উৎসবে বাংলা

শিক্ষা
Spread the love


রাজনৈতিক পালাবদলের পর বাংলায় দুর্গাপুজোর আয়োজন কেমন হয়, তা নিয়ে কৌতূহল কম ছিল না। মহালয়ায় এলাহি আয়োজনের মাধ্যমে আমিষ-নিরামিষ বিতর্ক, রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে হকার উচ্ছেদ, পুজো কমিটিগুলির মাথা বদল ইত্যাদি সত্ত্বেও রাজ্যজুড়ে সরকারি উদ্যোগে ধুমধামের সঙ্গে দুর্গোত্সবের সূচনা হয়েছে। বাঙালি কীভাবে দুর্গাপুজো করবে, তা নিয়ে একশ্রেণির মাতব্বরের ফতোয়ায় খানিকটা হলেও সংশয়ে ছিল আমজনতা।

কিন্তু চতুর্থী, পঞ্চমী, ষষ্ঠীতে কলকাতা, শিলিগুড়ি সহ রাজ্যের নামীদামি পুজো প্যান্ডেলগুলিতে জনপ্লাবনে পরিষ্কার, উত্সবপ্রিয় বাঙালি দুর্গাপুজোয় কোনও মাতব্বরি সহ্য করবে না। নিষ্ঠা, ভক্তি, আনন্দ, ভালোবাসা এবং উত্সবমুখর মানসিকতা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গবাসীর এত বছরের দুর্গাপুজোয় এতটুকু টাল পড়েনি। বরং আরও জাঁকজমকপূর্ণ হয়েছে।

রাজ্য সরকারের সাড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনে উৎসব বরং নয়া পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় আচার বা সামাজিক উৎসব নয়। এটা বাঙালির আত্মপরিচয়, আবেগ, সংস্কৃতির অনন্য প্রতীক। রাজ্য সরকার, পুলিশ ও প্রশাসনের সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় পশ্চিমবঙ্গে এই উৎসবের আবহ বুঝিয়ে দিয়েছে, ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও বাঙালির চিরায়ত আবেগ এবং সংস্কৃতির ধারায় ছেদ পড়েনি।

উৎসবের মূল শক্তি মিলন, সম্প্রীতি ও সর্বজনীনতা। নতুন রাজ্য সরকার এই চিরন্তন সত্যটিকে উপলব্ধি করে দুর্গাপুজোকে নতুন স্তরে উন্নীত করেছে। গ্রাম থেকে শহর- সর্বত্র আলোকসজ্জা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন এবং সুশৃঙ্খল পরিবেশ গড়ে তোলায় সরকারি ভূমিকা স্পষ্ট। সরকারের বিভিন্ন নান্দনিক কর্মসূচি উৎসবের আমেজ আরও বাড়িয়েছে।

কলকাতার রাজপথ থেকে প্রতিটি জেলা শহর, মফসসল, গ্রামীণ এলাকার প্রতিটি গলি রোশনাইয়ে ঝলমল করছে। সরকার বদল হলে অনেক সময় দেখা যায়, পুজো কমিটি ও ক্লাবগুলি প্রশাসনিক জটিলতা বা সহযোগিতার অভাবের শঙ্কায় চিন্তিত থাকে। কিন্তু এবছর রাজ্য প্রশাসন প্রথম থেকে উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। সরকারি অনুদান দেওয়ায় কিছুটা লাগাম টানা হয়েছে বটে। যাদের দরকার নেই, তাদের অনুদান না নেওয়ার আর্জি জানিয়েছিলেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

যুক্তিগ্রাহ্য সেই আর্জিতে সাড়া দিয়েছে অনেক কমিটি। এছাড়া পুজো প্যান্ডেল নির্মাণের অনুমতি প্রক্রিয়ার সরলীকরণ, ট্রাফিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার আগাম প্রস্তুতি, বিদ্যুৎ ও অগ্নিনির্বাপণ পরিষেবার তদারকি নির্বিঘ্নে চলছে। মণ্ডপগুলিতে দর্শনার্থীদের ভিড় সামলাতে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ তত্পর। দুর্গাপুজোর অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে রাজ্যের অর্থনীতিতে বিপুল গতি সঞ্চারিত হয়।

মৃৎশিল্পী, প্যান্ডেল নির্মাতা, ডেকোরেটার, আলোকশিল্পী, ঢাকি ও হস্তশিল্পের কারিগর থেকে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সঙ্গে যুক্ত লক্ষ লক্ষ মানুষ এই উৎসবে সারাবছরের রুজিরুটি খুঁজে পান। সরকারি ব্যবস্থাপনায় উৎসবের নির্বিঘ্ন আয়োজন প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রা এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক উদ্দীপনা জুগিয়েছে। ছোট-বড় নানা ব্যবসার প্রসার ঘটেছে। সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও পরিবর্তন লক্ষ করা গিয়েছে।

বহু পুজো কমিটি ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি সামাজিক নানা বার্তা এবং আবহমান বাংলার লোকশিল্পকে ফুটিয়ে তুলেছে। উৎসবের এই মহামিলনক্ষেত্রে সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে মানুষ একসঙ্গে পথ হাঁটছে। ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি বা রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে একসূত্রে বেঁধেছে এই উৎসব। সংঘাত ও মেরুকরণের আবহ পার করে বাঙালির দুর্গাপুজোয় শান্তির ও সংহতির মূল সুরই ধ্বনিত হচ্ছে।

দুর্গাপুজো শুধু পঞ্জিকামতে কয়েকটি দিনের আনন্দ উদযাপন নয়। এটা আট থেকে আশি- সমস্ত বয়সের বাঙালির প্রাণশক্তি ও স্বাতন্ত্র্যের অঙ্গীকার। সরকারের পরিকল্পনায় বাংলার উৎসব-সংস্কৃতি মহাআড়ম্বরে শুরু হয়ে গিয়েছে। বাঙালির প্রাণের উৎসবে চারপাশের এই অনাবিল আনন্দ, সৌহার্দ্য ও আলোকোজ্জ্বল পরিবেশ অব্যাহত থাকুক- এই মুহূর্তে এটাই কামনা। দুর্গাপুজোয় রাজ্যে শান্তি, সমৃদ্ধি ও পারস্পরিক ভালোবাসার বন্ধন আরও দৃঢ় হোক।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *