এক রাখাল আর এক ভবঘুরে

এক রাখাল আর এক ভবঘুরে

খেলাধুলা/SPORTS
Spread the love


দীপায়ন ভট্টাচার্য

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘লোকসাহিত্য’ গ্রন্থে যথার্থই লিখেছিলেন, ‘হরগৌরীর গান যেমন সমাজের গান, রাধাকৃষ্ণের গান তেমনি সৌন্দর্যের গান।’ মধ্যযুগীয় বাংলার সাহিত্যে এই দুই যুগলের আখ্যানে প্রথমোক্তদের দাম্পত্যবন্ধন আর শেষোক্তদের সম্পর্ক পরকীয়া হিসেবে বর্ণিত। তবে এই বিবরণীতে ঐশ্বরিক মহিমার চেয়ে তাঁদের লৌকিক ও সামাজিক রূপবৈচিত্র্যই বেশি স্পষ্ট। দেবত্বের অলৌকিক সীমানা পেরিয়ে দেবদেবী কীভাবে বাংলার আটপৌরে সমাজ সদস্যে রূপান্তরিত হয়েছেন, এই চালচিত্রে তারই মানবিক পরিচয় খোঁজা হয়েছে। এই ধারায় মহাদেব শিব আবির্ভূত হন এক সংসারী অথচ ভবঘুরে রূপে, আর শ্রীকৃষ্ণ ধরা দেন এক চঞ্চল রাখাল বালকের মূর্তিতে। বাংলার নিজস্ব মনস্তত্ত্ব ও শান্তরসের টানেই এই দুই চরিত্রের এমন অপার্থিব মানবিকীকরণ ঘটেছে।

১৭৫৩ খ্রিস্টাব্দে রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র রচিত ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে শিবের এই ভবঘুরে রূপটি প্রকট। যজ্ঞস্থলে দক্ষরাজা জামাতা শিবের নিন্দা করে বলছেন, তিনি গৃহী হয়েও ভিক্ষা মেগে খান, অতিথি সেবার সংগতি নেই এবং তাঁকে সন্ন্যাসী বলারও কারণ নেই। সতীর মৃত্যুর পর প্রথমে দক্ষযজ্ঞ নাশ করে, তারপর তাঁর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে বিশ্বজুড়ে শিবের যে আকুল পরিভ্রমণ, তা এক বিরহী ভবঘুরেরই আর্তনাদ। পরে বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে সতীদেহ ছিন্নভিন্ন হলে তাঁর সংবিৎ ফেরে এবং হিমালয়-কন্যা উমার সঙ্গে তাঁর পুনর্বিবাহ হয়, যেখানে বরযাত্রী স্বয়ং ভূতপ্রেতের দল। দেবী অন্নপূর্ণাও পরে ঈশ্বরী পাটনির কাছে আক্ষেপ করে বলেন, তাঁর পতি ভূত নাচিয়ে ঘরে ঘরে ঘোরেন। আবার সপ্তদশ শতাব্দীর পরবর্তী ‘শিবায়ন’ কাব্যে দেখা যায়, পার্বতীর পরামর্শে ভিক্ষা ছেড়ে শিব চাষবাসে মন দিলেন। কিন্তু কৃষিকাজে মগ্ন হয়ে ভোলা ঘরের কথাই ভুলে গেলেন, শেষে পার্বতীকে ‘বাগদিনী’ রূপ ধারণ করে তাঁর ভবঘুরেপনা ঘুচিয়ে সংসারে থিতু করতে হল।

অন্যদিকে, শ্রীকৃষ্ণকে আমরা চিনি গোপালক পরিবারের স্নেহের দুলাল ‘গোপাল’ হিসেবে। তিনি বসুদেব-দেবকীর সন্তান হলেও ব্রজে যশোদানন্দন রূপেই তাঁর পরিচয় এবং নিজের বাড়িতে ‘ননীচোরা’ অখ্যাতি থাকলেও পালক পিতা-মাতা বাৎসল্যবশে তাঁকে বাড়াবাড়ি কিছু বলেন না। পদকর্তা বলরাম দাসের লেখনীতে এই রাখালের বাল্যলীলার এক অপরূপ চিত্র পাওয়া যায়, যেখানে শিশু কৃষ্ণ শ্রীদাম-সুদামার সঙ্গে মাঠে বাছুর চরাতে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল। সে মায়ের কাছে চূড়া বেঁধে দেওয়া এবং হাতে মুরলী তুলে দেওয়ার আবদার করছে, কারণ রাজপথে সখা শ্রীদাম তার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। গোচারণভূমির এই গোষ্ঠলীলার কৌতূহলজনক কর্মকাণ্ডের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে এক পরম লৌকিক ও সামাজিক বন্ধন।

এই গোচারণের মাঝে জড়িয়ে রয়েছে যশোদা মায়ের তীব্র উৎকণ্ঠা। পদকর্তা যাদবেন্দ্র দাসের একটি পদে মায়ের এই আর্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেখানে তিনি নিজের কিরা কেটে ‘পরাণের পরাণ নীলমণি’-কে ধেনুর আগে না যেতে এবং মোহন বাঁশিটি এমনভাবে বাজাতে বলছেন যাতে ঘরে বসেই সেই সুর শোনা যায়। এই চরণে ফুটে ওঠে গ্রামীণ মায়ের চিরন্তন মাতৃত্বের সুর, যা সন্তানকে নিরাপদ রাখতে চায়। যেখানে ভবঘুরে শিব ঘর ভুলে বাইরের জগতে মগ্ন থাকেন, সেখানে রাখাল কৃষ্ণ মাতৃস্নেহের নিবিড় বন্ধনে ঘরের সঙ্গেই বাঁধা থাকেন। পরবর্তীতে এই গোপালই কৈশোরের শেষে তাঁর প্রণয়িনী রাধাকে বেছে নিয়েছিলেন।

এইভাবে দৈবী ঐশ্বর্যের চোখধাঁধানো মহিমা বাংলার উঠোনে এসে হয়ে পড়েছিল আটপৌরে গার্হস্থ্যের স্নিগ্ধতায় শান্ত। তীব্র অলৌকিকত্বের চেয়ে বাঙালি সমাজ বরাবরই ঘরের চেনা শান্তরস আস্বাদন করতে বেশি কাঙাল। এক রাখাল আর এক ভবঘুরের এই যাপনচিত্র আসলে মধ্যযুগীয় বাংলার সমাজমনস্তত্ত্বেরই এক বিশ্বস্ত দর্পণ।

(লেখক নাট্যশিল্পী ও প্রাবন্ধিক। কোচবিহারের বাসিন্দা।)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *