থিমের চাকচিক্যের মাঝে পুজোর আসল দেবী হারিয়ে যান নীরব এক আড়ালে।
শ্রেয়সী পোদ্দার
পুজো কাছে এলেই আগমনী গান শুনতে ভালো লাগে। পুজোর আমেজ তৈরি হয়। কিছুদিন আগে দুপুরে এমনই গান শুনছিলাম, ‘এত আয়োজন তোমারই কারণে…’ তা কানে আসতেই মাথায় অন্য ধরনের একটা ভাবনার আনাগোনা। বিগত অনেক বছর হল, পুজো মানেই থিমের মেলা। জুলাই–অগাস্ট মাস থেকেই বড় বাজেটের ক্লাবগুলো অনুষ্ঠান করে তাদের থিম প্রকাশ করে। এখন ছোট বাজেটের পুজোও সেই পথেই হাঁটছে। অতীতে এমনটা ছিল না। মায়ের মুখে পুজোর গল্প শুনি। তখন প্রতিমাই ছিল মূল আকর্ষণ। কোন ঠাকুরের মুখ বেশি সুন্দর, কার উচ্চতা বেশি, কোন শিল্পীর হাত নিখুঁত, এই নিয়ে আলোচনা চলত। মণ্ডপসজ্জা ছিল ছিমছাম, কোনও মন্দিরের আদলে বা পেছনে দৃশ্যপট আঁকা। দর্শক তাকিয়ে থাকতেন মায়ের মুখের দিকে।
এখন পুজোর কেন্দ্র থিম। প্রতিটি মণ্ডপ যেন আর্ট গ্যালারি। থিমের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে শৈল্পিক দুর্গা। কোথাও দশ হাত নেই, কোথাও তিনি আদিবাসী নারীর রূপে, কোথাও মুখে মাস্ক। লোহা, পাট, সাইকেলের টায়ার, বাদামের খোসা, কী দিয়ে না ঠাকুর তৈরি হচ্ছে! কিন্তু এই মূর্তি অনেক সময় শৈল্পিক প্রদর্শনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে, এখনকার ভাষায় ‘শো স্টপার’। এখানেই প্রশ্ন। শাস্ত্রীয় দুর্গা প্রতিমার নির্দিষ্ট লক্ষণ রয়েছে। দশ হাত, অস্ত্র, সিংহ ও মহিষাসুরের মতো পরিচিত চিহ্ন বাঙালির দুর্গার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে। আবার মূর্তির রূপ নিয়ে বাংলায় বহু বৈচিত্র্যও রয়েছে। ফলে থিমের ভাবনায় প্রতিমার প্রচলিত রূপ বদলালেই তা যে পুজোর উপযুক্ত নয়, এমন কথা সর্বত্র বলা যায় না। কোথাও অবশ্য থিমের শৈল্পিক মূর্তির পাশে শাস্ত্র মেনে তৈরি পৃথক প্রতিমাতেই মূল আচার পালিত হয়।
তাহলে পুজোটা হবে কোথায়? এখান থেকেই জন্ম নিয়েছে দ্বিতীয় প্রতিমার। মূল মণ্ডপের পাশে ছোট মণ্ডপে শোলার সাজে, শাস্ত্র মেনে তৈরি ছোট প্রতিমায় ঘটস্থাপন, চক্ষুদান ও প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়, ভক্তের অঞ্জলি পড়ে সেখানেই। একই প্রাঙ্গণে দুই দুর্গা, কিছু পুজোয় এটাই এখন চোখে পড়ার মতো বাস্তবতা। সবচেয়ে কষ্টের দৃশ্যটাও এখানেই। শৈল্পিক মূর্তিকে ঘিরে তীব্র উত্তেজনা। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, সেলফি তোলার হুড়োহুড়ি, রিল বানানোর ভিড়, ভলান্টিয়ারদের হাঁকডাক। আর প্রাণপ্রতিষ্ঠিত সেই প্রতিমা পড়ে থাকে পাশের ছোট মণ্ডপে, প্রায় নিভৃতে। তাকে পাহারা দেন একজন নিরাপত্তারক্ষী। দর্শক প্যান্ডেলের ভিড় ঠেলে বেরোনোর সময় আড়চোখে একটা প্রণাম ঠুকে যান। সেই মাকে ঘিরে কোনও কৌতূহল নেই, কোনও ক্যামেরা তাক করা নেই। অনেককে বলতে শোনা যায়, ‘একই তো ঠাকুর, আলাদা কই, সময় নষ্ট করব না, অন্য মণ্ডপে লাইনে দাঁড়াতে হবে।’
এই দৃশ্য আসলে আজকের বাঙালির দ্বৈত সত্তার প্রতীক। আমরা একদিকে বিশ্বমানের শিল্প চাই, পুরস্কার চাই, ইনস্টাগ্রামে ভাইরাল হতে চাই। অন্যদিকে ভেতরের সেই চিরন্তন বাঙালিকে তো আর দশমীর জলে বিসর্জন দেওয়া যায় না। অষ্টমীতে অঞ্জলি না দিলে যে পুজোটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই এক মণ্ডপে দুই দুর্গা কোনও বিরোধ নয়, এ এক আপস। শিল্পের সঙ্গে ভক্তির আপস, আবার ভক্তির সঙ্গে শিল্পেরও আপস। থিমের প্রতিমা অনেক সময় দর্শক টানে, পুজোর প্রতিমা টানে ভক্তি। এই দুই টানের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে আজকের শারদোৎসব। প্রশ্ন শুধু একটাই, দেবীকে আমরা কতটা দেখছি, আর তাঁর চারপাশের আয়োজনকে কতটা?
মা দুর্গার আরাধনা শুধু চোখধাঁধানো দৃশ্যের উৎসব নয়। যে প্রতিমার সামনে অঞ্জলি পড়ে, ধূপ জ্বলে, মন্ত্র উচ্চারিত হয়, ভক্তির সেই নিরাভরণ মুহূর্তও পুজোর সমান সত্য। থিমের জাঁকজমক থাকুক, শিল্পীর স্বাধীনতাও থাকুক। শুধু সেই মাকে যেন ভুলে না যাই, যাঁকে ঘিরেই এত আয়োজন। কারণ শেষ পর্যন্ত আলো, মণ্ডপ, পুরস্কার, ছবি আর রিলের ভিড় পেরিয়ে ভক্তের মনে যে মা থেকে যান, তিনি কোনও শো স্টপার নন, তিনি যে আমাদেরই ঘরের মা।
(লেখক উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী। জলপাইগুড়ির বাসিন্দা।)

