চোর পালালে পিএইচডি বাড়ে

চোর পালালে পিএইচডি বাড়ে

শিক্ষা
Spread the love


মৈনাক ভট্টাচার্য

‘যাক বাবা, চোরটা অবশেষে বিদায় হয়েছে।’ ভাবতে ভাবতে পটাশকুমার পাকড়াশি ফুরফুরে মেজাজে বিছানায় হাত-পা ছড়িয়ে প্রথমে কিছুক্ষণ বেশ জম্পেশ করে আড়মোড়া ভাঙলেন।

ওহ, জেগে ঘুমোনোটা তো আর চাট্টিখানি কাজ নয়! আজকাল অবশ্য তিনি চোর-ছ্যাঁচড়কে মোটেও ভয় পান না, বরং চোর এলে মনটা কেমন যেন ফুরফুর করে ওঠে। তবে সেটা চোরেদের হঠাৎ করে এমন সম্মাননীয় বাজার বলে নয়। পটাশবাবুর এখন রিসার্চের বিষয় ‘চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে’ এবং তথ্যের পুরোটাই চোরবাবাজির কৃতকর্মের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে। চোর ঘরে ঢুকলে তাই মটকা মেরে শুয়ে থাকাটা মূলত গিন্নি কঙ্কাবতীর পরোক্ষ দায়েই পড়ে। ঘুমে হোক কিংবা জাগরণে, ঘরে চোর আর আরশোলার অস্তিত্ব সামান্য টের পেলেই কঙ্কাবতীকে এক বিচিত্র বোবায় ধরে। সেই বোবা গোঙানির অবুঝ শব্দ আরশোলার সংবেদনশীল নেটওয়ার্কে ধরা না পড়লেও চোরের সূক্ষ্ম কান এড়াতে পারে না। ভাষা ডিকোড করতে না পারায় চোরবাবাজি প্রতিবার চুরি-টুরি ফেলে একেবারে যাকে বলে পগারপার। এই ‘থেফ্ট অ্যালার্ম’-টাই নাকি আবার পটাশগিন্নির পরম অহংকার, কিন্তু তাতে যে পটাশবাবুর রিসার্চের বারোটা বেজে যাচ্ছে, সেটা কঙ্কাকে বলেন কী করে! বিষয়টি এখনও তিনি গিন্নির কাছে খোলতাই করার সাহস পাননি।

অথচ, সমাজের আর পাঁচটা গড়পড়তা গৃহজীবীর মতো পটাশকুমারের সঙ্গে কঙ্কার বিয়েটা হয়েছিল দুই বাড়ি থেকে সম্বন্ধের নিখুঁত মাপজোখ করেই। পাকা দেখা পর্বে পাত্র শান্ত প্রকৃতির এবং সরকারি উচ্চমাধ্যমিক স্কুল শিক্ষক শুনে বাবা-মায়ের কাছে হিরের টুকরো ছেলে মনে হলেও, কঙ্কাবতীর ওই ‘পটাশকুমার’ নামটিতেই প্রথম থেকে ছিল যত আপত্তি। কঙ্কা বাবাকে সেটা সোজাসাপটা জানিয়েও দিয়েছিল, ‘নামটা শুনলেই কেমন যেন সুকুমার রায়ের কুমড়োপটাশ কুমড়োপটাশ মনে হচ্ছে বাবা! বিয়ের পর সবাই ওই নিয়ে হাসাহাসি করবে। আমি এই ছেলেকে বিয়ে করতে পারব না।’

বাবা উত্তরে মেজাজ সপ্তমে চড়িয়ে শাসিয়ে দিয়েছিলেন, ‘সোনার আংটি, তার আবার বাঁকা! নামে কী এসে যায়। আর জীবনের কতটুকু বোঝো তুমি?’ এমন হুংকারের পর কঙ্কার কোনও ওজর-আপত্তিই খাটেনি। ওই গড়পড়তা আর দশটা মেয়ের মতো শেষ পর্যন্ত মনে না নিলেও মেনে নিতে হয়েছিল। কথাটা পটাশকুমারের কানে পৌঁছাতেও সময় লাগেনি। নাম নিয়ে সে নিজেও যে কখনও বিব্রত বোধ করেনি তা নয়। তাই বলে এমন রজনীগন্ধার ম-ম গন্ধে, বিয়ের ফুলশয্যাতেই পোকা পড়বে! বাসর রাতে আংটি নাড়তে নাড়তে সোহাগ ভরা আলিঙ্গনে পটাশকুমার অভিমানের সুরে সত্যতা যাচাই করতে চাইলে কঙ্কাই প্রস্তাব দিয়েছিল, ‘ওসব থাক। নাম রাখায় তোমার কী দোষ? তবে তুমি তো এমএ করেছ, ডক্টরেটটা এখনও করোনি কেন? নামের সামনে ডক্টর লিখলেই তো রত্নধারণে রাহুর দশামুক্তির মতো এই দোষ কাটিয়ে নিজেকে কেমন সুন্দর ডক্টর পিকে করে ফেলতে পারো।’

নববধূর বুদ্ধির এই তীক্ষ্ণতা ফুলশয্যার রাতেই চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল পটাশকুমারের। সেই বুদ্ধির আস্থায় এবং নববধূর অনুপ্রেরণায় বিছানাতেই ডক্টরেট করবার শপথও করে ফেললেন পটাশকুমার। পটাশবাবু জানেন, প্রতিবেশী নারু সামন্তের নামের ডগার ডাক্তার অলংকারটি তাঁর বাড়ির গেটের ইংরেজি নেমপ্লেটে সযত্নে সাঁটা। সেদিন নারু মাস্টারকে জ্যাকিদার চায়ের দোকানে একা পেয়ে প্রশ্নটা উঠিয়েই ফেললেন। বাইরে থেকে আপাত অহংকারী মনে হওয়া সামন্তমশাই বেদনা উপশমের সমব্যথী পেয়ে চায়ের ভাঁড় হাতে নিয়ে কেঁদেই ফেললেন, ‘আর বলবেন না মশাই, গিন্নির আবদারে আমাদের এই আধা-গঞ্জ অঞ্চলে নিজের ডক্টরেট ডিগ্রির অহংকারে নেমপ্লেট তো লাগিয়ে দিলাম। ক’দিন পর থেকেই সমস্যা। লোকে রাতবিরেতে রুগি নিয়ে এসে, নাছোড়বান্দা হয়ে হুজ্জতি করতে শুরু করল ওষুধ দেওয়ার জন্য। অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তবে ছাড়া পেতাম।’

‘তারপর?’ পটাশবাবু জানতে চাইলেন।

নারুবাবু বললেন, ‘তারপর আর কী, ওই বলে না— চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে। তখন আমার উভয় সংকট। একদিকে গিন্নির সোশ্যাল স্ট্যাটাস বলে কথা, না পারি সাধের ডক্টরেট ডিগ্রিকে গেট থেকে বিসর্জন দিতে, না পারি ঝামেলামুক্ত হতে। শেষ পর্যন্ত কী মনে হল, নামের শেষে ব্র্যাকেট দিয়ে নিপাট বাংলায় বৈষ্ণব পদাবলিটা দিলাম জুড়ে। কাজও হল মশাই ম্যাজিকের মতো। যাঁরা ওই রাতবিরেতে রুগি নিয়ে উপদ্রব করতেন, তাঁরাই হয়তো ভাবলেন এই বৈষ্ণব পদাবলিটি হয়তো বা হোমিওপ্যাথি, কবিরাজি কিংবা ইউনানির মতো দেশজ কোনও চিকিৎসা পদ্ধতি হবে, যার ওপর ঠিক ভরসা না থাকলে চিকিৎসাটা না করানোই শ্রেয়।’

সামন্তমশাইয়ের সেই পদাবলি সংমিশ্রণের ভেতরেও তাঁর গিন্নির হাতছায়ার নির্যাস পেয়ে পাকড়াশিবাবুর মগজে ‘দিমাক কা বাত্তি’টা দপ করে জ্বলে উঠল। এমন পরিস্থিতিতে সোনায় সোহাগা জ্যাকিদার এক খুরি কড়া চা। আহা, এমন উপচার পেটে পড়তেই মাথায় সব কিছু ঠেলেঠুলে বেরিয়ে এল ওই চোর পালিয়ে বুদ্ধি বাড়ানোর মতো দেশজ আইডিয়াটা— ‘ইউরেকা! এই বিষয় নিয়েই তো রিসার্চ করা যায়।’ সামন্তবাবুকে বলতেই তিনি উচ্ছ্বসিত, ‘আরে বাহ! শুরু করে দিন মশাই। নামটার ভেতরে একটা সরল মেক ইন ইন্ডিয়ার ছোঁয়া আছে। অথচ তথ্য জোগাড়ের কোনও হ্যাপা নেই। একে তাকে ধরে তদ্বিরের দরকার নেই, রেফারেন্সের তাগিদে লাইব্রেরি বা ইন্টারনেটের প্রয়োজন নেই। তার ওপরে আবার পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনা, ওয়ার্ক ফ্রম হোম না বলে ওয়ার্ক ফ্রম বেড বললেও অত্যুক্তি হয় না। চিন্তা করবেন না, মেন্টর আমি ঠিক করে দেব।’

কাজ শুরুর কিছুদিন পর, বেটার হাফের সঙ্গে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করতে যেতেই তিনি তো রেগেমেগে একেবারে বিটার হাফ, ‘তুমি একটা বুদ্ধির ঢেঁকি! খেয়েদেয়ে কাজ নেই, বারে বারে বাড়িতে চোর আসছে, জিনিসপত্র নিয়ে যাচ্ছে, কোনও হেলদোল নেই। আর তুমি ওই করো বসে বসে!’ এতটা এগিয়ে এখন তো আর পেছানো যায় না। কঙ্কার ধমক খেয়ে পাকড়াশিবাবু কেমন যেন মিইয়ে গেলেন।

সে যাক গে, নিজের কাজ নিজেকেই করতে হবে। চোরবাবাজি কাজ সেরে পালিয়েছেন, তাই এখন পটাশ পাকড়াশির বিস্তর হ্যাপা। প্রথমে বুদ্ধিটা মাপতে হবে। প্রতিবার এভাবে মাপতে গিয়ে তাঁর অবশ্য খুব রাগও হয়, ‘কী যে মানুষ বিজ্ঞানের অগ্রগতি নিয়ে এত বড়াই করে, সুগার-প্রেশার মাপার যন্ত্রের মতো একটা বুদ্ধিমিটার যন্ত্রই এখনও কেউ আবিষ্কার করে উঠতে পারল না যে কবজি কিংবা মাথায় লাগালেই চড়চড় করে মিটারের কাঁটা জানান দেবে বুদ্ধিটা বাড়ল না কমল।’ পটাশবাবুকে তাই এখনও বুদ্ধি মাপতে ওই দেশজ পদ্ধতির ভরসাতেই থাকতে হয়। সেই মাপটাও কি কম ঝামেলার! দেখতে হবে চোরবাবাজি কী নিতে পারলেন আর কী নেওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নিতে পারলেন না। তারপর সেই জিনিসের গড় ডেপ্রিসিয়েশন, বর্তমান বাজারদর ইত্যাদি বিশ্লেষণের থেকে হিসেব কষে বুদ্ধিটা মাপতে হয়। একেবারে বিশুদ্ধ ব্যাকরণ। থিসিস পেপার তৈরি করে তবেই তিনি মেন্টরের কাছে যাবেন। চোর যত বেশি চুরি করবে আর পালাবে— তত তথ্য, মারো গুলি কঙ্কাবতী দর্শন।

প্রায় সাতশো পাতার মিশন বুদ্ধিবৃদ্ধির ‘চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে’র বিশ্লেষণের থিসিস পেপার নিয়ে নারু সামন্তের পরামর্শে মেন্টর অধ্যাপক নটহরি দাসের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন পটাশকুমার পাকড়াশি। দাস স্যর সব শুনে সাতদিন সময় নিলেন পড়ে দেখে জানাবেন বলে।

সাতদিন পর থিসিসের উচ্চ প্রশংসায় পটাশবাবুকে ভরিয়ে দিতে দিতে নট স্যর বললেন, ‘জব্বর লিখেছেন ভায়া! একদম ফাটাফাটি বিষয়। তবে আমি যা হিসেব দেখলাম আপনার বাড়িতে মোট পনেরোটা চুরির অ্যাটেম্পট, তিনটা ফেল। বারোটা চুরির তথ্য বলছে চোর তো আপনার সোনা-গয়না, টাকা-পয়সা, বাড়ির অস্থাবর যাবতীয় মিলিয়ে প্রায় লাখ ত্রিশেক হাতিয়ে চলে গেছে। কী দরকার ছিল এত খাটুনির? আমাকে লাখ পাঁচেক দিলেই আমি সমস্ত তথ্য দিয়ে থিসিস তৈরি করে দিতে পারতাম। সে এখন আর কী করা যাবে।’

পাকড়াশিবাবু পাংশু মুখে অধ্যাপক স্যরের কথাটার আর্থিক হিসেব কষে তখন শুধু ভাবছেন সত্যিই তো— ‘চোর পালালে, বুদ্ধি বাড়ে।’



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *