গণতন্ত্রে বিশেষ রাজনৈতিক মতবাদের গুরুত্ব ক্ষতিকারক

স্বাস্থ্য/HEALTH
Spread the love


গণতন্ত্রে বিশেষ রাজনৈতিক মতবাদ যদি বিশেষ গুরুত্ব পায়, তাহলে গণতন্ত্রের পক্ষে তা ক্ষতিকারক। আদর্শগত ভাবনাচিন্তা সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দ্বিশতাধিক বছর চলার নেপথ্যের অন্যতম বড় কারণ– আমাদের পূর্বপুরুষদের অনেকেই সেই শাসনব্যবস্থার সঙ্গে পরোক্ষে যুক্ত ছিলেন, সেই শাসনব্যবস্থাকে চালাতে সাহায্য করেছিলেন। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে মহাত্মা গান্ধী ‘অসহযোগ আন্দোলন’ করেন। এর বিরোধিতা অবশ্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর করেছিলেন অন্যতর ভাবনাচিন্তার মাধ্যমে। সে-কথা থাক। যেটা বলার, আমরা ব্যুৎপত্তিগত অর্থে ‘ক্রীতদাস’ ছিলাম না ঠিকই। তবে আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে ক্রীতদাসসুলভ মানসিকতা তৈরি হয়েছিল– অনেকেই ভেবেছিলেন– সাম্রাজ্যবাদী শাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করলে ‘ব্যক্তিগত লাভ’ হবে। ফলে একটি ‘loyalist group’ তৈরি হয়। ১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’-এর সাফল্যের নেপথ্যের বড় কারণ, যঁারা এত দিন পর্যন্ত শাসকদের সঙ্গে সহযোগিতা করতেন, তঁারা ধীরে ধীরে গুটিয়ে নেন নিজেদের, ‘loyalist community’ ভেঙে যায়।

আরও পড়ুন:

যে-ক’টি ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল পৃথিবীতে, তার মধে‌্য ভারতই সেই রাষ্ট্র যেখানে এখনও গণতন্ত্র বজায় রয়েছে। গণতন্ত্রের মাধ্যমে ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধীর সরকারকে উৎখাত করা হয়েছিল। তেমনই ভোটাধিকার প্রয়োগ করে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ২০২৬ সালে পছন্দের সরকারকে নিয়ে এসেছেন। যে-সরকার মানুষের সঙ্গে ছিল না, সেই সরকারকে চলে যেতে হয়েছে। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক পদ্ধতির প্রকাশ আমরা দেখতে পেলাম। এখানেও ‘loyalist community’ ভেঙে গিয়েছে।

রাজ্যের পূর্বতন সরকারের সঙ্গে যাঁরা যুক্ত ছিলেন, নিজেদের ‘গণতান্ত্রিক’ বলে তঁারা দাবি করতেন। কিন্তু এই দাবি যে কতটা ভুল ও অসত্য, তার প্রমাণ আমরা পাচ্ছি প্রতি মুহূর্তে। যেহেতু নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারের পরিবর্তন সম্ভব, তাই বলা যায়, গণতন্ত্র মানুষকে এক ধরনের মুক্ত ও যুক্তিবদ্ধ ক্ষমতায় বলীয়ান করে। যে-ক্ষমতার সৌজন্যে স্বৈরাচারী মানসিকতার বিরুদ্ধে শক্তিশালী আওয়াজ তোলা যায়। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনে আমরা তা দেখেছি। পূর্বতন সরকার এমন কিছু পদক্ষেপ করেছিল, যা গণতন্ত্রের পরিপন্থী। যত দিন সেই সরকার ছিল, তত দিন গণতন্ত্রের মূলকথাটি– ‘authorities by the folks, for the folks and of the folks’– ফিকে হয়ে গিয়েছিল। গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ ‘Rule of Legislation’, আইনের শাসন। তাও জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছিল। সে-জায়গায় এসেছিল ‘Rule by Legislation’। সাদামাঠা ভাষায় বলা যায়, শাসকের আইন চলছিল, কিন্তু আইনের শাসন রদ করা হয়েছিল।

‌২০১১-’২৬ পর্যন্ত নির্বাচন-পূর্ব পশ্চিমবঙ্গে যে-সরকার ছিল, তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছিল ভ্রষ্টাচার। কিন্তু এই ভ্রষ্টাচার কি শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গে সীমাবদ্ধ? ভারতের অন্যান্য জায়গায়, বিশেষত রামমন্দির নিয়ে যে-বিতর্ক জারি রয়েছে, তা থেকে বোঝা যাচ্ছে, যঁারা সমাজে পরিচিত ‘সততা’-র জন্য, তাঁদেরও ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অর্থাৎ কিনা গণতন্ত্রের যে-মূল বক্তব্য– মানুষের শাসন– তার প্রতিষ্ঠা দেখছি না। পরিবর্তে দেখছি– বিশেষ সুবিধার জন্য এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বিশেষ কিছু মানুষজন নিজের খেয়ালে পরিচালিত করছেন। এটিই এ-মুহূর্তে ভারতীয় রাজনীতির অস্থিরতার মূল কারণ। এর থেকে বেরনোর উপায় আমরা নিশ্চয়ই বের করতে পারব।

১৮৮৭ সালে ব্রিটিশ আইনবিশারদ লর্ড অ্যাক্টন বলেছিলেন, ‘energy tends to deprave and absolute energy corrupts completely.’ এত বছর বাদেও এই বক্তব্যের প্রতিফলন ভারতীয় রাজনীতিতে দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ, লর্ড অ্যাক্টনের এ বক্তব্য হালফিলেও অপ্রাসঙ্গিক নয়। মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্রে বিশেষ রাজনৈতিক মতবাদ যদি বিশেষ গুরুত্ব পায়, তাহলে গণতন্ত্রের পক্ষে তা ক্ষতিকারক সাব্যস্ত হতে পারে। আদর্শগত ভাবনাচিন্তা সমালোচনার ঊর্ধ্বে চলে যাক, সেটি কাম্য নয়। তাতে যে গণতন্ত্রের সমূহ বিপদ!

(মতামত নিজস্ব)
লেখক ভূতপূর্ব উপাচার্য,
বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন:

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *