‘কুষ্ঠ’ তাই আদ্রার হোমে বিতাড়িত! নথিহীন জীবনে এসআইআর আঁধার!

‘কুষ্ঠ’ তাই আদ্রার হোমে বিতাড়িত! নথিহীন জীবনে এসআইআর আঁধার!

জীবনযাপন/LIFE STYLE
Spread the love


সুমিত বিশ্বাস, পুরুলিয়া: রেললাইনের পাশে একটা ঘিঞ্জি বস্তিতে তাঁদের আশ্রয়ের ঠিকানা। গ্রামের নাম মণিপুর। ব্লক রঘুনাথপুর এক। সেই গ্রামের এক প্রান্তে মণিপুর লেপ্রসি রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারের আওতায় অবশেষে নামে একটি বৃদ্ধাবাস। যা কেন্দ্রীয় সরকারের সাহায্যপ্রাপ্ত। বর্তমানে ২৫ জন আবাসিক। তার মধ্যে ৮ জন পুরুষ। ১৭ জন মহিলা। এদের মধ্যে সকলের ভোটার বা আধার কার্ডও নেই। ফলে মেলেনি এনুমারেশন ফর্ম। ২০০২ সালে ভোটার তালিকায় নামও নেই। আর কমিশনের মান্যতা দেওয়া নথি? সে তো দূর অস্ত! কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত আবাসিকদের যে ঘর থেকেই তাড়িয়ে দিয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসার পরেও পরিবার তাদেরকে আর ঘরে তোলেনি। তাই নিবিড়ভাবে ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআরে অথৈ জলে পড়েছেন তাঁরা। ফলে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে গণতন্ত্রের শরিক হতে পারবেন? প্রশ্ন অনেক।

এই হোম কেন্দ্রীয় সরকারের সাহায্যপ্রাপ্ত হলেও গত ৩৪ মাস কেন্দ্রের তরফে কোনও সাহায্য আসেনি। অথচ প্রতি জন পিছুকে ৭ হাজার টাকা করে দিয়ে থাকে কেন্দ্র। তবে এই আবাসিকদের কোনও অসুবিধা বুঝতে দেয়নি ওই হোম কর্তৃপক্ষ। ২৫ জন আবাসিকের মধ্যে ১৫ জনের এনুমারেশন ফর্ম এসেছে। ওই আবাসিকদের মধ্যে ৮ জনের ভোটার কার্ড নেই। এমনকী তাঁদের মধ্যে ৪ জনের আধার কার্ডও হয়নি। একজন আবাসিকেরও ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম নেই। ফলে কমিশন যে ১৩ টি নথির মান্যতা দিয়েছে সেগুলো তাঁদের কাছে নেই। তাহলে এরা কি ভোটের লাইনে দাঁড়াতে পারবেন না? ওই হোমের কর্ণধার নবকুমার দাস বলেন, “প্রশাসনই একমাত্র ভরসা। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় যাদের নাম ভোটার তালিকায় নেই, তাঁদের নাম যাতে তালিকায় ওঠে সেজন্য রঘুনাথপুর ১ নম্বর ব্লক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। কিন্তু নাম ওঠাতে পারিনি। এখন নিবিড়ভাবে ভোটার তালিকা সংশোধনে কী হবে বুঝতে পারছি না।” তবে রঘুনাথপুর মহকুমাশাসক বিবেক পঙ্কজ বলেন, “যাদের এনুমারেশন ফর্ম আসেনি তাঁদের বর্তমান ভোটার তালিকায় নাম নেই। তাই তাদের ৬ নম্বর ফর্ম পূরণ করতে হবে। আর যাদের ২০০২-র ভোটার তালিকায় নাম নেই, তাঁরা বিধি মোতাবেক ওই ফর্মপূরণ করবেন। তারপর কোনও না কোনও নথির মাধ্যম দিয়ে আমরা লিঙ্ক খোঁজার চেষ্টা করব। এখন বিএলও-র সঙ্গে কথা বলে এনুমারেশন ফর্ম জমা করতে হবে।”

ওই ২৫ আবাসিকের মধ্যে যারা কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত, তাঁরা হলেন কাশিপুরের ইন্দ্রবিলের হারু বাউরি, বাঁকুড়ার ইন্দপুরের পটুবালা পান্ডা, হুড়ার লক্ষীমণি টুডু। ৬৫ বছরের লক্ষ্মীমণির শরীরে কুষ্ঠ বাসা বাঁধার পর বাঁকুড়ার গৌরীপুর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে খানিকটা সুস্থ হয়ে বাড়িতে উঠতে যান। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা তাঁকে ফিরিয়ে দেন। হোম সূত্রে জানা গিয়েছে একই অবস্থা পটুবালা পান্ডা-র। ৭৭ বছরের এই বৃদ্ধ কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হয়ে বাঁকুড়ার ওই গৌরিপুর হাসপাতালেই ভর্তি ছিলেন। তাঁর কথায়, “হাসপাতাল থেকে বাড়িতে গেলেও পরিবারের লোকজন আমাকে ঘরে তোলেননি। আমি এই মণিপুর গ্রামে আশ্রয় নিই। তারপর প্রশাসনের কাছে আবেদন করে এই হোমে জায়গা পাই।”

রেলশহরেই থাকতেন ভবঘুরে মহাবীর সিং। প্রথমে দিনমজুরের কাজ করতেন। তারপরে বয়স বাধা হয়ে দাঁড়ালে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াতেন। পরে রঘুনাথপুর মহকুমা প্রশাসন তাঁকে উদ্ধার করে এই হোমে নিয়ে আসেন। তাঁর না আছে ভোটার, না আছে আধার কার্ড। তেমনই আরেক আবাসিক টিঙ্কু দাস। যার বাড়ি সম্ভবত কলকাতা ঠাকুরপুকুর এলাকায়। দীর্ঘদিন পুরুলিয়া শহরের উপকণ্ঠে বেলগুমায় আনন্দমঠ জুভেনাইল হোমে ছিলেন। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যাওয়ার পর তাকে সেখান থেকে এই মণিপুর হোমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর কোনও ভোটার কার্ড নেই। কীভাবে যে তাঁর ঠিকানা হয় হোমে, তা জানে না কর্তৃপক্ষ। এমন ছবি শুধু মণিপুরের হোম নয়। পুরুলিয়ার কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত কলোনি শহর পুরুলিয়ার উপকণ্ঠ গোশালার যমুনাবাঁধ, ভাটবাঁধের সিমনপুরেও। নথিহীন জীবনে গ্রাস করেছে এসআইআর আঁধার!



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *