সুশান্ত সরকার
‘ময়না রে তোর লম্বা মাথার কেশ’ গানটি সুন্দর চুলের বাহার বর্ণনা করে। কিন্তু এই চুল বা কেশ থেকেই আজ যে একটি মারণ রোগের সৃষ্টি হয়েছে তা হয়তো অনেকেরই জানা নেই। এর নাম ‘গ্যাস্ট্রিক ট্রাইকোবেজোয়ার’। আমরা হয়তো অনেকেই ভাবি, চুল মুখে দিলে কোনও সমস্যা নেই। মুখে দিয়ে চুল গিলে ফেললেও বা ক্ষতি কী? কিন্তু এতেই একটা বড়সড়ো বিপদ লুকিয়ে রয়েছে।
‘গ্যাস্ট্রিক ট্রাইকোবেজোয়ার’ হল একটি বিরল রোগ যেখানে পাকস্থলীতে চুলের একটি ‘কমপ্যাক্ট’ বা দলা তৈরি হয়। এটি মূলত মানুষের গিলে ফেলা চুল থেকে সৃষ্টি হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই চুল পাকস্থলীতে পিণ্ডের আকার ধারণ করে। চুল হজমযোগ্য নয়। এছাড়া মসৃণ প্রকৃতির হওয়ার কারণে নড়াচড়ার মাধ্যমে বের হতে না পেরে পাকস্থলীর ভাঁজে আটকে থেকে যায়। অনেকে এসব ক্ষেত্রে রোগের লক্ষণই অনুভব করতে পারে না। পরে চুলের পিণ্ড যখন বড় হয় তখন পেটব্যথা বা অস্বস্তি, বমি বমি ভাব, খিদে কমে যাওয়া, ওজন হ্রাসের মতো বেশকিছু লক্ষণ দেখা যায়। অনেক সময় বিরল ক্ষেত্রে এই চুলের দলা অন্ত্রে গিয়ে প্রসারিত হয়ে ‘রাপুনজেল সিনড্রোম’ নামে এক জটিল রোগের সৃষ্টি করতে পারে। চিকিৎসার মাধ্যমে এটিকে পেট থেকে অপসারণ করা যায়। কিন্তু দলাটা যদি অনেকটা বড় হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারই নিরাময়ের একমাত্র উপায়। অস্ত্রোপচারে কাজ না হলে অনেক সময় এই গ্যাস্ট্রিক ট্রাইকোবেজোয়ার কাউকে কাউকে মৃত্যুর মুখে পর্যন্ত ঠেলে দিয়েছে। তবে এটা মাথায় রাখা প্রয়োজন যে, গোটা বিষয়টি খুব সাধারণ মনে হলেও এটি কিন্তু মোটেও সাধারণ রোগ নয়। নানা ক্ষেত্রে প্রথম প্রথম তো সমস্যার কারণ নির্ণয় করাও অসুবিধাজনক হয়ে দঁাড়ায়। একের পর এক পরীক্ষা করে তবেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রোগের মূলে পৌঁছাতে সমর্থ হন।
অনেকে হয়তো চুপচাপ স্বভাবের এবং একা একা নিজে থাকতে ভালোবাসেন। কিন্তু তাঁর একটা অদ্ভুত অভ্যাস চুল টানা এবং চুল মুখে দেওয়া। তাঁদের এই অভ্যাসকে ‘বাতিক’ ভেবে একদমই অবহেলা করা উচিত নয়। এর পিছনে তাঁর গভীর কোনও মানসিক যন্ত্রণা বা অবসাদ থাকতে পারে। সেটা আবার পরে কোনও মানসিক ব্যাধিও হয়ে যেতে পারে। এই উপসর্গ ‘ট্রাইকোফ্যাগিয়া’ নামে পরিচিত। আবার চুল ছেঁড়ার প্রবণতাটি ‘ট্রাইকোটিলোম্যানিয়া’ নামে পরিচিত, যা অল্পবয়সি মেয়েদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এক্ষেত্রে তাকে উলটোপালটা বলে লজ্জায় ফেলার বদলে বরং সহানুভূতি দিয়ে তার পাশে দাঁড়ানো উচিত। তাদের মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন। সময়মতো সাবধান না হলে, চুল টেনে মুখে দেওয়ার মতো নিরীহ এক প্রবণতা মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।
(লেখক শিক্ষক। ঘোকসাডাঙ্গার বাসিন্দা)
