অন্য এক প্রেমের হাওয়ায়

অন্য এক প্রেমের হাওয়ায়

শিক্ষা
Spread the love


  • তৃষ্ণা বসাক

উচক্কা বয়সের দুটো ছেলেমেয়ে। ঝকঝকে কেরিয়ার দুজনেরই। স্কুল বয়স থেকে প্রেম। অন্যদের থিম সং যখন ‘ফুলের বনে যার পাশে যাই তারেই লাগে ভাল’, তখন কোনও ঝড়েই এদের সম্পর্ক টলেনি এতটুকু। যথাসময়ে বিয়েও করল তারা। দে লিভড হ্যাপিলি দেয়ার আফটার- গল্পটা এভাবেই শেষ হবার কথা ছিল। কিন্তু কাহিনীতে ভিলেন হাজির। ভিলেন আবার কে? সেখানেই তো এই গল্পের টুইস্ট। বিশবায়িত কর্মক্ষেত্র আলাদা আলাদাভাবে দুজনের সামনে দুটো অতি লোভনীয় অফার নিয়ে এসে হাজির হল। এদিকে ওরা যে ছোট থেকেই ভেবে এসেছে বিয়ে করে এক ছাদের তলায় থাকবে আর চুটিয়ে সংসার করবে। এখন ছাদ আলাদা, এমনকি দেশও আলাদা হবার জোগাড়। তাহলে কি একজন স্যাক্রিফাইসের পথে হাঁটবে? এতদিনের চিরাচরিত গল্পের  মতো মেয়েটিই নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দিয়ে পতির কেরিয়ারেই নিজের আনন্দ খুঁজে নেবে? পরে বোর লাগলে জুটিয়ে নেবে ছোটখাটো কিছু? কিন্তু ওরা নিজেদের যেমন ভালোবাসে, কেরিয়ারকেও যে তেমন, কিংবা তার থেকেও বেশি ভালোবাসে। ছোট থেকে তিলতিল করে গড়া। শেষ পর্যন্ত দুজনে আইনত আলাদাই হয়ে গেল। পাড়ি দিল নিজেদের কাজের জায়গায়। তৃতীয় ব্যক্তি নয়, নিজেদের ভালোবাসার অভাব নয়, শ্বশুর-শাশুড়ির নাক গলানো নয়, স্রেফ নিজেদের সুবিধের জন্য বিচ্ছেদ। এ কি শুধু ভালোবাসার রং বদল? এ তো দিক বদলও। একেই তো বলা হচ্ছে সিচুয়েশনশিপ।
সোশ্যাল মিডিয়ার স্ট্যাটাসে  তাই জ্বলজ্বল করছে ইন আ রিলেশনশিপ নয়, বরং  ইন আ সিচুয়েশনশিপ!

এই সিচুয়েশনশিপে পড়লে অমন বক্তিয়ার অমিট্রায়েরও বুঝি বাক্যি েহরে যেত।
যিনি গঙ্গার ধারে পিকনিকে গিয়ে জনৈক লিলিকে বলেছিলেন
‘গঙ্গার ও পারে ঐ নতুন চাঁদ, আর এ পারে তুমি আর আমি, এমন সমাবেশটি অনন্তকালের মধ্যে কোনওদিনই আর হবে না।’

লিলির  মন এক মুহূর্তে ছলছলিয়ে উঠলেও সে জানত এসব কথা বুদবুদ ছাড়া কিছু নয়। তাই নিজেকে ক্ষণকালের ঘোর-লাগা থেকে ঠেলা দিয়ে সে হেসে উঠল ‘অমিত, তুমি যা বললে সেটা এত বেশি সত্য যে, না বললেও চলত। এইমাত্র যে ব্যাংটা টপ করে জলে লাফিয়ে পড়ল এটাও তো অনন্তকালের মধ্যে আর কোনওদিন  ঘটবে না।’

অমিত হেসে উঠে বললে, ‘তফাত আছে, লিলি, একেবারে অসীম তফাত। আজকের             সন্ধ্যাবেলায় ওই ব্যাঙের লাফানোটা একটা খাপছাড়া ছেঁড়া জিনিস। কিন্তু তোমাতে আমাতে চাঁদেতে, গঙ্গার ধারায়, আকাশের তারায়, একটা সম্পূর্ণ ঐকতানিক সৃষ্টি– বেটোফেনের চন্দ্রালোক-গীতিকা। আমার মনে হয় যেন বিশ্বকর্মার কারখানায় একটা পাগলা   স্বর্গীয় স্যাকরা আছে; সে যেমনি একটি নিখুঁত সুগোল সোনার চক্রে নীলার সঙ্গে হিরে এবং হিরের সঙ্গে পান্না লাগিয়ে এক প্রহরের আংটি সম্পূর্ণ করলে অমনি দিলে সেটা সমুদ্রের জলে ফেলে, আর তাকে  খুঁজে পাবে না কেউ।’

‘ভালোই হল, তোমার ভাবনা রইল না, অমিত, বিশ্বকর্মার স্যাকরার বিল তোমাকে শুধতে হবে না।’

‘কিন্তু লিলি, কোটি কোটি যুগের পর যদি দৈবাৎ তোমাতে আমাতে  মঙ্গলগ্রহের লাল অরণ্যের ছায়ায় তার কোনও- একটা হাজার-ক্রোশী খালের ধারে মুখোমুখি দেখা হয়, আর যদি শকুন্তলার সেই জেলেটা বোয়াল মাছের পেট চিরে আজকের এই অপরূপ সোনার   মুহূর্তটিকে আমাদের সামনে এনে ধরে, চমকে উঠে মুখ-চাওয়া-চাউয়ি করব, তারপরে কী হবে ভেবে দেখো।’

পাগলা স্যাকরার গড়া এমন  কত মুহূর্ত খসে পড়ে গেছে, শুধু অমিত রায়ের নয়, আরও কত মানুষ মানুষীর।

অমিট্রায়ে যদি শুনতেন ২০২৫-এ প্রেমের ফিউচার ফোরকাস্টে পুরুষের রুটি কামানোর দিকটা মোটেই গুরুত্ব পাচ্ছে না, তেমনি মেয়েদের লবঙ্গলতিকা, ‘হিলা হিলায়ে লেডিজ’ ইমেজটাও দরকারি নয় মোটেই, তবে তিনি মুচ্ছো যেতেন কি না জানি না, তবে লিলিরা সিলিকন বুক দিয়ে বিশেষ সুবিধে করতে পারত না। কিন্তু এও সত্য, প্রেমের লাবণ্য নয়, কেতকী এখন কত কী শরীর চিনছে।  শরীর নিয়ে প্রথম পদক্ষেপ নিতে মেয়েরা ঝেড়ে ফেলছে সব ট্যাবু। শাশ্বত গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি কবিতা যেমন।
‘নতুন আলাপ হওয়া পুরুষ সঙ্গীকে নিয়ে
তুমি এসেছ ভেদিক ভিলেজে
সূর্যাস্তের পাখিরা  বন্ধুদের ডাকনামে
ডাকতে ডাকতে বাসায় ফিরছে,
…ঘনিয়ে ওঠা সন্ধ্যায় তোমাদের এই ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড…
সেখানে কাঁকড়াবিছের ট্যাটু, সঙ্গীটি প্রথমে ঠোঁট রাখল তোমার সেই কাঁধে

মনে হল কাঁধে এসে বিঁধল দূর কোন নক্ষত্রের আলো
যে নক্ষত্র শুরুতেই মৃত…’
তবে  অমিত লাবণ্যের যে দুই পারে দুটি বাড়ির ভাবনা, সেটাই যে নতুন  দিনের প্রেমের ইন থিং, অর্থাৎ লং ডিস্ট্যান্স রিলেশনশিপ এখন নিও নর্মাল – সেটা দেখলে তাঁর ভালো লাগত বেশ। যদিও ট্রেন্ডের আসল জিনিসটি অর্থাৎ ৬০ শতাংশ প্রেমের ফাঁদই যে এখন অনলাইনে পাতা হয়, তাতে তিনি কতটা সুবিধে করতে পারতেন কে জানে। শাশ্বতরই আর একটি লেখা…।
‘যে ছেলেটা চ্যাট করছে, সে আসলে টাকমাথা বুড়ো
‘ছিমছাম গৃহবধূ’ পরিচয় প্রোফাইলে লিখে
যে মেয়েটা কোকিলের ডাক হয়ে কথা বলে গেল
সে আসলে ডাইনি এক, পিচ্ছিল গুহায় একা থাকে
ঠোঁটে লিপগ্লস নয়, শুকনো রক্তের দাগ লাগা
দুর্লভ শিকড়, জড়িবুটি, মৃত পশুদের হাড়
কালো ম্যাজিকের জন্যে ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করে…।’

তিনি জানতেও পারতেন না যার সঙ্গে চ্যাট করছেন সে নবীনা নয়, হয়তো মেয়েও নয়, বৃদ্ধ বা এলজিবিটিকিউ কোনও মানব।
তবে এতকিছুর পরে সেই শিমুলতলা মধুপুরের মহুয়া তাপস পালের প্রেমের দিকে যদি তাকিয়ে থাকে কেউ, তার হয়তো মোহভঙ্গ হবে অচিরেই। ক্ষমা করবেন জীবনানন্দ, সেই হতাশ হৃদয়ের জন্য আপনার কবিতাটি লিখতেই হল নতুন করে,  –
সুরঞ্জনা, ইনবক্সে যেয়ো নাকো তুমি,
চ্যাট কোরো নাকো  ওই যুবকের সাথে;
অনলাইনে এসো  সুরঞ্জনা
সবুজ আলোর মতো  মেসেঞ্জারে
জ্বলো  এই রাতে
#
ফিরে এসো সাইবার পথে
ফিরে এসো ক্যাফেতে একবার ;
এসপ্রেসো ঠান্ডা করে,
অই হুঁক্কাবারে
উচক্কা যুবকের সাথে  যেয়ো নাকো আর।
#
কী কথা তাহার সাথে? তাহাদের সাথে?
আকাশে বাতাসে ঝাক্কাস
যন্ত্রিকার মতো তুমি আজ :
তার প্রেম রিল হয়ে আসে।
#
সুরঞ্জনা,
তোমার হৃদয় আজ লাশ
অক্সিজেন-বিরল এ বাতাসে
নেটওয়ার্ক ছিঁড়ে ছিঁড়ে আসে
#
সুরঞ্জনা, নিশিপাবে যেয়ো নাকো তুমি,
টিন্ডারে ঝুমো নাকো যুবকের সাথে;
অনলাইনে এসো সুরঞ্জনা
সবুজ ঘাসের দেশ হয়ে থাকো মেসেঞ্জারে
ডিজিটাল দ্বীপের ভেতর।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *