তাপসরঞ্জন গিরি
র্যাডক্লিফ লাইন মানচিত্রে বিভাজন টানতে পারে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী যে, ঢাকা ও কলকাতার নাড়ির টান অবিচ্ছেদ্য। ওপার বাংলায় যখনই অস্থিরতার আগুন জ্বলে, তার উত্তাপ এপার বাংলার রাজনৈতিক অলিন্দে কাঁপন ধরায়। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে পশ্চিমবঙ্গ এখন এক অভূতপূর্ব সন্ধিক্ষণে। বাংলাদেশের ডামাডোলকে হাতিয়ার করে এপারে দীর্ঘদিনের চেনা রাজনৈতিক সমীকরণ ও ভোটব্যাংক কি তবে আমূল বদলে যেতে চলেছে?
বয়ান বদলের লড়াই
রাজনীতির ময়দানে ‘ন্যারেটিভ’ বা বয়ান তৈরি করাই আসল খেলা। বর্তমানে বিজেপি সেই খেলাটি খেলছে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলিকে মূলধন করে। গত কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশে যে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি, তার মূলে ওই দেশের মানুষের মনে গেঁথে যাওয়া ভারত বিরোধিতার হাওয়া। হাদি হত্যার পর ঢাকায় প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার ও ছায়ানটের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ, ভারতীয় দূতাবাসে হামলা, ময়মনসিংহে দীপুচন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যার পর দেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার দৃশ্যগুলো সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে এখন বাংলার ড্রয়িংরুমে চর্চার বিষয়।
গেরুয়া শিবিরের নেতারা এই ঘটনাগুলোকে সরাসরি পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যতের সঙ্গে জুড়ে দিচ্ছেন। তাঁদের কৌশলী প্রশ্ন- ‘আজ ওপারে যা হচ্ছে, কাল এপারে হবে না তো?’ এই প্রশ্নটি সরাসরি আঘাত করছে এপার বাংলার হিন্দু মধ্যবিত্তের অবচেতনে। তৃণমূলও সতর্ক। আন্তর্জাতিক বিষয়ে কেন্দ্রের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলে থাকেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগে তিনি ‘তোষণ’-এর তকমা ঝেড়ে ফেলতে চাইছেন। তবে বিজেপির তৈরি করা মেরুকরণের আবহকে রোখা তাঁর কাছে এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
অটুট দুর্গে ফাটলের শব্দ
তৃণমূলের গত তিনটি অজেয় জয়ের মূল চাবিকাঠি ছিল নিরেট মুসলিম ভোটব্যাংক। প্রথাগতভাবে কংগ্রেসের অনুগত মুসলিম পরিবারগুলো বাম আমলের পর গণহারে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিল একটিমাত্র কারণে- বিজেপিকে রুখতে যেন ভোট কাটাকুটির ঝুঁকি না হয়ে যায়। মমতা নিজে এই নির্ভরতাকে স্বীকার করেছেন তাঁর সেই বিতর্কিত ‘দুধেল গাই’ মন্তব্যে। ২০২৬-এর আগে সেই নিরেট দেওয়ালে অবশ্য ফাটলের শব্দ স্পষ্ট।
ভরতপুরের বিদ্রোহী বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের প্রকাশ্য হুংকার কিংবা নৌশাদ সিদ্দিকীর আইএসএফ-এর সক্রিয়তা শাসকদলের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। সংখ্যালঘু সমাজের একাংশ এখন আর কেবল ‘বিজেপি ঠেকানোর ঢাল’ হিসেবে ব্যবহৃত হতে রাজি নয়। মালদা, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুরে অথবা দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে এই ভোটের সামান্য অংশও যদি হাতছাড়া হয়, তবে তৃণমূলের নির্বাচনি অঙ্ক ওলটপালট হয়ে যেতে পারে।
উদারবাদ বনাম অস্তিত্বের সংকট
উত্তরপ্রদেশ বা গুজরাটের মতো উগ্র মেরুকরণ পশ্চিমবঙ্গে কোনওদিন সহজ ছিল না। কিন্তু নিরাপত্তার ‘ভয়’ বাঙালির মজ্জাগত ধর্মনিরপেক্ষতাকে গ্রাস করতে শুরু করেছে। বাংলার চিরাচরিত ‘উদারবাদ’ আজ কঠিন পরীক্ষার মুখে। যে বাঙালি এতদিন ‘ধর্ম যার যার, ভাষা সবার’ তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিল, ওপারের উগ্র মৌলবাদ তাদের সেই মনস্তত্ত্বে বড় ধাক্কা দিয়েছে। বিজেপি এই মনস্তাত্ত্বিক ফাটলটাকে কাজে লাগিয়ে বলতে চাইছে, ভাষার ভ্রাতৃত্ব আসলে একতরফা।
মোদি-শা জানেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনমোহিনী প্রকল্পগুলোকে টেক্কা দিতে তাদের হাতে একমাত্র তুরুপের তাস হল হিন্দু ভোটের একত্রীকরণ। অসমে হিমন্ত বিশ্বশর্মা যেভাবে জনতত্ত্বের পরিবর্তনের ভয় দেখিয়ে নির্বাচন জিতেছেন, বাংলায় শুভেন্দু অধিকারীরা সেই মডেল প্রয়োগ করতে চাইছেন।
বাংলাদেশের অস্থিরতা যত বাড়বে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ধর্মীয় পরিচয়ের লড়াই তত তীব্র হবে। তৃণমূল যদি তাদের মুসলিম ভোটব্যাংক ধরে রাখতে অতিরিক্ত সুর চড়ায়, তবে তা হিন্দু ভোটারদের বেশি করে বিজেপির দিকে ঠেলে দেবে। আবার যদি তারা বাংলাদেশের ঘটনায় হিন্দুদের পাশে দাঁড়িয়ে অতিসক্রিয়তা দেখায়, তবে হুমায়ুন কবীরদের মতো বিদ্রোহীরা মুসলিম ভোট কাটার ‘সুবর্ণ’ সুযোগ পেয়ে যাবেন।
একদিকে ১৫ বছরের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা ও দুর্নীতির অভিযোগ, অন্যদিকে বাংলাদেশের আঁচ মাখানো হিন্দু মেরুকরণ- সব মিলিয়ে তৃণমূলের সামনে এখন কঠিন অগ্নিপরীক্ষা। ২০২৬-এর লড়াই কেবল উন্নয়ন বা ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর হবে না, লড়াই হবে অস্তিত্ব আর পরিচিতির। ওপার বাংলার রক্তক্ষরণই কি শেষপর্যন্ত এপার বাংলার রাজনীতির ভাগ্য নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠবে? উত্তর লুকিয়ে আছে সময়ের গর্ভে।
