আগামী দিনের নির্বাচনী সুর বেঁধে দিল আরএসএস। বিজেপির রাজনৈতিক আখ্যান আরও একবার হতে চলেছে দেশপ্রেম বনাম দেশ-বিরোধিতা, জাতীয়তাবাদ বনাম বিচ্ছিন্নতাবাদ। বিজেপি যখনই বিপথগামী হয়, পথ দেখায় ‘লাইটহাউস’ আরএসএস! লিখছেন, সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়।
আইনের চোখে নির্বাচন কমিশন (ইসি) কিংবা আরও নির্দিষ্ট করে বললে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমার অপরাধী সাব্যস্ত হবেন কি না, নিজের সিদ্ধান্তের ভাগীদার হতে তিনি অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারকে বাধ্য করেছেন কি না, কিংবা তাঁদের উপেক্ষা করে ইচ্ছামতো কমিশন পরিচালনা করেছেন কি না তা জানতে আরও কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে। কারণ, এসব নিয়ে কয়েকটা মামলা হয়েছে। শুনানিও শুরু হয়েছে। প্রথম দিনের শুনানিতেই প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও ভি. মোহনার বেঞ্চ কমিশনের কেষ্টবিষ্টু ও কেন্দ্রীয় সরকারকে নোটিস পাঠিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে জবাব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধান বিচারপতি আরও বলেছেন, ‘ফর্ম ৬’-এ সংশোধনের অনুমতি ইসিকে তাঁরা দেননি। এ নিয়ে ব্যাপক হইচই চলছে। এই আইনি লড়াইয়ে ‘জ্ঞানেশ অ্যান্ড কোং’ বাঁচবেন কি না পরের কথা, আসল কথা হল– লড়াইটা আইনের আঙিনার পাশাপাশি রাজনীতির রঙ্গমঞ্চেও চলে এসেছে। পরিণাম শেষ পর্যন্ত কী হবে, তা অনুমান সাপেক্ষ হলেও এটুকু বলা যায়, অনেক বছর পর সরকার ও বিরোধীদের কুস্তিটা হচ্ছে সেয়ানে সেয়ানে।
আরও পড়ুন:
গত ১২ বছরে নরেন্দ্র মোদির সরকার ও বিজেপিকে কম ঝড়ঝাপটা সামলাতে হয়নি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মোদি তাঁর নিজের ক্ষমতা, দক্ষতা ও ভাবমূর্তির জোরে সব সামলে নিয়েছেন। দল ও সরকারকে শুধু বাঁচিয়েই রাখেননি, সচলও রেখেছেন। বারবার শেষ হাসিটা তিনিই হেসেছেন। এই প্রথম কেন যেন মনে হচ্ছে সংকট বেশ গভীর। জটিলও। কেননা, নির্বাচন কমিশনের উপর, কিংবা আরও স্পষ্ট করে বললে সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের উপর দেশবাসীর আস্থা টলে গিয়েছে। নির্বাচন কমিশন যে নিরপেক্ষ, তা বিশ্বাস করতে মানুষ আর কোনওভাবেই রাজি নয়। বরং জনতা মনে করছে, জ্ঞানেশ যেন মোদি-শাহর দূত হিসাবে কর্তব্য পালন করছেন। সে কারণেই এসআইআর নিয়ে এত তাড়াহুড়ো। সে কারণেই ‘ফর্ম ৬’-এ রদবদল। সে কারণেই বস্তা বস্তা ‘ফর্ম ৭’ নিয়ে ঝুড়ি ঝুড়ি অভিযোগ। ভোটার তালিকায় অযৌক্তিকভাবে তরোয়ালের কোপ, যার ফলে ইতিমধ্যেই ১৩ কোটি দেশবাসী এই মুহূর্তে ‘অ-নাগরিক’!
এসআইআরের ছোবল দেশবাসীকে ক্ষুব্ধ করেছে। নোটবন্দির সময়ও জনরোষ দেখা গিয়েছিল। কিন্তু সেই সংকটের সঙ্গে নাগরিকত্ব হারানোর শঙ্কা ছিল না। এবার সেই শঙ্কা লাখ লাখ মানুষের ঘাড়ের উপর খাঁড়া হয়ে দুলছে। ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় নানাবিধ সরকারি সুবিধা থেকে অনেককে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। ফলে জনতা রাগে ফুঁসছে। বিজেপি নিজেও তা বুঝতে পারছে। বুঝেছে বলে সাধ্যমতো প্রতিরোধেরও চেষ্টা করছে। যদিও অসফল।
প্রফুল কেতকরের কথায়: একজন ‘নকল’ করতে গিয়ে ধরা পড়লেন। বহিষ্কৃত হলেন। তারপর সুইসাইড করলেন। আচমকা ওই ঘটনাটি মুড়ে দেওয়া হল জাতপাতের চাদরে। কেন একজন পড়ুয়া চাপ সহ্য করতে পারছে না, কোন মানসিক চাপে পড়ে আত্মহননের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তার কারণ খোঁজার জন্য আত্মসমীক্ষা প্রয়োজন।
এই পরিস্থিতিতে সংকট থেকে পরিত্রাণের দাওয়াই বাতলেছে ‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ’ (আরএসএস)। লোহাকে লোহা দিয়েই কাটতে হয়, এই তত্ত্ব মেনে আরএসএস বলেছে, নির্বাচন কমিশন কিংবা এসআইআরের বিরোধিতা হল ‘উত্থিত ভারতের বিরুদ্ধে মার্কসবাদী, মাওবাদী ও ইসলামপন্থীদের ষড়যন্ত্র’। ভারতের দুর্নিবার অগ্রগতি এই শক্তি রুদ্ধ করতে চায়। বিশ্বের দরবারে উঁচু অধিষ্ঠান থেকে এরা ভারতকে টেনে মাটিতে নামাতে চায়। এরা দেশবিরোধী। বিজেপির ‘আদর্শগত’ শক্তির আধার আরএসএস আরও বলেছে, এদের পিঠে সওয়ার হয়েই রাহুল গান্ধীর কংগ্রেস অপতথ্য ও মিথ্যাচারের মাধ্যমে ভয়, ঘৃণা ও নৈরাজ্য ছড়াচ্ছে। এটা গান্ধীবাদের নিকৃষ্টতম নমুনা ছাড়া আর কিছু নয়। কোনও কোনও বিরোধী দল এই প্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে পথে নেমেছে।
আরএসএসের মুখপত্র ‘অর্গানাইজার’-এর সাম্প্রতিক সংখ্যার সম্পাকদীয় নিবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য এটাই। সম্পাদক প্রফুল্ল কেতকর ‘প্রোটেস্ট সিজন– আইআইটি বম্বে, ইলেকশন কমিশন অ্যান্ড ইউপিআই: সেভিং গান্ধী অ্যান্ড আম্বেদকর ফ্রম মার্কস অ্যান্ড মাও’ শিরোনামে সাম্প্রতিক ক্ষোভ বিক্ষোভ অসন্তোষ ও আন্দোলনের মধ্যে একটা প্যাটার্ন খুঁজে পেয়েছেন। আইআইটি বম্বের এক ছাত্রের আত্মহত্যার ঘটনা এবং তা নিয়ে আন্দোলনের উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, যে কোনও পড়ুয়ার মৃত্যু সবসময় বেদনাদায়ক। কিন্তু কী দেখা গেল? একজন ‘নকল’ করতে গিয়ে ধরা পড়লেন। বহিষ্কৃত হলেন। তারপর সুইসাইড করলেন। আচমকা ওই ঘটনাটি মুড়ে দেওয়া হল জাতপাতের চাদরে।
কেন একজন পড়ুয়া চাপ সহ্য করতে পারছে না, কোন মানসিক চাপে পড়ে আত্মহননের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তার কারণ খোঁজার জন্য আত্মসমীক্ষা প্রয়োজন। জাতভিত্তিক আন্দোলন নয়। এই ধরনের আত্মহত্যা জাতপাতের দরুন হচ্ছে– এমন কোনও পরিসংখ্যান কোথাও নেই। কেন তাহলে এমন ধরনের আন্দোলন? সম্পাদকের ব্যাখ্যা, এটাই ‘উত্থিত ভারতের বিরুদ্ধে মার্কসবাদী, মাওবাদী ও ইসলামপন্থী ষড়যন্ত্র।’ সেই ষড়যন্ত্রেরই আর-একটি নমুনা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আক্রমণ। সম্পাদক লিখছেন, ইভিএম নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। ভোটার তালিকা সংশোধনের জন্য এসআইআর প্রক্রিয়ার মতো সাংবিধানিক বৈধ পদক্ষেপের বিরোধিতার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করার চেষ্টা হচ্ছে। অথচ এই সংস্থাটি সারা বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছে বহু দেশে নির্বাচন সংক্রান্ত ট্রেনিং দেওয়ার জন্য। এটা কাকতালীয় না কি এর নেপথ্যে চক্রান্ত আছে সেই রহস্য উদ্ঘাটন হওয়া জরুরি।
লোহাকে লোহা দিয়েই কাটতে হয়, এই তত্ত্ব মেনে আরএসএস বলেছে, নির্বাচন কমিশন কিংবা এসআইআরের বিরোধিতা হল ‘উত্থিত ভারতের বিরুদ্ধে মার্কসবাদী, মাওবাদী ও ইসলামপন্থীদের ষড়যন্ত্র’।
ষড়যন্ত্রের তৃতীয় তত্ত্ব ‘ইউপিআই’ পেমেন্ট ঘিরে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা ‘এমডিআর’। ইউপিআই মারফত ২ হাজার টাকার বেশি আদান প্রদানে ০.০৪ শতাংশ হারে এমডিআর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তুমুল হল্লা চলছে দেশে। আন্দোলনও। এ বিষয়ে প্রফুল্ল কেতকরের বক্তব্য, ব্যক্তি বিশেষকে এই লেভি দিতে হবে না। দিতে হবে ব্যবসায়ীদের। তাঁদের ক্ষেত্রেও এই হার নিতান্তই সামান্য। এটিএম চার্জ বা ক্রেডিট কার্ড পেমেন্টের সময় যেটুকু গুনাগার দিতে হয় তার চেয়েও কম। অথচ এ নিয়েও আন্দোলন চলছে। কেন? কারণ, ইউপিআই ভারতীয় ব্র্যান্ড। ভারতীয় প্রযুক্তির এই সাফল্য পৃথিবীর সমীহ আদায় করেছে। ওরা চায় ভারতের উঁচু মাথা নিচু করে দিতে। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে ‘ব্র্যান্ড ভারত’কে টেনে নামানোর এই প্রচেষ্টা এখন যেন এক ফ্যাশনে পরিণত। এটাই সেই চক্রান্ত। সেই চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রকে ভারত বিরোধী শক্তিরা মদত দিচ্ছে। অর্থ দিয়ে সাহায্য করছে।
প্রফুল্ল কেতকর তাঁর মতো করে যে-ব্যাখ্যা দিয়েছেন, বিজেপি সেটাই গ্রহণ করেছে। আরএসএস চিরকালই বিজেপির ‘লাইটহাউস’। দল বেপথু হলে তার পথনির্দেশিকার দায়িত্ব পালন করে। এক্ষেত্রেও শুরু থেকেই নির্বাচন কমিশনের বিরোধী আন্দোলনকে বিজেপি দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের তকমা দিয়ে আসছে। ইউপিআই, এমডিআর বিতর্কে কিছুটা বেসুরো যদিও গেয়েছে আরএসএস অনুমোদিত ও ঘনিষ্ঠ আর-একটি দক্ষিণপন্থী অর্থনৈতিক ও জননীতি-বিষয়ক সংগঠন স্বদেশি জাগরণ মঞ্চ। শুরু থেকেই তারা বলে আসছে, এমডিআর চালু করার পরোক্ষ অর্থ মার্কিন সংস্থা ভিসা ও মাস্টারকার্ডের সুবিধা হওয়া। মনে রাখা দরকার, বিরোধীদের অভিযোগও ঠিক এমনই। আমেরিকার চাপেই মোদির মাথা নত হয়েছে।
অর্গানাইজারের ব্যখ্যায়, কমিউনিস্ট-মার্কসবাদী-মাওবাদীদের এই অক্ষে নয়া সংযোজন ইসলামপন্থীরা। ভারত বিরোধিতায় তাদের সম্মিলিত ষড়যন্ত্রের লক্ষ্য ২০২৭ সালের উত্তরপ্রদেশ ও ২০২৯ সালের লোকসভা ভোট। অর্থাৎ, আগামী দিনের নির্বাচনী সুরও আরএসএস বেঁধে দিল। স্পষ্টতই বিজেপির রাজনৈতিক আখ্যান আরও একবার হতে চলেছে দেশপ্রেম বনাম দেশ বিরোধিতা, জাতীয়তাবাদ বনাম বিচ্ছিন্নতাবাদ। এই পুরনো মন্ত্র মোদিতন্ত্রকে চতুর্থবারের মতো তরাবে কি না তা-ই প্রধান জিজ্ঞাসা। উত্তরটা সম্ভবত লুকিয়ে আছে জ্ঞানেশ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়, জন-বিশ্বাস এবং জেন জি-র জেদ ও রাজনৈতিক আচরণের মধ্যে।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
