবারের সন্তানদের বৌদ্ধিক উন্নতি নির্ভর করে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর। সেই শিক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়।

