বৃষ্টির জল পড়ে, যায় কোথায়? জলকষ্টে আমাদের ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা স্পষ্ট করছে ইজরায়েল ও সিঙ্গাপুর।
সায়ন্তন চট্টোপাধ্যায়
বর্ষাকাল মানেই অঝোর ধারায় বৃষ্টি আর জলে টইটুম্বুর নদীনালা। কিন্তু ২০২৬ সালের বর্ষার শেষে ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের পরিসংখ্যান রোমান্টিক ছবিতে জল ঢেলে দিয়েছে। বৃষ্টি স্বাভাবিকের চেয়ে কম হলেও, ভারতের আসল অসুখ বৃষ্টির অভাব নয়, জলের অসম বণ্টন। কোথাও প্রলয়ংকরী বন্যা, কোথাও এক ফোঁটা জলের জন্য হাহাকার। দেশে জল আছে, কিন্তু যেখানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেখানেই তা অধরা। আবহাওয়া দপ্তর মে মাসেই পূর্বাভাস দিয়েছিল, মধ্য, দক্ষিণ এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতে এবছর বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে কম হবে।
আশঙ্কার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে মহারাষ্ট্রে। সেপ্টেম্বরের শেষে সেখানে বৃষ্টির গড় ঘাটতি ছিল প্রায় ১৮ শতাংশ। কিন্তু এই গড় হিসাব দিয়ে ভয়াবহতা মাপা যায় না। রাজ্যের ৩৫৮টি ব্লকের মধ্যে ২৬৫টি, অর্থাৎ প্রায় ৭৪ শতাংশ এলাকা খরাপীড়িত। মারাঠওয়াড়ার অঞ্চল জলের অভাবে ধুঁকছে। হাহাকার শুধু মহারাষ্ট্রেই আটকে নেই। দক্ষিণ ভারতের বড় অংশ, বিহার, মেঘালয় এবং অন্ধ্রপ্রদেশের বেশকিছু এলাকাতেও বৃষ্টির চরম আকাল। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের ২১৮টি জেলা মাঝারি বা চরম মাত্রায় শুষ্ক। আনুষ্ঠানিকভাবে খরার ঘোষণা না হলেও পরিস্থিতির গভীরতা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই।
বিপদের সংকেত দিচ্ছে দেশের জলাধারগুলোর অবস্থা। ১৬৬টি বড় জলাধারের জলের স্তর গত বছরের তুলনায় তলানিতে, দক্ষিণ ভারতে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। জলাধারকে কি শুধু বৃষ্টির জল জমিয়ে রাখার কংক্রিটের ট্যাংক হিসেবে দেখব, নাকি আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত জল ব্যবস্থাপনায় নজর দেব? ইজরায়েল ও সিঙ্গাপুরের ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে ভারতের মিল না থাকলেও, তাদের জল বাঁচানোর প্রযুক্তি ও সদিচ্ছা থেকে শেখার আছে। ইজরায়েল জলকষ্টকে প্রযুক্তির সাহায্যে কার্যত জয় করেছে। সেদেশে ব্যবহৃত বর্জ্য জলের ৯৪ শতাংশ সংগ্রহ করে বৈজ্ঞানিক উপায়ে শোধন করা হয় এবং তার ৮৭ শতাংশ কৃষিকাজে পুনর্ব্যবহার করা হয়। ফলে গত দুই দশকে সেখানে কৃষিতে পরিষ্কার পানীয় জলের ব্যবহার প্রায় অর্ধেক হয়েছে। ভারতের খরাপ্রবণ এলাকাগুলোর জন্য এই মডেল কার্যকর হতে পারে। খরা হলেই ত্রাণের প্যাকেজ ঘোষণা বা নতুন জলের উৎস খোঁজার বদলে বিন্দু সেচ, শোধিত জলের পুনর্ব্যবহার এবং কম জলে চাষযোগ্য ফসলের দিকে নজর দেওয়া দরকার।
অন্যদিকে, সিঙ্গাপুরের উদাহরণ অনন্য। সামান্য জমি ও প্রাকৃতিক মিষ্টি জলের উৎস না থাকা সত্ত্বেও, তারা নিজেদের জমির দুই-তৃতীয়াংশকে বৃষ্টির জল সংগ্রহের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করে। আট হাজার কিলোমিটারেরও বেশি নালা ও খালের মাধ্যমে বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা ধরে জলাধারে পাঠায়। এর সঙ্গে রয়েছে বর্জ্য জলের পুনর্ব্যবহার এবং সমুদ্রের জল লবণমুক্ত করার প্রযুক্তি। ভারতের মতো বিশাল ও বৈচিত্র্যময় দেশে এই মডেল হুবহু নকল সম্ভব নয়, তবে যেখানে বৃষ্টি পড়ে সেখানেই জল ধরে রাখা, শোধন, পুনর্ব্যবহার ও বিকল্প উৎস তৈরির নীতি গ্রহণে বাধা নেই। ২০১৫-’১৬ সালের ভয়াবহ খরার সময় পরপর দু’বছর বৃষ্টি না হওয়ায় কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার জলাশয় সংস্কার, বৃষ্টির জল সংরক্ষণ এবং বিন্দু সেচে জোর দিয়েছিল। কেন্দ্রীয় জল কমিশনও বৃষ্টির জল ধরে রাখার পরিকাঠামো এবং কিছু এলাকায় নদী সংযুক্তিকরণের কড়া সুপারিশ করেছিল। ২০২৬ সালের এই রুক্ষ পরিস্থিতিতে সেই শিক্ষাগুলি কাজে লাগাতে হবে। ফসলের ক্ষতিপূরণ ও কৃষকদের সাহায্য জরুরি, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে খরা হলেই ত্রাণ বিলির সস্তা রাজনীতি ও সংস্কৃতি থেকে বেরোতে হবে।
সময়ের দাবি, ভারতের প্রতিটি জেলার জন্য স্থায়ী ‘জল-হিসাব’ তৈরি করা। কত বৃষ্টি হচ্ছে, কত জল সঞ্চয় হচ্ছে, ভূগর্ভস্থ জলের স্তর কতটা বাড়ছে, কৃষিতে কত জল অপচয় হচ্ছে এবং কত বর্জ্য জল পুনর্ব্যবহার করা যাচ্ছে, তার চুলচেরা হিসাব প্রশাসনের কাছে বাধ্যতামূলক। লক্ষ্য সরল ও বাস্তবসম্মত : জল বেশি থাকলে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ, কম থাকলে মেপে ব্যবহার, ব্যবহৃত জলকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করা এবং উদ্বৃত্ত জল প্রযুক্তির সাহায্যে ঘাটতি এলাকায় পৌঁছে দেওয়া। ইজরায়েল ও সিঙ্গাপুরের শিক্ষা, জলকে শুধু আকাশ থেকে পড়া বৃষ্টির আশীর্বাদ নয়, গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরিকাঠামো হিসেবে দেখতে হবে। তবেই জলকষ্টের স্থায়ী মোকাবিলা সম্ভব। নইলে প্রতি বছর ভরা বর্ষাতেও গলা শুকোবে, আর নিজেদের অপদার্থতা ঢাকতে আমরা প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার দিকেই আঙুল তুলব।
(লেখক সাংবাদিক)

