(পুষ্টি সপ্তাহ চলছে। এই সময় উত্তরবঙ্গের চা বাগানের শিশুদের নিয়ে নতুন ভাবনায় অনেক সমস্যা মিটতে পারে।)
শেখর সাহা
উত্তরবঙ্গে বেড়াতে এলে আমাদের চোখে প্রথমেই ধরা পড়ে সবুজ। প্রচুর। পাহাড়ের ঢালে সারি সারি চা বাগান, সকালের কুয়াশা, দূরে নীল পাহাড়, কোথাও জঙ্গলের ছায়া, যেন প্রকৃতির আঁকা এক বিশাল ছবি। সেই সৌন্দর্যের টানে আমরা দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসি, ছবি তুলি, চায়ের কাপে চুমুক দিই, সৌন্দর্যের গল্প করি। কিন্তু এই ছবির আড়ালে রোদবৃষ্টি মাথায় নিয়ে দিনের পর দিন কাজ করা মানুষগুলির জীবনের ছবিটা কি আমরা কখনও সেভাবে খতিয়ে দেখি?
যে মা ভোরে ঝুড়ি কাঁধে চা বাগানে চলে যান, তাঁর শিশুটি তখন কী খেয়ে দিন শুরু করছে? সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে সন্তানের পাতে শুধু পেট ভরানোর খাবার, নাকি শরীর গড়ার প্রয়োজনীয় পুষ্টিও আছে? প্রশ্নটি জরুরি, কারণ দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ারের মতো চা অধ্যুষিত জেলাগুলিতে হাজার হাজার পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। চা পর্ষদের তথ্যেও উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে বিপুল সংখ্যক ক্ষুদ্র চা চাষির উপস্থিতি দেখা যায়। জলপাইগুড়িতে এই সংখ্যা ২০ হাজারেরও বেশি, দার্জিলিংয়ের সমতল অঞ্চলে সাড়ে তিন হাজারের বেশি এবং আলিপুরদুয়ারে প্রায় সাড়ে চারশো। তাই উত্তরবঙ্গের চা বাগানের গল্প শুধু চা উৎপাদনের নয়। এটি শ্রম, পরিবার, শিশু ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গল্প।
এই কারণেই সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহটি গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে ১ থেকে ৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহ পালিত হয়। ১৯৮২ সালে খাদ্য ও পুষ্টি পর্ষদের উদ্যোগে এই কর্মসূচির শুরু। উদ্দেশ্য ছিল বোঝানো, ভালো খাবার মানে শুধু পেট ভরা নয়; স্বাভাবিক বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও সুস্থ জীবনের জন্য প্রয়োজন সুষম পুষ্টি। পরে সেপ্টেম্বরজুড়ে পুষ্টি কর্মসূচিকে বড় সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা হয়েছে।
ভারতের সামগ্রিক পুষ্টির ছবিও খুব স্বস্তিদায়ক নয়। জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষার পঞ্চম পর্যায়, ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের ৩৫.৫ শতাংশ বয়সের তুলনায় খর্বাকৃতি, ১৯.৩ শতাংশের উচ্চতার তুলনায় ওজন কম এবং ৩২.১ শতাংশের বয়সের তুলনায় ওজন কম। ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের ৬৭.১ শতাংশ রক্তাল্পতায় আক্রান্ত ছিল।
চা বাগান এলাকার শিশুদের ছবিটিও উদ্বেগের। দার্জিলিংয়ের চা বাগান নিয়ে একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, ১ থেকে ৫ বছরের শিশুদের মধ্যে ৪৩.৮ শতাংশ খর্বাকৃতি, ২০.২ শতাংশ ক্ষীণকায় এবং ৩৬.২ শতাংশ কম ওজনের। ২০২৪ সালে প্রকাশিত ৭৬৮ জন স্কুল পড়ুয়া শিশুকে নিয়ে একটি গবেষণায় ৬ থেকে ১৫ বছরের শিশুদের মধ্যে ২৫ শতাংশ খর্বাকৃতি, ১৩ শতাংশ ক্ষীণকায় এবং ৪০ শতাংশের থিননেস পাওয়া যায়। এই গবেষণায় ৩০.৫ শতাংশ শিশুর ফ্যাকাশে ভাবের লক্ষণও ছিল। উত্তরবঙ্গের চা বাগান এলাকার শিশুদের পৃথক ও সাম্প্রতিক তথ্যের ভিত্তিতে আরও নির্দিষ্ট মূল্যায়ন প্রয়োজন। প্রতিটি সংখ্যার পিছনে রয়েছে একটি শিশুর মুখ, একটি মায়ের উদ্বেগ এবং একটি পরিবারের বাস্তবতা।
অপুষ্টির প্রভাব শুধু শিশুর ওজন বা উচ্চতায় থেমে থাকে না। দীর্ঘমেয়াদে তার শারীরিক বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, শেখার ক্ষমতা এবং ভবিষ্যতের কর্মক্ষমতার উপরও প্রভাব পড়তে পারে। এটি আগামীদিনের সুস্থ ও সক্ষম প্রজন্ম গড়ে তোলার প্রশ্ন।
তবে অপুষ্টির গল্প শুধু শিশুর জন্মের পর শুরু হয় না। শিশুর জীবনের প্রথম এক হাজার দিন, মায়ের গর্ভধারণের সময় থেকে শিশুর দ্বিতীয় জন্মদিন পর্যন্ত, তার ভবিষ্যৎ গড়ে দেওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলির একটি। এই সময়েই শিশুর মস্তিষ্ক, শরীর ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দ্রুত বিকশিত হয়। মায়ের পুষ্টি, গর্ভাবস্থায় পর্যাপ্ত ও সঠিক খাবার, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরিষেবা, নিরাপদ প্রসব, জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধ এবং ছয় মাসের পর মায়ের দুধের পাশাপাশি বয়স অনুযায়ী সঠিক ও পুষ্টিকর খাবার, সব মিলিয়ে এই সময়টিই ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যের ভিত তৈরি করে।
তাই চা বাগানের শিশুর পুষ্টি নিয়ে কাজ করতে হলে শুধু শিশুর জন্মের পর থেকে নয়, তারও আগে ভাবী মায়ের কিশোরী বয়স থেকেই তার পুষ্টির দিকে নজর দিতে হবে। অপুষ্ট কিশোরীর পুষ্টির ঘাটতি ভবিষ্যতে তার গর্ভস্থ শিশুর উপরও প্রভাব ফেলতে পারে। কিশোরী, অন্তঃসত্ত্বা, স্তন্যদায়ী মা ও ছোট শিশু, পুরো জীবনচক্রটিকে একসঙ্গে দেখতে হবে। প্রথম এক হাজার দিন সুরক্ষিত করা মানে আগামী প্রজন্মের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত করা।
আর একটি ভুল ধারণা আমাদের বদলাতে হবে। পেট ভরলেই পুষ্টি হয় না। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল বহু পরিবারের ক্ষেত্রে খাদ্যের বৈচিত্র্যের অভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হতে পারে। ভাত থাকলেও প্রতিদিন ডিম, মাছ, দুধ, ডাল, শাকসবজি বা ফলের পর্যাপ্ত বৈচিত্র্য নাও থাকতে পারে। ফলে শিশু পেট ভরে খেলেও আমিষ, লৌহ, ক্যালসিয়াম, বিভিন্ন ভিটামিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
নিরাপদ পানীয় জলের অভাব, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, কৃমি, বারবার অসুস্থ হওয়া ও মায়ের রক্তাল্পতাও শিশুর পুষ্টিতে প্রভাব ফেলে। তাই সমাধানও এক জায়গায় নেই। অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র, বিদ্যালয়ের মধ্যাহ্নভোজ, র্যাশন ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মাতৃস্বাস্থ্য পরিষেবা এবং কিশোরী পুষ্টি কর্মসূচি, সবকিছুকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
চা বাগান অধ্যুষিত এলাকায় শিশুদের পুষ্টি ও বৃদ্ধির নিয়মিত তথ্য নথিবদ্ধ রাখা দরকার। কে স্বাভাবিকভাবে বাড়ছে, কে কম ওজনের, কার উচ্চতা বয়সের তুলনায় কম, কার শরীরে রক্তের ঘাটতি রয়েছে, এই তথ্য না থাকলে সমস্যার সমাধানও সম্ভব নয়। ঝুঁকির শিশুকে একবার সাহায্য করলেই হবে না। তার স্বাস্থ্য ও বৃদ্ধির উপর নিয়মিত নজর রাখতে হবে।
চা বাগান কর্তৃপক্ষ, শ্রমিক সংগঠন, পঞ্চায়েত, স্বাস্থ্য দপ্তর, সমন্বিত শিশুবিকাশ পরিষেবা, বিদ্যালয়, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং স্থানীয় মানুষ, সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। প্রতি মাসে চা বাগানভিত্তিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি দিবস পালন করা যেতে পারে। শিশুদের ওজন ও উচ্চতা মাপা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, রক্তাল্পতা শনাক্ত করা, কিশোরীদের পুষ্টি ও লৌহসম্পূরক, গর্ভবতী মায়ের পুষ্টির খোঁজ এবং অপুষ্ট শিশুকে দ্রুত চিকিৎসা ও পুষ্টি সহায়তার আওতায় আনা প্রয়োজন।
স্থানীয় ও সহজলভ্য খাবার দিয়েই পুষ্টিকর খাদ্যতালিকা তৈরি করা সম্ভব। পুষ্টিকর খাবার মানেই দামি খাবার নয়। প্রয়োজন সঠিক খাবারের বৈচিত্র্য, নিয়মিততা ও পরিবারের সাধ্যের মধ্যে ব্যবস্থা। আর এই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে জবাবদিহি। কাগজে কতজন শিশু কর্মসূচির আওতায় আছে নয়, বাস্তবে কতজনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির উন্নতি হল, সেটাই সাফল্যের আসল মাপকাঠি।
শেষে আবার সেই সবুজ চা বাগানে ফিরে আসি। পাহাড়ের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমরা যখন চা বাগানের ছবি তুলি, কয়েক হাত দূরেই হয়তো কোনও মা ঝুড়ি নিয়ে চা তুলছেন। এক কাপ চায়ের স্বাদে মুগ্ধ হওয়ার সময় হয়তো সেই মায়ের ঘরে তাঁর সন্তানের খাবার নিয়ে উদ্বেগ চলছে। আমরা সবুজ পাতার সৌন্দর্য দেখি, এবার সেই পাতার আড়ালে থাকা শিশুটিকেও দেখতে হবে। কারণ যে শ্রমিকের হাতে চায়ের পাতা আমাদের কাপ পর্যন্ত পৌঁছায়, তাঁর সন্তানের মুখ অপুষ্টিতে ফ্যাকাশে হলে আমাদের উন্নয়নের গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
পুষ্টি সপ্তাহ তাই শুধু সচেতনতার সপ্তাহ নয়, এটি নিজেদের বিবেককে প্রশ্ন করার সময়। লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিটি শিশুর পুষ্টির দিকে নজর, প্রথম এক হাজার দিনকে গুরুত্ব, মাকে পুষ্ট করা, শিশুকে পুষ্ট করা এবং কৈশোর পর্যন্ত বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্য নজরে রাখা।
চায়ের সবুজকে আমরা ভালোবাসি, চা শিল্পকে বাঁচাতে চাই। কিন্তু সেই সবুজের আসল সৌন্দর্য তখনই পূর্ণ হবে, যখন চা বাগানের শিশুটিও সুস্থ শরীর, পুষ্টিকর খাবার, শিক্ষা এবং মর্যাদার অধিকার নিয়ে হাসতে হাসতে বড় হবে। এক কাপ চায়ের উষ্ণতার সঙ্গে সেই শিশুটির ভবিষ্যতের উষ্ণতাও সুরক্ষিত করতে পারলেই পুষ্টি সপ্তাহের সার্থকতা।
(লেখক অক্ষরকর্মী। শিলিগুড়ির বাসিন্দা।)

