ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়
রোজ ভোর হতেই আমার ভালোবাসার গান ভাসতে ভাসতে চলে। বিচিত্র ঋতুর আঙিনা পেরোতে থাকে গান আর আমি দু’চোখে ভোর ভরে নিই। ভোরের আলোর পর্দা সরিয়ে, কচি রোদ্দুর গায়ে মেখে গান চলতে থাকে। গানের জন্য ফল কাটতে গিয়ে হাত কাটি। টিভির পর্দায় চাঁদপানা মুখের গান শুনতে শুনতে বেজার মুখে ওটসের বাটি বের করি…যেন চাঁদ দেখতে গিয়ে আমি বাঁদর দেখে ফেলেছি। গান একটু থামে আবার ফিরে আসে। বৈশাখী গ্রীষ্মের আবাহনে গীতবিতানের জানলা খুলে আবার ভেসে চলে গান। গীতাঞ্জলির গান। সঞ্চয়িতার গান। পঞ্চকবির গান। অনুরোধের গান। ছায়াছবির গান। হরেক কিসিমের গান। আর সেই গানভাসি টিভি পর্দায় গানের ফাঁকে ফাঁকে আসে এফএমসিজি’র পালাকীর্তন। পালাকীর্তনিয়া আছে তাই বেজে চলে পণ্যসংস্কৃতির অন্যতম ধারক ও বাহক এই গান।
ভোরের আলোর পরত ছিঁড়েখুঁড়ে গানভাসি ভোরের বাগানে খেলা করে হেলথ ড্রিংক, কোল্ড ড্রিংক, দাঁতের মাজন, মশক নাশের ওষুধ, সোনার গয়না, কাপড়াকাচা আর বাসন মাজার সাবান, সয়াবড়ি…এক আকাশের নীচে বিচিত্র সব পণ্যের রঙিন পসরায় গান ভেসে চলে আমার স্বপ্নপথে। এমন স্বপ্ন কখনও দেখিনি আমি। টিভিপর্দায় স্বর্গ এসেছে নামী। গানযাপন? নাহ! স্বপ্নপথে মায়াবন বিহারিণী হরিণীর সঞ্চরণের মধ্যেই সয়াচাঙ্ক এসে সব ধ্বস্ত করে দিয়ে যায়। মুষ্টিবদ্ধ রিমোট নিয়ে ভোর দখল করে বসে থাকি আমি। চুরমার হয় সে স্বপ্ন। আমার জীবন কোরা কাগজই হয়ে থাকে…
খুদে একরত্তি ডাক্তার বালিকার হুঁশিয়ারি… সুগার কন্ট্রোলে আছে তো? আমি প্রত্যুত্তরে বলে উঠি, হ্যাঁ, হ্যাঁ… এখন আর বারেবারে খিদে পায় না… কিউট গার্ল ‘গুড, গুড’ বলে হাতটা নেড়ে ‘কিপ ইট আপ’ বলে মুহূর্তে অন্তর্হিত হয়। কিন্তু তা সে যতই এনশিওর করুক আমি তো জন্মেও মুখে তুলিনা সেই মধুগন্ধী মধুমেহী হেলথড্রিঙ্ক…তাহলে?
নিদাঘ গ্রীষ্মে গ্যাস বেলুন আকাশে উড়তে শুরু করেছে…উড়ে যাক, যাক, যাক, যাক। যেমন ভাবা তেমনি কাজ। অমনি বাচ্চা একটা ছেলে গান ধরে। যাক, যাক যাক, এসো এসো…তাইতো। গরম পড়ছে যেই অমনি এসে গেছে ওরা মানে বোশেখের সঙ্গে লাইম অ্যান্ড লেমনি লিমকা.. তারপরেই ইঁদুর দৌড়ে কী করে পিছিয়ে থাকে লিমকার প্রতিদ্বন্দ্বী বাকিরা? কী করে বোঝাই তারে? জল ঢালা ভাতে কাগজি লেবু চটকে সে কী সুবাস!
মরুভূমির মধ্যে সেভেন আপ থরে থরে…নাকি তৃষ্ণা মেটাবে প্রাণ ভরে… সে কী সম্ভব? আপনিই বলুন ধর্মাবতার। ওভাবে গ্রীষ্ম নিধন সম্ভব আদৌ? স্বল্পবেশী নায়িকা পাগলা ছেলে বলে গাল দিয়েছে…তবুও ছেলেটি নাছোড়… প্রমাণ তাকে করতেই হবে…সে মরুভূমিতে বরফ এনেই ছাড়বে। মেয়েটির ভাবখানা বৃথা চেষ্টা তৃষ্ণা মিটাবার…
শেষটুকু আমি আওড়ে নিই… এ কেবল দিনেরাত্রে, জল ঢেলে ফুটা পাত্রে…সংসার করা অহোরাত্রে… কবি হেমচন্দ্র আমার স্বপ্নপথে…যেমন ভাবা অমনি দেখি একটা মেয়ে গাইছে… স্বপন-পারের ডাক শুনেছি, জেগে তাই তো ভাবি–
আমিও খুঁজে চলেছিরে কন্যা। সেই স্বপ্নলোকের চাবিটা… পাইনি এখনও। যখন হাতে পাব তখন ইটস টু লেট।
আবার গান ভেসে চলে… সৃজন ছন্দে আনন্দে নটরাজ মেতে ওঠেন টিভি পর্দায়… অপূর্ব গাইছে আজকালকার ছেলেমেয়েরা… কী দারুণ সব সঞ্চালনা সুবেশী, এলোকেশী আধুনিকাদের! ভাবছি এসব আর তখনই ছোট খোকাখুকিদের টেনে লম্বা করার প্রয়াস…আবার হেলথ ড্রিংক? পিডিয়াশিওরের পিণ্ডি চটকে ঠিকুজ্জী কুলুজী ঘাঁটতে ঘাঁটতে পরক্ষণেই রেশারেশি… দেখ আমি বাড়ছি মামি… এসব ডায়লগ সেকেলে…প্ল্যান কম করে একটু বেশিপ্ল্যান আর এখন শুধুই প্রতিযোগিতা… অ্যাম আ কমপ্ল্যান বয়…পরক্ষণেই গার্ল হবে না কেন? ভাবতে ভাবতেই দ্রুত লয়ে আবারও
জানিনে, জানিনে, কিছুতে কেন যে মন লাগেনা…বর্ষা সমাগত ততক্ষণে। বাইরে অঝোরে আষাঢ়ী বৃষ্টিতে বানভাসি পথঘাট আর ভেতরে অন্তরে অন্তরে আছো তুমি হৃদয় জুড়ে… বানভাসি গান… চিন্তার তাল কেটে যায়… কচিছানার হোমওয়ার্ক শেষ তবু হল্লিক ফুরায়না…গান ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে।
ভোর ফুরিয়েছে। চায়ের কাপ, ওটস, বিচিত্র সব বীচির উপাখ্যান তার মধ্যে নিমজ্জিত। বৌদি তখন চপিং বোর্ডে… থোড় বড়ির জঞ্জালে…শানিত ছুরি আর স্ক্রেপার হাতে হয়তো লাউয়ের খোসার ছেঁচকির জোগাড় করছেন মন দিয়ে…হয় আলু কাঁচা রেখেছে সহকারী কিংবা পেঁপেসেদ্ধর জল শুকোতে গিয়ে তলা ধরিয়েছে। উচ্ছেসেদ্ধর জল ফেলে দাওনি তো? শাকটা তিনবার ধুয়েছ তো? সেদিন বালি ছিল কিন্তু। আর মাছ প্রথমে হাই হিটে ছেড়ে তারপরেই আঁচ সিম করে দেবে, মনে আছে তো? বৌদির এসব রুটিন ডায়লগ… নয়ত মহার্ঘ সব বাজারে ঘোল ঢেলে দিয়ে যাবেন সহকারী থুড়ি সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস।
ভালো করে তুমি চেয়ে দেখ, দেখো তো চিনতে পারো কী না… আহা! বৌদিদির ইশকুলবেলায় সেবার পুজোর শারদঅর্ঘ্যতে রিলিজ করেছিল লতাজির এই গান… কী ভালো গাইছে মেয়েটি! আর সঞ্চালক গুগল অভিধান ঘেঁটে সেই গানের গুষ্টির খোঁজ দিচ্ছেন… ও মা! কী সুন্দর সাজ আজ মেয়েটির… মিষ্টি কথা বলে… আবারও স্বপ্নপথ ঘেঁটে ঘ।
সাতসকালে গহনা? আজ সে গয়নার আনন্দে খুশিতে ওপরে…আকাশ তার নীচে… আজ সে গয়না গায়ে এগিয়ে…সারা দুনিয়া তার পেছনে… এরে কয় আমার আপনহারা প্রাণ আমার বাঁধন ছেঁড়া প্রাণ… ঠিক সেই গানই ধরেছে একজন…কিন্তু ভরাবর্ষায় বসন্তের গান?
মন বলে, অমন হয়, হয়… জানতি পারো না।
বর্ষা মঙ্গল না হাতি! যতসব রোগের বাড়বাড়ন্ত, পোকামাকড়, মশা, মাছি সব ঘেঁটে দেয় জীবন।
কামড় দিয়েছি সবে এক টুকরো আপেলে। ওমা গো! শিরশিরানি থেকে দ্রুত আরাম… সেই যে বলছিলনা মেয়েটি সেদিন… দ্রুত আরাম পাওয়া যায়… কী যেন কী যেন? মনে পড়েছে বাঘা বায়েন গুপী গাইন, আমার চাই দাঁতের ডাইন। সেটাই সেই মুহূর্তে আমার স্বপ্নলোকের চাবিকাঠি…গুরুগম্ভীর কণ্ঠে দাঁতের শিরশিরানির থেকে মুক্তি পেয়ে বলছে ‘ইট ওয়ার্কস’। রিয়েলি? নাকি বুজরুকি না ভেলকি? ডেন্টাল সার্জনদের ভাতে মারার কৌশল নয়তো? কোনটা কিনব বলবেন হে ধর্মাবতার? র্যাপিড রিলিফ না রিপেয়ার-প্রোটেক্ট? ভাবতে ভাবতেই আবার গান এসে সব ভেস্তে দিল… আহা গজল! বাহ! গজল… আজকাল সব ছেলেমেয়েরা গানের এই ধারাটিও দিব্য রফত করেছে…কখনও জগজিৎ সিংহ, কখনও মেহেদি হাসান তো কখনও ওস্তাদ রাশিদ খান… আমার স্বপ্নপুরে তখন লাল, নীল, হলুদ, সবুজ পর্দা উড়ছে…আলো আঁধারি হুঁকা বারের আবহ সবেমাত্র তৈরি হয়েছে কী হয়নি… ব্যাস! হুঁকার আলবোলার নলে সুখটান দিতে না দিতেই মশককুলের সমবেত হানা…ভ্রামরীর নিনাদ…নবজাতকের ঘুম রসাতলে কারণ মশক নিধনের তেলে আগের মতো কাজ হচ্ছে না। তাই সারারাত বাপমায়ের শান্তিতে ঘুমের জন্য নতুন চমক…আরও কড়া তেল… রাতকাবার হয়ে যাবে…ওরে ওরে এত রাসায়নিক ভালো নয় রে…এভরি অ্যাকশন হ্যাজ আ রিয়াকশন। বোঝাই মন কে… আষাঢ় শ্রাবণ মানে না তো মন গাইছেন একজন। কিন্তু এলো বরষা মানেই ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়া সহসা। তাই গুডনাইটেই ভরসা। আলোর তরীটি বেয়ে ওরা হঠাৎ করেই চলে আসে আর চমক দেয় টিভি পর্দায়…শুভরাত্তিরেরও পাশাপাশি মর টিন, অল আউট। আমি কনফিউজড। তবে আমি হলাম গিয়ে ভবি… ভুলিনা সেসবে…আমার কেবলি ভয় আরাম না হারাম হয়। যতই মশার কামড়ের হাত থেকে রেহাই দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিক ওদিকে ওরা গানে গানে ভুবন ভরিয়ে দেয়।
ওদিকে তখন বাপবেটার জমিবাড়ির তর্জা তুঙ্গে… কারণ ঠিকই বলছে মনে হয় বাবা… বাড়ি তো একবারই বানাবি বাছা। বাপের কথার মান্যতা দিয়েছে অবিশ্যি একালের ছেলে…ইউজ অ্যান্ড থ্রোর যুগে জেন-জিকে আশীর্বাদ জানাই মনে মনে…
কিন্তু আবারও সংশয় নীল পর্দায়। হরেক কিসিমের সুস্বাদু বিস্কুট সেখানে।
ডাক্তারবাবু বলেছেন ময়দা, চিনি আর পাম তেল দেওয়া বিস্কুট মুখে না তুলতে অথচ বিস্কুটে কে না বশ হয়! আমি আবারও কনফিউজড। ওদিকে এফএমসিজি’র পালাকেত্তন অব্যাহত।

