একাধিপত্যের ছক

শিক্ষা
Spread the love


প্রায় ৪ মাসে আমূল বদলে গেল অবস্থান। বিধানসভা ভোটের পর তৃণমূলকে অস্পৃশ্য করে রাখার কট্টর মনোভাব ছিল। এখন তো দরজা হাট করে খোলা। শুধু তৃণমূল কেন, কংগ্রেস, সিপিএম সহ কোনও দলেই আর আপত্তি নেই। স্বাধীনতার আগে কংগ্রেস ছিল বিভিন্ন পন্থীদের প্ল্যাটফর্ম। বিজেপি যেন সেরকম মঞ্চ হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। পরস্পরবিরোধী মতপ্রকাশ করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন অনেকে।

প্রশ্নটা হল, অটলবিহারী বাজপেয়ীর স্বপ্নের ‘পার্টি উইথ ডিফারেন্স’ কীভাবে ও কেন আর পাঁচটা দলের মতো হয়ে উঠল। যেখানে কোনও স্বপ্ন নয়, ক্ষমতায় টিকে থাকার লক্ষ্যই দলের প্রধান কর্মসূচি। সেজন্য একদিকে সংখ্যার খেলায় জেতার মরিয়া তাগিদ আছে। অন্যদিকে, সংস্কৃতিগত মগজধোলাইয়ের পন্থায় মানসিক আধিপত্যের বিস্তৃতিকরণ। গত প্রায় চার মাসে এই দ্বিবিধ ছক ক্রমশ বেআব্রু হয়ে যাচ্ছে। যা খেয়াল করলে অবস্থান বদলের ক্রোনোলজিটা ধরা পড়বে।

বাংলায় প্রাথমিকভাবে নিয়ন্ত্রণটি শমীক ভট্টাচার্যের মতো আদি ও কট্টরপন্থী বিজেপি নেতাদের হাতে ছিল। শমীক আবার ওপরে ওপরে গণতন্ত্রীও বটে। যে অবস্থান থেকে তৃণমূল থেকে দলকে দূরে রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ খুব স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু দলের ব্যাটন হাতে না থাকলেও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কৌশলে, খুব সূক্ষ্মভাবে নাক গলানো শুরু হল। সরাসরি দরজা না খুললেও ভিন্ন ছকে তৃণমূলিদের কাছে টানা শুরু হল।

লোকসভার ২০ জন তৃণমূল সাংসদের প্রথমে আলাদা ব্লক গঠন ও পরে এনসিপিআই-এ ভিড়ে যাওয়ার নেপথ্যে ছিল মূলত শুভেন্দুর তৎপরতা। এতে ২০ জনের গ্রুপ আর যা-ই হোক, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে ও ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার তাগিদে কখনও বিজেপির সঙ্গ ছাড়বে না। ফলে লোকসভায় দুই প্রধান শরিক তেলুগু দেশম ও জনতা দল (ইউনাইটেড)-এর ওপর আর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে থাকার দিন শেষ হল বিজেপির।

প্রায় একই সময়ে নিজের মনোভাবের সম্পূর্ণ উলটো অবস্থানে ঘুরে শমীক রাজ্যসভার তিন তৃণমূল সাংসদের হাতে বিজেপির পতাকা তুলে দিতে বাধ্য হলেন। ততদিনে সংখ্যার স্বাদ পেতে শুরু করেছে দলের সর্বভারতীয় নেতৃত্ব। তৃণমূলের তিন রাজ্যসভা সাংসদকে পুনরায় মনোনীত করে রাজ্যসভায় এনডিএ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার আরও কাছে পৌঁছে যায়। নির্ধারিত সংখ্যা থেকে মাত্র ১০টি দূরে। এটা টের পেয়ে বাংলায় বিজেপির পর্যবেক্ষক সুনীল বনসল হিন্দুদের জন্য দরজা খুলে দেওয়ার সওয়াল শুরু করেন।

ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার পদে স্বীকৃতি দিয়ে আরেক চাল দেওয়া হল। দলে মিশে না গেলে ঋতব্রতপন্থী তৃণমূল বিধানসভায় কার্যত বিজেপির সহযোগী হয়ে গেল। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের ফল বিজেপির মধ্যে কাঁপন ধরিয়েছিল। ৪০০ পারের লক্ষ্য নির্দিষ্ট করে ২৪০-এ আটকে যাওয়ার পর থেকে ২০২৯-এর ভোট নিয়ে সবসময় শঙ্কায় থাকে বিজেপি নেতৃত্ব।

শুভেন্দু বোঝাতে পেরেছেন, সংখ্যার খেলায় যে জিতবে, সে-ই ‘সিকন্দর।’ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে শুভেন্দু লাইন তাই কার্যত শমীকদের লাইনকে পরাস্ত করে দিতে পেরেছে। অভীষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে গেলে এক দেশ এক নির্বাচন, আসন পুনর্বিন্যাস, চাই কি হিন্দু রাষ্ট্র করে ফেলা যেতে পারে। কিন্তু সমস্যা হল, সংবিধান সংশোধন করে ভবিষ্যতে অন্য কোনও শাসক সে সব বদলেও দিতে পারে। ক্ষমতার কারবারে সেই পথ আর খোলা রাখতে চায় না মোদি-শা’র দল।

সে কারণে শুরু হয়েছে আধিপত্যবাদের নয়া ছক। লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাসে এমন পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা হচ্ছে যাতে পরিস্থিতি শুধু পুরোপুরি নয়, স্থায়ীভাবে হিন্দি-হিন্দু ও হিন্দুত্বের পক্ষে ঝুঁকে যায়। হিন্দুত্বের শিকড় উত্তর ভারতে তাই নজর বেশি। উত্তরপ্রদেশে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শেক্সপিয়রও পড়ানো হচ্ছে হিন্দিতে। হিন্দুত্বের সংস্কৃতির আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় বাকি কাজটি করে চলেছে আরএসএস ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলি।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *