ইউরোপে ভারতের নয়া মেরুকরণ

ইউরোপে ভারতের নয়া মেরুকরণ

শিক্ষা
Spread the love


হর্ষবর্ধন শ্রিংলা

বিশ্বের ভূ-রাজনীতি এখন এক অদ্ভুত এবং জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে জলবায়ু সংকটের রক্তচক্ষু, অন্যদিকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ইঁদুর দৌড় এবং অর্থনৈতিক জোটগুলোর রাতারাতি ভাঙাগড়া। ঠিক এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে ভারতের বিদেশনীতিতে এক বিশাল কৌশলগত পরিবর্তন চোখে পড়ছে। একসময় ইউরোপের মানচিত্রে যে নর্ডিক দেশগুলো ভারতের কাছে নেহাতই ‘প্রান্তিক’ বা কম গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হত, আজ তারাই ভারতের বিশ্বজয়ের স্বপ্নের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। সম্প্রতি নরওয়ের রাজধানী অসলোতে অনুষ্ঠিত তৃতীয় ভারত-নর্ডিক শীর্ষ সম্মেলন এই নতুন সমীকরণেরই সবচেয়ে বড় প্রমাণ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সুইডেন ও নরওয়ে সফর কোনও সাধারণ ইউরোপীয় ট্যুর বা ছুটির মেজাজে কাটানো ট্রিপ ছিল না। এটি ছিল এক অত্যন্ত সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যার লক্ষ্য হল নর্ডিক অঞ্চলকে ভারতের কূটনীতির মূলস্রোতে নিয়ে আসা। বিগত কয়েক মাসের হিসেব দেখলেই এই বদলটা স্পষ্ট হয়ে যাবে। মার্চ মাসে ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্তাবের ভারত সফরের সময় দুই দেশের সম্পর্ককে ‘ডিজিটাল এবং সাসটেইনেবিলিটি’-র ক্ষেত্রে কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত করা হয়। এরপর মে মাসে সুইডেনের গোথেনবার্গে বৃহত্তর কৌশলগত চুক্তি এবং ঠিক তার পরের দিন নরওয়েতে ‘গ্রিন স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’ স্বাক্ষরিত হয়। সামিটের ফাঁকে ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড এবং আইসল্যান্ডের রাষ্ট্রনেতাদের সঙ্গেও আলাদা করে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। বার্তাটা খুব পরিষ্কার— ভারত এখন এই নর্ডিক বলয়কে শুধু কয়েকটি ছোট অর্থনীতির দেশ হিসেবে দেখে না, বরং প্রযুক্তি, জলবায়ু, সমুদ্র-কূটনীতি এবং কৌশলগত বৈচিত্র্যের এক মহামূল্যবান অংশীদার হিসেবেই বিবেচনা করে।

ভারতের এই নর্ডিক-উদ্যোগ কিন্তু রাতারাতি শুরু হয়নি। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেট ফ্রেডেরিকসেনের সঙ্গে ফোনকলে গ্রিন স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ নিয়ে আলোচনা করেছিলেন মোদি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নয়াদিল্লিতে ‘এআই ইমপ্যাক্ট সামিট’-এর ফাঁকে ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে কোয়ান্টাম, সিক্স-জি এবং প্রতিরক্ষার মতো বিষয়ে জোর দেওয়া হয়। মে মাস আসতে আসতে এই কূটনৈতিক সম্পর্কগুলো একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে যায়। নর্ডিকদের সঙ্গে ভারতের এই সম্পর্ক এখন আর কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি অত্যন্ত সুগঠিত এবং নির্দিষ্ট পরিকাঠামো মেনেই এগোচ্ছে, যার পরবর্তী শীর্ষ সম্মেলন হতে চলেছে ফিনল্যান্ডে।

হঠাৎ নর্ডিক দেশগুলোর এত কদর বাড়ার কারণটা খুব সহজ। জনসংখ্যার দিক থেকে এরা ছোট হতে পারে, কিন্তু মূলধন, উদ্ভাবন এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতার দিক থেকে এরা বিশ্বের অনেক তাবড় দেশকে গোল দিতে পারে। নর্ডিক দেশগুলোর সম্মিলিত অর্থনীতির পরিমাণ এখন ২ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ২০২৪ সালে ভারতের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যের পরিমাণ ছুঁয়েছে প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে ভারতে ৭০০টিরও বেশি নর্ডিক কোম্পানি কাজ করছে, আর ওই দেশগুলোতে প্রায় ১৫০টি ভারতীয় কোম্পানির জোরালো উপস্থিতি রয়েছে। কিন্তু শুধু এই সংখ্যার হিসেবে নর্ডিকদের আসল কদর বোঝা যাবে না, আসল আকর্ষণ লুকিয়ে আছে তাদের গুণগত মানে। ‘গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স ২০২৫’-এ সুইডেনের স্থান দ্বিতীয়, ফিনল্যান্ড সপ্তম, ডেনমার্ক নবম এবং নরওয়ে ২০তম। পরিকাঠামোর দিক থেকে নরওয়ে গোটা বিশ্বে প্রথম সারিতে। ভারত এখন চাইছে নিজেদের বিপুল উৎপাদন ক্ষমতার সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তি এবং দূষণমুক্ত শিল্প কাঠামোর মেলবন্ধন ঘটাতে। আজকের দিনে যখন বিশ্বজুড়ে সাপ্লাই চেন বা সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে চরম উদ্বেগ, প্রযুক্তি আদানপ্রদানে কড়াকড়ি চলছে, তখন নর্ডিক দেশগুলো ভারতকে ঠিক সেই জিনিসগুলোই দিতে পারে— উচ্চমানের ইঞ্জিনিয়ারিং, সবুজ শিল্প, ডিজিটাল দক্ষতা এবং স্থিতিশীল নীতি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বাণিজ্যের সঠিক সময়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে, আর তার আগেই ২০২৫ সালের অক্টোবরে কার্যকর হয়েছে ‘ইন্ডিয়া-ইএফটিএ’ বাণিজ্য চুক্তি বা টেপা। অসলো সামিটে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, এই টেপা চুক্তির মূল লক্ষ্য হল আগামী ১৫ বছরে ভারতে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বিপুল বিনিয়োগ আনা এবং প্রায় ১০ লক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি করা। সহজ কথায়, ভারতের বিপুল আর্থিক বৃদ্ধির সঙ্গে ইউরোপের পুঁজি ও প্রযুক্তির মধ্যে সবচেয়ে বড় সেতু হতে চলেছে এই নর্ডিক অঞ্চল।

প্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দেশগুলোর ভূমিকা ভারতের কাছে অসীম। সুইডেন এখন ভারতের অন্যতম সেরা প্রযুক্তিগত অংশীদার হয়ে উঠেছে। নতুন চুক্তিতে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নেওয়ার পাশাপাশি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই, সিক্সজি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, মহাকাশ এবং প্রতিরক্ষার মতো অত্যাধুনিক বিষয়ে হাত মিলিয়েছে দুই দেশ। হরিয়ানায় সুইডিশ কোম্পানি ‘সাব’-এর কার্ল গুস্তাফ অস্ত্র কারখানা ইতিমধ্যেই সেই প্রতিরক্ষায় আত্মনির্ভরতার এক বড় উদাহরণ। অন্যদিকে, ডেনমার্ক হল ভারতের সবচেয়ে পোড়খাওয়া ‘গ্রিন পার্টনার’। ২০২০ সালে শুরু হওয়া এই পার্টনারশিপ এখন বাস্তবের মাটিতে কাজ শুরু করেছে, যার অন্যতম নিদর্শন হল বারাণসীতে নদীর দূষণ রুখতে তৈরি ‘স্মার্ট ল্যাবরেটরি’। ডেনমার্কের প্রযুক্তি ভারতের শক্তি রূপান্তরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। নরওয়ের কাছে ভারতের পাওনা আবার অন্যরকম। দীর্ঘ ৪৩ বছর পর মোদির এই অসলো সফর থেকে উঠে এসেছে একাধিক সাফল্য। নরওয়ে এখন ভারতের ‘ইন্দো-প্যাসিফিক ওশানস ইনিশিয়েটিভ’-এর অংশ। সবুজ জাহাজ চলাচল বা গ্রিন শিপিং, মেরু গবেষণার পাশাপাশি নরওয়ের ‘গভর্নমেন্ট পেনশন ফান্ড গ্লোবাল’ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারতের শেয়ার বাজারে প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে রেখেছে! ফিনল্যান্ড আবার সিক্সজি, এআই, সেমিকনডাক্টর এবং স্টার্টআপের মতো ভবিষ্যতের প্রযুক্তিতে ভারতের প্রধান ভরসা হয়ে উঠছে, যেখানে আইসল্যান্ডের সঙ্গে জোর দেওয়া হচ্ছে ভূতাপীয় শক্তি বা জিওথার্মাল এনার্জি এবং মৎস্য চাষে। ভারত খুব বুদ্ধিমত্তার সঙ্গেই এই পাঁচটি দেশকে একই পাজলের পাঁচটি পরিপূরক টুকরো হিসেবে দেখছে।

এই নর্ডিক বন্ধুত্বের একটা কড়া সামরিক এবং ভূ-রাজনৈতিক দিকও রয়েছে, যা এড়িয়ে গেলে চলবে না। গোটা নর্ডিক বলয় এখন ন্যাটো-র অন্তর্ভুক্ত। ২০২৩ সালে ফিনল্যান্ড এবং ২০২৪ সালে সুইডেন ন্যাটোতে যোগ দেওয়ায় এই অঞ্চলের কৌশলগত ওজন অনেকটাই বেড়ে গেছে। ভারত যদিও কোনো সামরিক জোটের অংশ হতে চাইছে না, কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের পর সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সাইবার আক্রমণ রোখা এবং প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে এই দেশগুলোর গুরুত্ব ভারতের কাছেও এক লাফে অনেকটাই বেড়ে গেছে। এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে সুমেরু বা আর্কটিক অঞ্চল। নরওয়ের স্ভালবার্ডে ২০০৮ সাল থেকে ভারতের ‘হিমাদ্রি’ গবেষণাকেন্দ্র রয়েছে এবং ২০১৩ সাল থেকে ভারত আর্কটিক কাউন্সিলের পর্যবেক্ষক। নর্ডিক নেতারা অসলোতে সুমেরু নিয়ে ভারতের এই গবেষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন। এটি কোনও শৌখিন প্রোজেক্ট নয়; ভারতীয় বিজ্ঞানীরা বারবার প্রমাণ করেছেন যে, সুমেরুর জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে ভারতের বর্ষা এবং সার্বিক আবহাওয়ার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। কৌশলগত দিক থেকে দেখলে নর্ডিক দেশগুলো একইসঙ্গে তিনটে রণাঙ্গনে ভারতের পাশে দাঁড়াচ্ছে— ইউরোপ, আর্কটিক এবং ইন্দো-প্যাসিফিক। এমন বহুমুখী সুবিধা বিশ্বের খুব কম দেশের কাছেই মেলে।

এই নর্ডিক কূটনীতির সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হল, এটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের কৌশলগত বিকল্পের জায়গাটাকে অনেকটা বড় করে দিয়েছে। এই দেশগুলো কোনও পরাশক্তির বিকল্প নয়, বরং এরা হল ইউরোপের বাজারে, সুমেরুর কূটনীতিতে এবং সবুজ প্রযুক্তির দুনিয়ায় ভারতের জন্য এক-একটি অতিরিক্ত দরজা। এর পাশাপাশি রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের দাবিকে তারা যেমন জোর গলায় সমর্থন করেছে, তেমনই সমর্থন করেছে এনএসজি ভুক্তির দাবিকেও। কোনও রকম বড় রাজনৈতিক নাটকীয়তা ছাড়াই নর্ডিক অঞ্চল ভারতের বিদেশনীতির এক বিশাল ‘ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার’ বা শক্তি গুণক হয়ে উঠেছে। এই দেশগুলো আয়তনে বড় বলে গুরুত্বপূর্ণ নয়, এরা গুরুত্বপূর্ণ কারণ আগামীদিনের অর্থনীতি, সবুজ প্রযুক্তি, সুরক্ষিত সাপ্লাই চেন এবং মেরু গবেষণার চাবিকাঠি এদের হাতেই রয়েছে। ভারত তাদের কাছে নিয়ে যাচ্ছে এক বিশাল বাজার, দক্ষ মেধা আর উন্নয়নের বিপুল তাগিদ। আর নর্ডিকরা দিচ্ছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, পুঁজি আর কৌশলগত বিশ্বাসযোগ্যতা। নয়াদিল্লি যদি এই মেলবন্ধনকে দ্রুত বাস্তবায়িত করতে পারে, তবে চলতি দশকের দ্বিতীয়ার্ধে ইউরোপের এই উত্তরাঞ্চল ভারতের বিদেশনীতির সবচেয়ে সফল এবং কার্যকরী সম্প্রসারণে পরিণত হতে বাধ্য।

(লেখক রাজ্যসভার সাংসদ, ভারতের প্রাক্তন বিদেশ সচিব)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *