শেখর সাহা
একটি গণতান্ত্রিক দেশের অর্থনীতি কেবল জিডিপির শুষ্ক পরিসংখ্যান বা শেয়ার বাজারের সূচক নয়; তা কোটি কোটি মানুষের সঞ্চয় ও ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু বারবার বড় বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপির বোঝা শেষপর্যন্ত সাধারণ জনগণের কাঁধেই এসে পড়ে। নয়ের দশকের হর্ষদ মেহতা কাণ্ড থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ের সত্যম জালিয়াতি, হালের রাজেশ এক্সপোর্টসকে ঘিরে বিতর্ক, বিভিন্ন বৃহৎ কর্পোরেট কর্তাদের ঋণখেলাপি হয়ে দেশত্যাগ কিংবা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ— সবই এক গভীর কাঠামোগত সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করায়। অর্থনীতির আসল শক্তি কোনও কর্পোরেট সাম্রাজ্য নয়, তা হল ব্যবস্থার প্রতি মানুষের অবিচল আস্থা।
একজন কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক বা মধ্যবিত্ত কর্মচারী যখন ব্যাংকে অর্থ জমান, তখন তিনি নিজের বিশ্বাসও সেই ব্যবস্থার হাতে তুলে দেন। গত এক দশকে দেশের মানুষকে দ্রুততম বিকাশমান অর্থনীতির যে বৃহৎ স্বপ্ন দেখানো হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু এই আশাবাদের সমান্তরালে বাস্তবতার হিসাব মেলানোও জরুরি। সরকারি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট অভ্যন্তরীণ ঋণ ও দায়বদ্ধতার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। উন্নয়নের স্বার্থে ঋণ গ্রহণ স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও, সেই ঋণের বিনিময়ে প্রকৃতপক্ষে কতটা স্থায়ী কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীল সম্পদ এবং সামাজিক সুরক্ষা তৈরি হল, আজ সেটাই মূল বিবেচ্য।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চিন্তার জায়গা হল কর্পোরেট ঋণ পুনরুদ্ধারের দুর্বল চিত্রটি। গত কয়েক বছরে দেউলিয়া আইন ও ঋণ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার আওতায় বহু বড় শিল্পগোষ্ঠীর ঋণ মামলায় ব্যাংকগুলি মূল বকেয়ার তুলনায় অত্যন্ত সামান্য অর্থ উদ্ধার করতে পেরেছে। ব্যাংকিং পরিভাষায় যাকে ‘হেয়ারকাট’ বা লোকসান হিসেবে দেখানো হচ্ছে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে অঙ্কটা খুব সহজ—ব্যাংকের ঋণের সিংহভাগই আসে আমানতকারীদের টাকা থেকে। তাহলে বড় কর্পোরেটদের হাজার কোটি টাকার ঋণ যখন বিপুল ছাড়ে নিষ্পত্তি হয়, তখন সেই বিপুল ঘাটতির চূড়ান্ত ভার বহন করে কে?
অন্যদিকে, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা প্রান্তিক কৃষকের ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংক ব্যবস্থার কঠোরতা যেখানে স্পষ্ট, সেখানে বড় ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে নমনীয়তার বৈষম্যটি সাধারণ মানুষকে ভাবিয়ে তোলে। ডলারের তুলনায় টাকার ক্রমাগত অবমূল্যায়ন কিংবা বাজারচলতি মূল্যবৃদ্ধিকে কেবল সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না; এটি আসলে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসের শেষের তীব্র মানসিক উদ্বেগ। রিজার্ভ ব্যাংকের উদ্বৃত্ত বা বেসরকারিকরণ থেকে সংগৃহীত রাজস্বের কতটা অংশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশে প্রকৃত অর্থে ব্যয় হচ্ছে, দেশের করদাতাদের সেই স্বচ্ছ হিসাব পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
উন্নয়নের প্রকৃত মূল্যায়ন জমকালো প্রচারের আলোয় হয় না, তা প্রতিফলিত হয় সাধারণ মানুষের জীবনমানের গুণগত উন্নতিতে। গণতন্ত্রে নীতিনির্ধারণ নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন তোলা কোনও বিরোধিতা নয়, বরং সচেতন নাগরিকের মৌলিক দায়িত্ব। কারণ শাসনক্ষমতার অলিন্দে রাজনৈতিক নেতৃত্ব বা স্লোগান বদলাতেই পারে, কিন্তু ভুল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি মাশুল শেষপর্যন্ত দেশের সাধারণ মানুষকে নীরবে দিতে হয়। তাই পুঁজিপতিদের স্বার্থরক্ষার চেয়ে জনকল্যাণ ও আর্থিক স্বচ্ছতাকে অগ্রাধিকার দিয়েই অর্থনীতির বুনিয়াদ শক্ত করা প্রয়োজন।
(লেখক অক্ষরকর্মী। শিলিগুড়ির বাসিন্দা।)
