ওই দুই সেরা দেশের জীবন্ত ফুটবল-গান

ওই দুই সেরা দেশের জীবন্ত ফুটবল-গান

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


আর্জেন্টিনীয়রা স্টেডিয়ামে বুকের রক্ত ঢেলে গান করেন, স্প্যানিশরা গান বাঁধেন বুদ্ধির খেলা ও শিল্পের নান্দনিকতায়।

রূপায়ণ ভট্টাচার্য

আমেরিকার অনেকগুলো শহর ঘুমিয়ে রইল অনেক সুর বুকে নিয়ে। মায়ামি, আটলান্টা, কানসাস সিটি, ডালাস, বোস্টন…। যেসব শহরে আর্জেন্টিনীয় ও স্প্যানিশরা গান গেয়ে বেরিয়েছেন জয়ের আনন্দে। শহরগুলো সেই সুর ভুলবে না কোনওদিন।

ওঁরা যখন গাইতেন, তখন স্টেডিয়ামের বিশাল ছাদটার নীচে হাজার হাজার মানুষের নিঃশ্বাস যেন থমকে দাঁড়াত এক মহাজাগতিক সুরের অপেক্ষায়। ফুটবল তো শুধু চামড়ার গোলকের পেছনে বাইশটা পায়ের দৌড় নয়। ফুটবল আসলে কান্নার সুর। বুকের ভেতর জমা হওয়া প্রাচীন দীর্ঘশ্বাস। আবার হঠাৎ ফেটে পড়া তীব্র আনন্দের অলৌকিক কোরাস।

বিশ্বকাপের মহাযজ্ঞে গ্যালারির সেই জনসমুদ্রে যখন দাঁড়িয়েছি, তখন কানে এসেছে দুটি ভিন্ন সুরের ধারা। একটি সুর অতলান্তিকের এপার থেকে ভেসে আসা আর্জেন্টিনার হৃদয়ের হাহাকার। অন্যটি ওপার থেকে আসা স্পেনের শান্ত, আত্মবিশ্বাসী জয়ের আবাহন। সুরের মহাসমুদ্রের অতন্দ্র সাক্ষীরা বলবেন, আর্জেন্টিনীয়রা অনেক বেশি শরীর দিয়ে গান করেন। হাত ক্রমাগত নাড়িয়ে। শরীরের জার্সি খুলে, সেটা শূন্যে উড়িয়ে।

ফুটবল মাঠে গান কিন্তু স্রেফ বিনোদন নয়। ক্লাব ফুটবলের গান অন্যরকম, দেশের জন্য গান আর এক রকম। এই গানগুলোর পেছনে থাকে এক গোটা দেশের ইতিহাস। তাঁদের না-বলা বেদনা। হারিয়ে ফেলা নায়কদের ফিরে পাওয়ার ব্যাকুলতা। মাঠের সেই সুরের আকাশ কখনও মেঘে ঢেকে যায়, কখনও আবার রোদ ঝলমল করে ওঠে।

আর্জেন্টিনা আর স্পেনের সমর্থকদের গানগুলোর কথা ইন্টারনেটে দেখলে বোঝা যায়, মানুষের ফুটবল-দর্শন কতখানি আলাদা। আর্জেন্টিনার গান মূলত তৈরি তাঁদের ফেলে আসা রাজনৈতিক লড়াইয়ের যন্ত্রণায়। দেশের অর্থনৈতিক মন্দার ক্ষত সেখানে স্পষ্ট। মৃত কিংবদন্তি, বিশেষ করে মারাদোনার প্রতি ঈশ্বরসম ভক্তি লুকিয়ে থাকে সেই সুরে। এখন সেখানে যুক্ত হয়েছে মেসিমন্ত্র। শুনলে মনে হবে, ফুটবল এক ধর্ম। আর গানগুলো সেই ধর্মের উপাসনা সংগীত।

স্পেনের গানগুলোর মূল সুর আবার আবর্তিত তাঁদের নিজস্ব আঞ্চলিক গৌরবের ওপর ভিত্তি করে। ঐতিহাসিক জয় আর এককাট্টা হয়ে স্পেনের গর্জন তুলে ধরার আকাঙ্ক্ষা থাকে সেখানে। সেখানে লড়াইয়ের চেয়ে শিল্পের উদযাপন বেশি প্রাধান্য পায়। তাঁরা সুর দিয়ে মাঠের চারপাশে এক অদৃশ্য প্রাচীর তুলে দেন।

মায়ামি বা আটলান্টায় বুয়েনস আয়ার্স থেকে উড়ে আসা নীল-সাদা সমুদ্রের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়েছিলাম। একদিন আমার দুইপাশে তখন হাজার হাজার আর্জেন্টিনীয় সমর্থক কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাগলের মতো লাফাচ্ছেন। তাঁদের গলার শিরাগুলো টানটান। চোখে জল।

তাঁরা গাইছিলেন সেই অমর গান, যা আজ আর্জেন্টিনার ফুটবলের জাতীয় সংগীত হয়ে উঠেছে—‘মুচাচোস’। গানের প্রতিটি শব্দে লুকিয়ে ছিল এক অদ্ভুত মায়া আর কান্নার সুর। সেই সুরে ছিল দিয়েগো মারাদোনার চলে যাওয়ার শূন্যতা। ছিল ডন দিয়েগোর স্বর্গ থেকে লিওনেল মেসিকে আশীর্বাদ করার রূপকথা।

সেই গানের লাইনে ভেসে উঠছিল এক গভীর সুর—
‘বন্ধুরা, এখন আমাদের মনে আবার স্বপ্ন ডানা মেলেছে,
আমরা আবার বিশ্বজয়ী হতে চাই,
আমরা চাই দিয়েগো স্বর্গ থেকে আমাদের দেখুক,
ডন দিয়েগো আর তাঁর স্ত্রী তোতার সঙ্গে মিলে,
যেন লিওনেলকে হাত নেড়ে আশীর্বাদ করেন।’

এই গান যখন হাজার হাজার মানুষের কণ্ঠে একযোগে সুর তোলে, তখন গ্যালারির বাতাস ভারী হয়ে আসে বিস্ময়ে। মনে হয়, ফুটবল মাঠ কোনও খেলার জায়গা নয়। ওটা আসলে এক পুণ্যভূমি। যেখানে মৃত মানুষেরা জীবিতদের সঙ্গে এসে হাত মেলান। এই গানটির সুর যেমন আমাদের বুকের ভেতরটা মুচড়ে দেয়, তেমনই আমাদের শেখায় কীভাবে সব হারিয়েও আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতে হয়। মেসির পায়ের জাদুতে মাঠ যখন কেঁপে উঠছে, তখন এই সুর যেন গোটা স্টেডিয়ামকে এক অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে ফেলেছিল। মেসিও স্বীকার করেন, দর্শকরা তাঁদের শক্তি ছিলেন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে।

সেই হাই ভোল্টেজ সেমিফাইনালের কথা ধরা যাক। আটলান্টার স্টেডিয়ামের আবহাওয়া বদলে গেল লহমায়। মাঠের লড়াই যেন আর শুধু খেলার বৃত্তে সীমাবদ্ধ থাকল না। আর্জেন্টিনার সুরের প্রতিটি ভাঁজে তখন মালভিনাস (ফকল্যান্ডস) যুদ্ধের শহিদদের কান্না আর এক তীব্র রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষা গর্জে উঠছিল। ম্যাচের পর প্লেয়ারদের হাতে যখন ‘লাসমালভিনাস সন আর্জেন্তিনাস’ (মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার) লেখা ব্যানার উড়ল, তখন মাঠের কোরাস আরও খ্যাপাটে। তাঁদের গলার নতুন গর্জন ছিল—
‘মালভিনাসের জন্য, দিয়েগোর জন্য,
আর লিওর শেষ বারের লড়াইয়ের জন্য!’

এই গান গ্যালারি থেকে টানেলের ড্রেসিংরুম পর্যন্ত এক লৌকিক জাদুর মতো ছড়িয়ে পড়ছিল। এর সঙ্গে ছিল আরও এক তীব্র স্লোগান, যা আক্ষরিক অর্থেই স্টেডিয়ামের মাটি কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। হাজার হাজার আর্জেন্টিনীয় স্রেফ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে সমতালে লাফাচ্ছিলেন আর গাইছিলেন—

‘যে লাফাবে না, সে ইংরেজ!’

আর্জেন্টিনার মানুষ যখন এই গানগুলো গান, তখন তাঁরা শুধু ফুটবল খেলেন না। তাঁরা যেন নিজেদের জীবনের সমস্ত হারিয়ে যাওয়া অধিকার ফিরে পাওয়ার লড়াই লড়েন। গ্যালারিতে ড্রামের সেই অবিরাম দ্রিমিদ্রিমি মনে করিয়ে দেয় মানুষের হৃৎস্পন্দনকে। সুরটা আস্তে আস্তে ওপরে ওঠে। তারপর হঠাৎ যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। হাজার হাজার মানুষ তখন একইসঙ্গে হাত নেড়ে কাঁদছে আর হাসছে। এই দৃশ্য যে দেখেনি, তাকে বোঝানো অসম্ভব। এই সুরের মায়া একবার বুকে ঢুকে গেলে আর বের করা যায় না।

এই স্টেডিয়ামেই আবার শুনেছি বিপরীত মেরুতে স্পেনের লাল জোয়ার। স্প্যানিশ সমর্থকদের গান আর্জেন্টিনার মতো এতটা কান্নাভেজা বা আবেগে থরথর নয়। বরং তা অনেক বেশি ছন্দময় আর রাজকীয়।

স্পেনের সমর্থকরা যখন গান ‘ভিভা এস্পানিয়া’ বা ‘ই সোই এস্পানিওল’, তখন মনে হয় এক প্রাচীন অভিজাত যুদ্ধজাহাজ বুক চিরে এগিয়ে আসছে। স্পেনের গানের মূল ভিত্তি তাঁদের খেলার নিজস্ব শৈলী। যাকে আমরা পাসিং ফুটবলের সুতো দিয়ে বোনা এক মায়াজাল বলতে পারি।

তাঁদের সুরে স্প্যানিশ সংস্কৃতির এক নিজস্ব সুবাস জড়িয়ে থাকে। সেখানে গান হয় কীভাবে তাঁরা পাসিং ফুটবলের সুতো দিয়ে প্রতিপক্ষকে বেঁধে ফেলেন। কীভাবে কাসিয়াস, জাভি বা ইনিয়েস্তার মতো নায়কেরা তাঁদের রাজমুকুট এনে দিয়েছিলেন। স্প্যানিশদের সুরের মধ্যে কোনও কান্নার হাহাকার থাকে না। বরং থাকে এক প্রবল আত্মবিশ্বাস। তাঁরা গান গেয়ে প্রতিপক্ষকে কুর্নিশ জানান। আবার একইসঙ্গে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করেন অতি নম্রভাবে।

স্পেনের গ্যালারিতে যখন ড্রামের আওয়াজ ওঠে, তখন মনে হয় যেন মাদ্রিদ বা বার্সেলোনার রাস্তায় ঐতিহ্যবাহী উৎসব চলছে। তাঁদের সুরের প্রতি ভাঁজে থাকে সুশৃঙ্খল আনন্দ। আর্জেন্টিনীয়রা যেখানে বুকের রক্ত ঢেলে গান করেন, স্প্যানিশরা সেখানে বুদ্ধির খেলা আর শৈল্পিক নান্দনিকতা নিয়ে গান বাঁধেন।

তাঁদের গানের কথাগুলো খুব সহজ কিন্তু গভীর। ‘আমরা লাল রঙের ঢেউ, আমরা এক সুতোয় গাঁথা স্পেনের প্রাণ।’ এই সহজ কথার পেছনে লুকিয়ে থাকে এক ঐতিহাসিক আভিজাত্য। তাঁদের সুরের ছন্দ যেন এক রাজকীয় নৃত্যের মতো। গ্যালারির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সেই ছন্দ ছড়িয়ে পড়ে তরঙ্গের মতো।

এই দুই সুরের মিলনমেলা যখন স্টেডিয়ামের বাতাসকে কাঁপিয়ে তোলে, তখন মনে হয় ফুটবল এক আশ্চর্য অনুবাদক। এক পাশে লাতিন আমেরিকার বুভুক্ষু আবেগ, ক্ষত আর দ্রোহ। অন্য পাশে ইউরোপের ধ্রুপদি আভিজাত্য। এই দুইয়ের দ্বন্দ্ব ও মিলনই তো ফুটবলের আসল সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্যকে ছুঁয়ে দেখার জন্য হাজার মাইল পথ হেঁটে আসা যায়।

বিশ্বকাপের সেই শেষ বাঁশি বাজার পর যখন মাঠের আলো একে একে নিভে আসছিল, তখন গ্যালারির ফাঁকা আসনগুলোর দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত শূন্যতা গ্রাস করেছিল। মনে হচ্ছিল, এই সুরগুলো তো বাতাসে ভাসতেই থাকবে। এই সুরগুলোর কোনও মৃত্যু নেই। আর্জেন্টিনার সেই আবেগের প্লাবন আর স্পেনের সুরের আভিজাত্য। সেই সুর, সেই কান্না আর সেই জয়ের আনন্দ চিরকাল বুকের ভেতর এক মায়াবী আলো জ্বেলে রেখে দেয়।

খেলা শেষ হয়ে যাবে রবিবার। বিশ্বকাপের ট্রফিও ইউরোপ বা লাতিন আমেরিকা চলে যাবে। কিন্তু গ্যালারির ধুলোয় মিশে থাকা সেই গানগুলো বাতাসে ঘুরে বেড়াবে বছরের পর বছর। স্টেডিয়ামগুলোকে শূন্যতার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা এক তীব্র যন্ত্রণা। তবু মনের গহিনে সেই ড্রামের আওয়াজ বাজতেই থাকে। সেই সুরগুলোই বাঁচিয়ে রাখে আমাদের। আমাদের নতুন করে ভালোবাসতে শেখায় ফুটবলকে।

(লেখক সাংবাদিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *