- বাদুড় ও বেদনা
দীপশিখা পোদ্দার
সব মৃত্যু মোমবাতি পায় না।
সব ধর্ষণের গল্প, যৌনতা লুটের গল্প
মুখে মুখে ফেরে না সবার।
হাত-পা কাটলে যেমন যন্ত্রণা
তেমনই যন্ত্রণায় চিৎকার করে ওঠে ধর্ষিতা যোনির শরীর,
কিন্তু মানুষের হাতে-হাতে মোমবাতি জ্বলে না উঠলে
সেই চিৎকার কেউ শুনতে পায় না।
মোমবাতি জ্বলে উঠলেই কি যন্ত্রণার হদিস পাওয়া যায়?
মোমবাতির আলো কি মানুষের চেতনার অন্ধকার ফুঁড়ে
সমাজের বিধিবদ্ধতা আর মিথ্যের লন্ঠন ভেঙে
হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ-জৈন
মানুষের তৈরি সব ধর্মের দরজা দিয়ে সমানভাবে ভিতরে ঢুকতে পারে?
একই বিষয় নিয়ে কখনও দুর্নিবার মেতে ওঠে বাতাস
কখনও নিশ্চুপ বয়ে যায়…
কখনও আগুন জ্বলে ওঠে দাউদাউ
কখনও প্রাত্যহিক অভ্যাসের জটিল অতলে
আগুনও নিবতে নিবতে ঘুমিয়ে পড়ে রহস্যের বিছানায়।
শুধু দৃষ্টান্তের পতাকা নিয়ে একটুকরো সময়
ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকে একা
তোমার দিকে
আমার দিকে
আমাদের নির্বিকার মুখের দুনিয়ায়…
- মেঘ ভাঙা বৃষ্টি
চৈতালি ধরিত্রীকন্যা
নিকষ কালোর ওপর হেঁটে যাচ্ছে জ্যামিতিক মেঘ সাদা
ভোর রাতে মুষল বৃষ্টি ভেজাবে
আরো দুটো যন্ত্রণা
গতকালই মেঘভাঙা বৃষ্টি ভেঙেছে
বাঁশবন গোটা গোটা
শাল-সেগুনের বাকল।
ছাউনিগুলি সাপ-ব্যাঙের খেলা দেখে
প্রতিবছর দালানকোঠায় হৃদপিণ্ড রাখে ওরা।
গামছা নাড়ে আকাশে
অস্তিত্ব নিশান করে।
হেলিপ্যাডে কাঁকর-ভরা চিড়ের ঝুলি
নিজস্ব পেট থমকে যায়,
স্বপ্নের বেলুনওয়ালার মসৃণ ফুঁ-মেসিনটা
জলে ভিজে গেছে গতকালই
এখন শৈশবের উপাস-চোখ
ভেসে বেড়াচ্ছে থালা-বাটির ফানুস-বেলুন
বিস্মিত সমবেত সঙ্গীত
মোম পেন্সিলে ভেসে যাচ্ছে শরীর, হাত-পা।
কাটাকুটি করে হিসেব মেলাচ্ছে
নানান ওজনদার মস্তিষ্ক…
- যাযাবর পাখিরা ও আমি
শান্তনু দেবনাথ
বাড়ির পেছনের ঝোপঝাড় বেষ্টিত ফাঁকা জমিতে-
বর্ষার শুরুতে জমা জলে যাযাবর পাখিদের আগমন,
আমাকে যেন পুনরুজ্জীবিত করে বর্ষার জল সিঞ্চন অভিষেকে।
এই সময়ে তীব্র দাবদাহ ও বৃষ্টি যুগপৎ স্বচ্ছন্দ,
আবার কখনও একটানা বৃষ্টি, শীতলতা অনাকাঙ্ক্ষিত;
সূর্য্যের তাপ-প্রকোপে অস্থায়ী ডোবার জল শুকিয়ে আসতে থাকে,
চারিদিকে একটা থমথমে ভাব অনর্থের সম্ভাবনা,
যাযাবর পাখিদের আর্তি-আর্তনাদ শুনতে পাই;
আমি বিচলিত হই তবে সর্বশক্তিমানের পক্ষ ওদের দিকেই থাকে।
ঢেলে অবিরত বৃষ্টি শুরু, আবার জলময় চারিদিক,
জলে সার বেঁধে ছানাপোনা নিয়ে ভেসে বেড়ায় বালি হাঁসেরা,
সেখানে ডাহুকের আনাগোনা, পানকৌরিদের ক্লান্তিহীন ডুব,
অনেক বক-ও জুটেছে, তারা সাদা-বাদামী-লালচে রঙের সব।
ইতিমধ্যে শরতের উঁকি-ঝুঁকি, আকাশে সাদা মেঘের ছোঁয়া,
বৃষ্টি উধাও, জমা জল শুকিয়ে যাওয়াতে-
যাযাবর পাখিদের ঘর-সংসার ফেলে চলে যাওয়া-
আমি অভিমানে বিষন্ন হই, আবার নতুন বছরের বর্ষার প্রতীক্ষা।
- অসহায় শৈশব
রীনা মজুমদার
শৈশবের পিঠে অবুঝ শিশুর বোঝা
আর কত কাদামাটি জল নিয়ে খেললে
শিশুর অবুঝ চোখ খুঁজে পাবে মা-বাবাকে?
প্রকৃতিও অশ্রু জলে ভাসে
রেখে যায় বারবার সাবধান বাণী,
পরিবেশ রক্ষায় কতটা নিয়ম মানি?
যে পিঠ বইবে বইয়ের বোঝা
অসহায় পিঠে অবুঝ শিশুর কান্না
এ দায় কার? প্রকৃতির?
দেশের! বিদেশের! আমাদের না তোমাদের!
কার? কার এ দায়?
আর সময় নেই দায় এড়ানোর…
- ঝিলিক
তন্ময় বিশ্বাস
শীতের সকালের মতো জড়তা নিয়ে বসে থাকি
যে উষ্ণতায় পোড়ে না শরীর, সেই আগুনে পোড়াবে
বলে, যে স্তুতি বহুকাল আগে করেছিলে, তা এখন অর্থহীন!
তবুও, অনুচ্চারিত শব্দগুলি শিলাবৃষ্টি হয়ে ঝরে
জোৎস্না পার করে হেঁটে আসে অমাবস্যা।
হে ঝিলিক,
এখনও হৃদয় রাজপথের মতো শূন্য,
যে গাঁয়ে মানুষ নেই, ঘর নেই, পশু নেই, পাখি নেই
সে গাঁয়ের একমাত্র বাসিন্দা হয়ে বুঝেছি-
মৃত্যুর থেকে ভালোবাসা বড়ো নয়।
The publish কবিতা appeared first on Uttarbanga Sambad.
