জ্ঞানেশ কুমারকে বিদায় কেন নয়?

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


(এসআইআর নিয়ে প্রশ্নের মুখে নির্বাচন কমিশনের ভিতরের আপত্তি ঘিরে বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ।)

সঞ্জিত সাহা

বহু বছর ভোট দেওয়ার পরেও ভোটার তালিকায় নিজের নাম না পাওয়া মানুষের কাছে গণতন্ত্র কোনও দার্শনিক ধারণা নয়। গণতন্ত্র তখন একটি প্রশ্ন : এত বছর ভোট দেওয়ার পর আজ আমাকে আবার প্রমাণ করতে হচ্ছে কেন যে, আমি এই দেশের নাগরিক, আমি ভোট দেওয়ার যোগ্য? নির্বাচন কমিশনের কাজের পদ্ধতি নিয়ে যখন ভেতর থেকেই আপত্তি ওঠে, তখন বিতর্ক আর বিরোধী দলের অভিযোগে সীমাবদ্ধ থাকে না।

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ চেয়ে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা দিয়েছিল। কংগ্রেসও তাঁর সরে দাঁড়ানোর দাবি তুলেছে। পদত্যাগ করবেন কি না, তা তাঁর সিদ্ধান্ত। কিন্তু কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন নেতৃত্ব তাঁর বিদায় চাইবে, এমন সম্ভাবনা কম। কারণ, ইস্তফার ব্যাখ্যা শুধু পদ খালি হওয়ার মধ্যে আটকে থাকে না। বিরোধীরা তাকে এসআইআর-এর রাজনৈতিক রায় বলবে; সরকারকে তখন একজন মুখ্য কমিশনারের কাজ নয়, দেশজুড়ে চালানো ভোটার তালিকা সংশোধন অভিযানের বিশ্বাসযোগ্যতাও রক্ষা করতে হবে।

অভিযানের ব্যাপ্তিই ঝুঁকি বুঝিয়ে দেয়। ২০২৫ সালের জুনে বিহার থেকে শুরু হওয়া নিবিড় সংশোধনের তিন দফায় ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া তালিকা থেকে ১৩.৩৭ কোটির বেশি নাম বাদ পড়েছে, আগের ভোটার তালিকার প্রায় ১৪.১ শতাংশ। খসড়া তালিকা শেষকথা নয়; দাবি ও আপত্তির পরে যোগ্য নাম ফেরানো যায়। কিন্তু এত বিপুল নাম প্রথমে বাদ পড়লে জরুরি হয় মানুষ সেই সুযোগ পাচ্ছেন কি না।

একটি সত্য দুই পক্ষকেই মানতে হবে। মৃত, স্থানান্তরিত বা একই ব্যক্তির একাধিক নাম বাদ দেওয়া প্রয়োজন। ভোটার তালিকা ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না। আবার জীবিত, যোগ্য ভোটারকে অনুমানের ভিত্তিতে প্রমাণের দীর্ঘ পথে ঠেলে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্রের খাতায় ভুল থাকতে পারে; সেই ভুলের মূল্য সাধারণ নাগরিক কেন তাঁর ভোট দিয়ে মেটাবেন? এসআইআর নিয়ে প্রকৃত তর্ক এই জায়গায়।

২৩ সেপ্টেম্বর দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধান তর্ককে নির্বাচন কমিশনের অন্দরমহলে নিয়ে গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি দশ মাসে অন্তত ১৪ বার নথিতে আপত্তি তুলেছেন। নতুন ভোটার নথিভুক্তির ফর্ম, তালিকার তথ্য নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় আধিকারিকদের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ক্ষমতা ছিল তাঁদের উদ্বেগ। তিন সদস্যের কমিশনে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার একা সিদ্ধান্ত নেন না। তাই দুই সহকর্মীর লিখিত বক্তব্যকে ব্যক্তিগত মতভেদ বলে সরিয়ে রাখার সুযোগ সীমিত।

ফর্ম ৬-এ নতুন ভোটারকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তাঁর, তাঁর বাবা, মা কিংবা ঠাকুরদা, ঠাকুমার নাম আগের সংশোধনের তালিকায় ছিল কি না। প্রথমবার ভোট দিতে আসা তরুণের কাছে পরিবারের পুরোনো ভোটার তালিকার ইতিহাস সহজলভ্য নয়। কমিশনার যোশি বিধি না বদলে প্রশ্নটি যোগ করার ক্ষমতা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন; সান্ধুও পরে পরিবর্তনটিকে অননুমোদিত ও বেআইনি বলে লেখেন। তাঁদের মতই চূড়ান্ত, এমন দাবি করা চলে না। কিন্তু কমিশনের নিজের সদস্যরাই যখন বিধিগত প্রশ্ন তোলেন, তখন উত্তর প্রয়োজন।

আরও প্রশ্ন আছে নতুন সফটওয়্যারে। স্থানীয় আধিকারিক নথি যাচাই করে নাম রাখার সিদ্ধান্ত নিলেও কম্পিউটার তাঁকে তা নথিভুক্ত করতে দেয়নি। গোয়ায় স্থানীয় আধিকারিকরা এই রকম ৯৭ জনকে যোগ্য মনে করেছিলেন, কিন্তু আগের বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ফেরানোর ব্যবস্থা সময়মতো না থাকায় ফেব্রুয়ারির চূড়ান্ত তালিকায় তাঁদের নাম ওঠেনি। গোয়ার দপ্তর জানিয়েছে, অনেকের নাম যোগ হয়েছে, বাকিদের আবেদন চলছে। তবু সময়মতো নাম না ওঠার ঘটনা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার সফটওয়্যারের অনুমতির অপেক্ষায় থাকা উচিত নয়।

পশ্চিমবঙ্গে বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের যাচাইয়ের পর বিধানসভা ভোটের ঠিক আগে ২৭.১৬ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টে কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে ২২.২১ লক্ষ মানুষ নাম ফেরানোর আবেদন করেছেন, ৮২ শতাংশ। পাশাপাশি রাখা ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার দাবিতেও ১৬.১০ লক্ষ আলাদা আপিল জমা পড়েছে। ওই আপিলকারীদের পরিচয় স্পষ্ট নয়। এত আবেদন মানেই যে বাদ পড়া প্রত্যেকের দাবি সঠিক, তা নয়। কিন্তু এত মানুষ সিদ্ধান্তটির বিরুদ্ধে দাঁড়ালে শুনানির গতি ও বিপরীত আপিলকারীদের পরিচয় সম্পর্কে পরিষ্কার হিসাব চাইতেই হবে।

কমিশনের বক্তব্যও মানতে হবে। তাদের মতে, আলোচনা চলাকালীন সদস্যদের ভিন্ন পর্যবেক্ষণ স্বাভাবিক; শেষপর্যন্ত সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মত হয়েছে। তবু প্রশ্ন থাকে : আপত্তি কীভাবে নিষ্পত্তি হল? ফর্মের হঠাৎ পরিবর্তনের আইনি ভিত্তি কী ছিল? আধিকারিকের সিদ্ধান্ত সফটওয়্যারে আটকে গেলে প্রতিকার কী? প্রকাশিত নথি থেকে কোনও নির্বাচনের ফল ইচ্ছাকৃতভাবে বদলানো হয়েছে বলেও কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অভিযোগ আর প্রমাণের দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি।

তা হলে পদত্যাগের প্রশ্নে সরকার কেন পিছু হটবে? কারণ, রাজনীতিতে ঘটনার চেয়ে তার ব্যাখ্যা অনেক সময় বেশি শক্তিশালী। জ্ঞানেশ কুমার সরে দাঁড়ালেও আইনের চোখে এসআইআর বাতিল হবে না, আগের কোনও নির্বাচনও আপনা থেকে অবৈধ হবে না। কিন্তু বিরোধীরা বলতে পারবে, যাঁর নেতৃত্বে সংশোধন হয়েছে, তিনিই বিতর্কের মুখে দায়িত্ব ছেড়েছেন। সেই যুক্তি আদালতে যথেষ্ট হোক বা না হোক, জনসভায় শক্তি পাবে। ক্ষমতাসীন দল সেই সুযোগ সহজে দেবে বলে মনে হয় না।

দ্বিতীয় কারণ, নজির। ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনের সময় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। কিন্তু মন্ত্রীর রাজনৈতিক দায়িত্ব আর মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সাংবিধানিক অবস্থান আলাদা। সংবিধানের ৩২৪(৫) অনুচ্ছেদে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির মতো প্রক্রিয়ায় অপসারণের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। সরকার যদি ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমার পর তাঁর বিদায় মেনে নেয়, ভবিষ্যতে অন্য সাংবিধানিক পদ ঘিরেও একই কৌশলের দাবি জোর পাবে। এটি সরকারের রাজনৈতিক হিসাব প্রভাবিত করবে।

সিজেপি ও কংগ্রেসের অবস্থানও এক নয়। সিজেপি জনমত তৈরি করছে, দেশজোড়া আন্দোলনের ঘোষণা দিচ্ছে। কংগ্রেস পদত্যাগের পাশাপাশি সংসদে অপসারণের প্রস্তাবের প্রস্তুতি নিচ্ছে; এপ্রিল মাসে ৭৩ জন বিরোধী সাংসদের দেওয়া একটি নোটিশও রাজ্যসভায় বিচারাধীন। আন্দোলন প্রশ্নটি জিইয়ে রাখতে পারে, কিন্তু সংসদীয় প্রক্রিয়ায় অভিযোগকে প্রমাণের কঠোর পরীক্ষায় যেতে হবে। শুধু সন্দেহকে রাজনৈতিক ভাষা দিলে চলবে না; কোন সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছিল, তার নথিভিত্তিক উত্তর আদায় করতে হবে।

আগামী ভারতীয় রাজনীতিতে সম্ভবত দুটি সমান্তরাল দৃশ্য দেখা যাবে। সরকার কমিশনের সর্বসম্মতির প্রমাণ সামনে রাখবে এবং বিরোধীদের অভিযোগের প্রমাণ চাইবে। বিরোধীরা আদালত, সংসদ ও জনসমাবেশে এসআইআর-এর পদ্ধতি নিয়ে চাপ বাড়াবে। সংঘাত দীর্ঘ হলে ভোটার তালিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের সংশয়ও বাড়তে পারে। সেটি কোনও দলের একার ক্ষতি নয়। জয়ী পক্ষও চায় জয় বিশ্বাসযোগ্য হোক; পরাজিত পক্ষও চায় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সন্দেহ না থাকুক।

জ্ঞানেশ কুমার থাকুন বা যান, কাজটি আসলে একই : দুই কমিশনারের আপত্তি কীভাবে নিষ্পত্তি হয়েছিল, ফর্ম ৬ কেন বদলানো হয়েছিল, সফটওয়্যারে কার কী ক্ষমতা এবং বাংলার বিপুল আপিলের নিষ্পত্তি কোথায় দাঁড়িয়েছে, তার যাচাইযোগ্য উত্তর প্রকাশ দরকার। পদত্যাগ রাজনৈতিক ঘটনা হতে পারে; স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব। আমার অনুমান, প্রথমটি ঠেকানোর চেষ্টা হবে। কিন্তু দ্বিতীয়টি এড়িয়ে গেলে সংকট মিটবে না। মানুষের আস্থা কোনও পদাধিকারীর স্থায়িত্ব দিয়ে মাপা যায় না; মাপা যায়, নাগরিকের সহজ প্রশ্নের জবাব প্রতিষ্ঠানটি কত সততার সঙ্গে দেয়, তা দিয়ে।

(লেখক শিল্পপতি)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *