পিতৃতন্ত্র ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে নারীর আপসহীন লড়াইয়ের খতিয়ান, সঙ্গে কয়েকটি জরুরি প্রশ্ন।
মৌমিতা আলম
ক্লাসে অস্কার ওয়াইল্ড পড়ানোর সময় কথা প্রসঙ্গে ছাত্রীদের জিজ্ঞেস করলাম তারা তসলিমা নাসরিনকে চেনে কি না। কয়েকজন বেশ জোর গলায় জানাল চেনে। আমি অবাক হলাম। যে গ্রামে কেউ খবরের কাগজ নেয় না এবং সমাজের যে অংশ থেকে এই ছাত্রীরা আসে, তাতে সাংস্কৃতিক পুঁজি নেই বললেই চলে। সেখানে তসলিমার নাম জানাটা অবাক করার মতোই। তারপর নিজেকেই ভর্ৎসনা করলাম। আমি কী করে ভুলে গেলাম এই ছাত্রীরা সংখ্যালঘু পরিবারের নারী! উপমহাদেশের বহু মুসলিম পরিবারে প্রতিবাদী নারীদের এখনও তসলিমার নামেই নিন্দিত করা হয়।
তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। ক্রিকেট পাগল আমি দ্রাবিড় ও আজহারউদ্দিনকে নিয়ে কবিতা লিখেছিলাম। খালা অফিস থেকে ফিরে এলে আনন্দের সঙ্গে তা দেখাচ্ছিলাম। খালা হেসে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলেছিল, ‘এলা হেলেন নুরি আজাদ হবো নাকি!’ হেলেন নুরি মানে হেলেন খালা। বাড়ির লোকেরা কিংবা গ্রামের তথাকথিত ভদ্র মানুষেরা হেলেন খালাকে চরিত্রহীন মনে করত। খালার অপরাধ ছিল চারটি। প্রথমত তিনি নারী হয়ে লিখতেন, দ্বিতীয়ত তিনি ডিভোর্সি, তৃতীয়ত তিনি রাজনীতি করতেন ও তখনকার প্রবল পরাক্রমশালী শাসকদলের বিরুদ্ধে স্পষ্ট স্বর ছিলেন। তিনি কংগ্রেস করতেন। দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাসকদলের কাছে তিনি ছিলেন কুৎসার বিষয়বস্তু। হেলেন খালা ছিলেন খুব প্রতিবাদী। প্রথম ছড়া লেখার আগেই আমার হাতে এসেছিল তাঁর বই ‘খাঁটি ইস্পাতের তরবারি’। সেদিন প্রথম উপলব্ধি করি যে আমার চেনা কেউ কবি বা লেখক হতে পারে। আগে ধারণা ছিল লেখক মানেই পাঠ্যবইয়ের দূরের কেউ, যাকে বাস্তবে ছোঁয়া অসম্ভব।
জীবনের ঘাতপ্রতিঘাতে হেলেন খালার কথা ভুলে গেলেও আমার লেখালেখির সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে গিয়েছে। উত্তরবঙ্গ সংবাদে আমার প্রথম লেখা ছাপা হলে আত্মীয়রা বলতে লাগল, ও আরেকটা হেলেন। ততদিনে আরেকটি মিল খুঁজে পেয়েছিল অনেকে, দুজনেই আমরা ডিভোর্সি। হেলেন খালা মারা গিয়েছেন বছর তিনেক হল। অব্যবহৃত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে তাঁর ন্যুব্জ কাঠের ঘর। শেষ জীবনে কাঠ কুড়িয়ে চুলোয় রান্না করতেন। সেই রান্নার ঘর আর নেই। খোঁজ নিয়ে জানলাম তাঁর পাণ্ডুলিপি, লেখা বা বই কিছুই অবশিষ্ট নেই। মৃত্যুর পর ট্রাংক খুলে সবাই ভাবছিল অনেক টাকাপয়সা পাবে। কিন্তু কিছু না পেয়ে তাঁর লেখাভর্তি ট্রাংকটি আর কেউ সংরক্ষণের প্রয়োজন মনে করেনি। এভাবেই ইতি হয়ে যায় হেলেন খালার সব কাজের।
এখন হেলেন খালার জায়গা নিয়েছে তসলিমা নাসরিন। তসলিমার লেখা বাংলার মুসলমান পড়ুক আর না পড়ুক, তাঁর নাম ঘরে ঘরে একটি সামাজিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। মেয়ে মুখরা হলে, নিয়ম ভেঙে চলতে চাইলে বা প্রতিবাদী হলেই বলে, তসলিমা নাকি! প্রায়শই শুনি, ‘তসলিমা হইছে।’ তসলিমার নামে যখন আমাদের নিন্দিত হতে হয়, তখন তিনি আমাদের জন্য এক দৃঢ় স্বর হতে পারতেন। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, এক সময়ের সেই আপসহীন অবস্থান পরে আর একই ধারাবাহিকতায় দেখা যায়নি। এক ধরনের মৌলবাদের বিরোধিতা করতে গিয়ে অন্য প্রান্তের প্রশ্নে তিনি হয়তো যথেষ্ট উচ্চকণ্ঠ হতে পারেননি। সেই সময় তাঁর কণ্ঠে শোনা যায়নি দুই দেশের কাঁটাতারের মাঝে পুশব্যাকের ফলে বসে থাকা অসহায় কিশোরীর কথা, দুইদিন ধরে স্নান নেই খাওয়া নাই। সাহিত্যিকদের বেছে নিতেই হয় কঠিন পথ। কলম সোজা পথে চললে উপেক্ষিত থাকে সমাজের প্রান্তিকদের ভাষা ও লড়াই। এখানেই তসলিমা ক্ষমতার ভাষ্যের অংশ হয়ে ওঠেন, ফলে এপারের সংখ্যালঘু নারীদের কণ্ঠস্বর আর শোনা যায় না। তসলিমা, আপনি কি জানেন না আমাদের লড়াইটা যেমন পরিবার ও সমাজের পিতৃতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে, তেমনি বিলকিস বানোর ধর্ষকদের যারা মালা পরায় তাদের বিরুদ্ধেও? আপনি কি কলকাতায় দাঁড়িয়ে একবার প্রশ্ন তুলবেন পোয়াতি রুমি খাতুনের কথা? শুধুমাত্র ছয় ভাইবোন হওয়ার অপরাধে যাঁর নাম বাদ গিয়েছে ভোটার তালিকা থেকে। হেলেন নুরি আজাদ আপস করেননি। কিন্তু আপনি আপস করে নিয়েছেন।
আপনি শুনছেন, তসলিমা?
(লেখক প্রাবন্ধিক)

